শেখ রেহানার জয় হোক

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০৭ এএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০

এম. নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবারটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেই পরিবারের সব সদস্যই যে রাজনীতি সচেতন, তা নিশ্চয় বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্পৃক্ত হওয়ার সব সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজেকে আড়াল করে রাখার মধ্য দিয়ে যে নির্মোহ জীবনাচারের পরিচয় পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়। পাদপ্রদীপের আলোয় আসার আকাঙ্খা সবারই থাকে। ইতিবাচক আলোচনার কেন্দ্রে থাকার ইচ্ছে দমন করা সহজ কাজ নয়। তার জন্য সাধনার প্রয়োজন হয়। সেই সাধনায় উত্তীর্ণ এক নারী শেখ রেহানা। জাতির জনকের কন্যা তিনি।

বড় বোন বাংলাদেশের চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু তারপরও শেখ রেহানা বেছে নিয়েছেন নিভৃত গৃহকোণ, যেখানে রাজনীতির কূটকৌশল প্রবেশাধিকার পায়নি। তাই বলে এটা ভাবলে চলবে না যে, একেবারেই রাজনীতি সচেতন নন তিনি। রাজনীতি তাঁর রক্তে। একবারেই নিরাসক্ত তিনি, এটা বলা যাবে না। যথেষ্ট রাজনীতিসচেতন শেখ রেহানাকে তার পরও নেপথ্যের নিভৃতিচারী। তিন সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন তিনি। মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক আজ নির্বাচিত ব্রিটিশ এমপি।

কিন্তু জীবনটা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। জীবনের অনেকটা পথ রীতিমতো লড়াই করেই কাটাতে হয়েছে তাঁকে। বলতে গেলে জীবনের শুরুতেই জীবনযুদ্ধের সৈনিক তিনি। তারুণ্যের ঊষালগ্নে, যখন তাঁর ভেসে যাওয়ার কথা উচ্ছলতার স্রোতধারায়, তখনই হোঁচট খেতে হয়েছে। থমকে দাঁড়াতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই অভিশপ্ত দিনে হারিয়েছেন মা-বাবা, ভাইদের। হারিয়েছেন স্বদেশের আশ্রয়। আশ্রয়হীন পরিবেশে দেশে দেশে ঘুরেছেন। ছিল না নিশ্চিত নিরাপত্তা, জীবন যাপনের নিশ্চয়তাও ছিল অনুপস্থিত। জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়েছে তাঁকে। বেছে নিতে হয়েছে অন্যরকম এক সংগ্রামী জীবন। লড়াই করেছেন দারিদ্র্যের সঙ্গে। কিন্তু জীবনের সত্য থেকে বিচ্যুত হননি কোনোদিন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সত্য প্রবন্ধে বলেছেন, ‘আমাদের জাতি যেমন সত্যকে অবহেলা করে এমন আর কোনো জাতি করে কি না জানি না। আমরা মিথ্যাকে মিথ্যা বলিয়া অনুভব করি না। মিথ্যা আমাদের পক্ষে অতিশয় সহজ স্বাভাবিক হইয়া গিয়াছে। আমরা অতি গুরুতর এবং অতি সামান্য বিষয়েও অকাতরে মিথ্যা বলি। ...আমরা ছেলেদের সযত্নে ক খ শেখাই, কিন্তু সত্যপ্রিয়তা শেখাই না- তাহাদের একটি ইংরাজি শব্দের বানান ভুল দেখিলে আমাদের মাথায় বজ্রাঘাত হয়, কিন্তু তাহাদের প্রতিদিবসের সহস্র ক্ষুদ্র মিথ্যাচরণ দেখিয়া বিশেষ আশ্চর্য বোধ করি না।

এমনকি, আমরা নিজে তাহাদিগকে ও তাহাদের সাক্ষাতে মিথ্যাকথা বলি ও স্পষ্টত তাহাদিগকে মিথ্যাকথা বলিতে শিক্ষা দিই। আমরা মিথ্যাবাদী বলিয়াই তো এত ভীরু! এবং ভীরু বলিয়াই এমন মিথ্যাবাদী। আমরা ঘুষি মারিতে লড়াই করিতে পারি না বলিয়া যে আমরা হীন তাহা নহে স্পষ্ট করিয়া সত্য বলিতে পারি না বলিয়া আমরা এত হীন। আবশ্যক বা অনাবশ্যক মতো মিথ্যা আমাদের গলায় বাধে না বলিয়াই আমরা এত হীন। সত্য জানিয়া আমরা সত্যানুষ্ঠান করিতে পারি না বলিয়াই আমরা এত হীন। পাছে সত্যের দ্বারা আমাদের তিলার্ধমাত্র অনিষ্ট হয় এই ভয়েই আমরা মরিয়া আছি।’

