অনাবাদি জমিতে ফল চাষের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:০২ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

এম.এ. হাসেম

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার আওতায় বর্তমানে প্রায় ১৫টি চিনিকল রয়েছে। এসব চিনিকলে শ্রমিক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারের ওপর। বাংলাদেশের চিনিকলগুলো বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করতে সক্ষম হয় এবং ওই চিনি উৎপাদন খরচ মিলভেদে প্রতি কেজি ওভারহেডসহ ৭৫০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। উৎপাদিত চিনি বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী মিল গেইটে ৬০ টাকা প্রতি কেজি ধার্য করার পরও অবিক্রিত রয়েছে। তাছাড়া ভালো রিফাইন হয় না বিধায় চিনি বিক্রি হয় না। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার আওতাধীন চিনির মিলগুলোতে উৎপাদিত চিনি ভালোভাবে রিফাইন না হওয়ায় অনেকেই দেশীয় করপোরেশনের কলগুলোর চিনি খায় না।

বাংলাদেশের যে কয়টি বেসরকারি সুগার রিফাইনারি রয়েছে সেগুলো দেশের চাহিদা পূরণ করে এক্সপোর্টও করতে পারবে।

একটি জাতীয় পত্রিকায় ২৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক রিপোর্টে থেকে দেখা গেছে, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন শ্রমিকদের বেতন-ভাতাদি প্রায় ২১০ কোটি টাকা অপরিশোধিত রয়েছে। তাছাড়া আখ চাষিদের পাওনা রয়েছে ১৬১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২০ অনুযায়ী, শুধু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন লোকসান করেছে ৫১৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। সেটা বাড়তে বাড়তে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী ৯৮২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের বকেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ৫৩ কোটি টাকা। শুরু থেকে সরকারের এই পর্যন্ত সুগার মিলে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছে।

দেশে বছরে প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টন চিনি আমদানি হলেও করপোরেশনের উৎপাদিত মাত্র ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন চিনিও বাজারে বিক্রি করতে পারছে না, কারণ চিনির কোয়ালিটি খুবই খারাপ। এই চিনি কেউ কিনতে রাজি নয়। বাংলাদেশে বেসরকারি উদ্যোগে চারটি চিনি রিফাইনারি মিল পুরো বাংলাদেশের আমদানিকৃত চিনির বাইরে দেশের চাহিদা পূরণ করে এবং বিদেশেও রফতানি করে।

বাস্তবিক দিক থেকে বাংলাদেশের চিনির কলগুলো বছরে মাত্র সর্বোচ্চ চার থেকে পাঁচ মাস চালু থাকে। আর বাকি সাত মাসই শ্রমিক-কর্মচারীরা কোনো কর্ম ছাড়াই বেতন-ভাতাদি নিয়ে থাকে। এতে করে দেশের বিপুল অংকের অর্থের ঘাটতি হচ্ছে। বছরের পর বছর ঋণের বোঝা বড় হচ্ছে।

একটি উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ঠাকুরগাঁও সুগার মিলস্ লিমিটেড ১৯৫৮-৫৯ সালে স্থাপিত হয়, ওই মিলের ট্রেনিক কমপ্লেক্স, হাইস্কুল, ক্লাব, মেডিক্যাল সেন্টার, ফ্যামিলি কোয়ার্টার, সিঙ্গেল কোয়ার্টার ও মিল এরিয়ার পরিমাণ ২৮৮৮ দশমিক ৫৯ একর। এছাড়া মিল জোন এলাকায় আখ চাষাবাদের জন্য ৪৫,৮০০ + ২৮৮৮ দশমিক ৫৯ একর জমি রয়েছে। তার মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ একর জমিতে প্রতি বছর আখ চাষ করে থাকে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় থেকে যায়। এভাবে বাংলাদেশের ১৫টি চিনি মিলেরই হাজার হাজার একর জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চিনির মিল বন্ধ করে ফলের চাষ করলে বছরে সরকার ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকা লোকসান থেকে অব্যাহতি পাবে।

বাংলাদেশ প্রতি বছর বিদেশ থেকে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন ফল আমদানি করে থাকে। তারমধ্যে অন্যতম আঙ্গুর, বেদানা, আপেল, কমলা, মোছাম্বিক, নাশপাতি, হানিডিউ মিলান, রেড মিলান, সাম্মাম, স্ট্রবেরি, ড্রাগনসহ সকল প্রকার খেজুর ও বিভিন্ন জাতের ফল বাংলাদেশে আমদানি করতে হয়। এতে করে বিপুল অংকের অর্থ বাংলাদেশ হতে বিদেশে চলে যাচ্ছে। যেখানে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিভিন্ন জাতের ফল চাষাবাদের জায়গায় রয়েছে। শুধু সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আন্তরিকতা এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের উদ্যোগী করতে পারলেই ওই সমস্ত বিদেশি ফলের চাষাবাদ বাংলাদেশেই করা সম্ভব। এই জমিতে ফলের চাষ করলে লোকসান থেকে লাভের পরিমাণ বেশি হবে। কাজেই আমার অনুরোধ, দয়া করে সুগার মিল বন্ধ করে ফলের চাষ করা হোক।

যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সুগার মিল বন্ধ করে ও সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও সুগার মিলের আখ চাষাবাদের পুরো জায়গায় বিদেশি ফলের চাষাবাদের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তাতে দেশের অর্থ দেশেই থাকবে। বিদেশ থেকে ফল আমদানি করতে গিয়ে যে বিপুল পরিমাণ বিদেশি অর্থ অপচয় হয় তা রোধ হবে।

এ ব্যাপারে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঠিক দিক-নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ দেশের জন্য বয়ে নিয়ে আসতে পারে কৃষিতে এক বৈপ্লবিক দিগন্ত। এই ব্যাপারে বাংলাদেশের বড় বড় শিল্প বিনিয়োগকারীদেরও সহযোগিতা মিলবে বলে আমার বিশ্বাস।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান, পারটেক্স গ্রুপ

এইচএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]