আমাদের রাজনীতিতে কবিগুরুর এই কথাগুলো কেমন অবলীলায় খাপ খেয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ও রাজনৈতিক পটপরিববর্তনের পর আমরা তো আমাদের সমাজজীবনে এই মিথ্যার বেসাতি দেখেছি। অথচ কী আশ্চর্য, সমাজের একটি অংশ এই মিথ্যাকে আশ্রয় করেই বেড়ে উঠেছে। মিথ্যার রাজনীতি দেশের ক্ষমতাকেও কুক্ষিগত করে রেখেছিল দীর্ঘদিন। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে আমাদের সময় লেগেছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু শেখ রেহানা এই মিথ্যার দেয়ালে আঘাত হেনেছিলেন ১৯৭৯ সালের ১০ মে। সেদিন স্টকহোমে অনুষ্ঠিত হয় সর্বইউরোপীয় বাকশালের এক সম্মেলন। ঐ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠা কন্যা শেখ হাসিনাকে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য অনুরোধ জানান হয়েছিল। কিন্তু তখন ভারত থেকে সুদূর সুইডেনে গিয়ে সম্মেলনে যোগ দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

সর্বইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ শেখ হাসিনার প্রতিনিধিত্ব করতে শেখ রেহানাকে অনুরোধ করেন। দিল্লি থেকে ফোনে শেখ হাসিনাও বোনকে বলেন, সম্মেলনে যেতে। অনুষ্ঠানে কী বলতে হবে সে বিষয়ে তিনি টেলিফোনে ছোট বোনকে নির্দেশনা দেন। শেখ রেহানা সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে তাঁর পাঠানো বাণী পাঠ করেন শেখ রেহানা। তাঁর পক্ষে বক্তব্যও রাখেন তিনি। এটাই ছিল কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে শেখ রেহানার প্রথম বক্তব্য রাখা।

আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে তিনিই সর্বপ্রথম পঁচাত্তরের কলংকজনক ও অমানবিক হত্যাকান্ডের বিচারের দাবি তোলেন। সেদিন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘের মহাসচিব, জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কমিশনের চেয়ারম্যান, আমেরিকার কংগ্রেস এর হিউম্যান রাইটস কমিটির চেয়ারম্যান, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের প্রধানদের কাছে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচারের প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন তিনি। পঁচাত্তরের পৈশাচিক বর্ণনা দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শেখ রেহানার আবেগঘণ বক্তব্য সে অনুষ্ঠানে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। হলভর্তি প্রবাসী বাঙালি নারী-পুরুষ এবং বিদেশী রাজনীতিবিদ, পার্লামেন্ট সদস্য ও সাংবাদিক পিনপতন নীরবতায় তাঁর বক্তব্য শোনেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ব্যক্তি প্রসঙ্গ প্রবন্ধগুচ্ছে গুরুসদয় দত্তের স্ত্রী সরোজনলিনী দত্ত সম্পর্কে বলেছেন, “অর্থভাণ্ডারে মূল্যবান সামগ্রী লইয়া মানুষ গর্ব করে। কিন্তু তাহার চেয়ে বড়ো কথা স্মৃতিভাণ্ডারের সম্পদ। সেই মানুষই একান্ত দরিদ্র যাহার স্মৃতিসঞ্চয়ের মধ্যে অক্ষয় গৌরবের ধন বেশি কিছু নাই। সাধারণত আমরা যখন খাঁটি বাঙালি মেয়ের আদর্শ খুঁজি তখন গৃহকোণচারিণীর ’পরেই আমাদের দৃষ্টি পড়ে। গৃহসীমানার মধ্যে আবদ্ধ যে সংকুচিত জীবন তাহারই সংকীর্ণ আদর্শের বহুবেষ্টনরক্ষিত উৎকর্ষ দুর্লভ পদার্থ নহে। তাহার উপাদান অথবা, তাহার ক্ষেত্র অপ্রশস্ত, তাহার পরীক্ষা অপেক্ষাকৃত অকঠোর।

সরোজনলিনী বাহির সংসারের ভিড়ের মধ্যেই অধিকাংশ জীবন কাটাইয়াছেন, অনেক সময় বিদেশী সমাজের অতিথি বন্ধুদের লইয়া তাঁহাকে সামাজিকতা করিতে হইয়াছে, তাঁহার কর্মজীবনের পরিধি আত্মীয়স্বজন বন্ধুমণ্ডলীর মধ্যেই অবরুদ্ধ ছিল না; তাঁহার সংসার আত্মীয় অনাত্মীয়, স্বদেশী বিদেশী, পরিচিত অপরিচিত অনেক লোককে লইয়া। এই তাঁর বড়ো সংসারের মধ্যে সকলের সঙ্গে সম্বন্ধকে তিনি মাধুর্যের দ্বারা শোভন ও ত্যাগের দ্বারা কল্যাণময় করিয়াছিলেন। এইরূপ ক্ষেত্রেই নারী জীবনের যথার্থ পরিচয় ও পরীক্ষা। তাঁহার কাছে বাহিরের দ্বারা ঘর ও ঘরের দ্বারা বাহির পরাহত হয় নাই। এই উভয়ের সুন্দর সমন্বয়েই তাঁহার মহিমা প্রকাশিত হইয়াছে। আজকালকার দিনে নারী একান্তভাবেই গৃহিণী তিনি আমাদের আদর্শ নহেন, ঘরে বাহিরে সর্বত্রই যিনি কল্যাণী তিনিই আদর্শ, যাঁহার জীবন কেবলমাত্র চিরাগত প্রাদেশিক প্রথা ও সংস্কারের ছাঁচে ঢালা তিনি আদর্শ নহেন কিন্তু যাঁহার মধ্যে বৃহৎ বিশ্বের জ্ঞান ও ভাবের বিচিত্র ধারা গভীর ও সুন্দরভাবে সংগতি লাভ করিতে বাধা না পায় তিনিই আদর্শ।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার ক্ষেত্রেও কবিগুরুর এই বাক্যগুলি একেবারে মিলে যায়। জীবনের সংগ্রামে তিনি মাধুর্যের দ্বারা শোভন ও ত্যাগের দ্বারা সবকিছু কল্যাণময় করেছেন। আদর্শ স্থাপন করেছেন তিনি।

জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী কমলা নেহরু সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘অপরিসীম তাঁর ধৈর্য, বীরত্ব তাঁর বিরাট, কিন্তু সকলের চেয়ে বড়ো তাঁর সুদৃঢ় সত্যনিষ্ঠা। পলিটিক্সের সাধনায় আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে তিনি নিজেকে কখনো হারিয়ে ফেলেন নি। সত্য যেখানে বিপদজনক, সেখানে সত্যকে তিনি ভয় করেন নি, মিথ্যা যেখানে সুবিধাজনক সেখানে তিনি সহায় করেন নি মিথ্যাকে। মিথ্যার উপচার আশু প্রয়োজনবোধে দেশপূজার যে অর্ঘ্যে অসংকোচে স্বীকৃত হয়ে থাকে, সেখানে তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন। তাঁর অসামান্য বুদ্ধি কূটকৌশলের পথে ফললাভের চেষ্টাকে চিরদিন ঘৃণাভরে অবজ্ঞা করেছে। দেশের মুক্তি সাধনায় তাঁর এই চরিত্রের দান সকলের চেয়ে বড়ো দান।’

শেখ রেহানার জীবনাচার লক্ষ্য করলে আমরা তাঁর ভেতরে কমলা নেহরুর এই গুণের পরিচয় পাই। তিনি সত্যের নির্মলতম আদর্শকে রক্ষা করেছেন। আত্মপ্রবঞ্চনা ও পরপ্রবঞ্চনার পঙ্কিল আবর্তের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি। সত্যকে তিনি ভয় করেননি। মিথ্যার সুবিধা ভোগে প্রবৃত্ত হননি কোনোদিন। আমরা জানি, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ নামের জাতিরাষ্ট্রের মহান স্থপতির দুই কন্যার জীবনধারা সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছিল। সেই বদলে যাওয়া জীবনধারায় খাপ খাইয়ে নেওয়া শেখ রেহানা নিজেকে গড়ে তুলেছেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। নিজের অতীত তিনি বিস্মৃত হননি। যদিও এতোকিছুর পরও তিনি আড়ালে রেখেছেন নিজেকে। নিজের বড়বোন দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, চারবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু শেখ রেহানা এক আশ্চর্য শক্তিবলে এই পরিচয়ের গণ্ডির বাইরে রেখেছেন নিজেকে।

রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়েও সবসময় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখলেও তাঁকে রাজনীতি-বিচ্ছিন্ন কিংবা রাজনীতি-বিমুখ ভাবার কোনো কারণ নেই। যথেষ্ট রাজনীতি সচেতন শেখ রেহানা আড়াল থেকেই তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। আজ তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে অনেক অনেক শুভেচ্ছা জানাই তাঁকে। তাঁর জয় হোক।

লেখক : সভাপতি, সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]