জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের ৪৬ বছর

সুভাষ সিংহ রায় সুভাষ সিংহ রায়
প্রকাশিত: ০৯:৫১ এএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

ছোট্ট একটি চিঠি। অথচ বাংলাদেশের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আবেদনপত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সৃজনশীল কুটনৈতিক দক্ষতায় তা সম্ভব হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্টমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের স্বাক্ষরে এই আবেদনপত্রটি জাতিসংঘের মহাসচিব বরাবর পাঠানো হয়েছিল।

I have the honour, on behalf of the Government of the People’s Republic of Bangladesh, to submit this application of the People’s Republic of Bangladesh for membership of the United Nations.
I declare that the People’s Republic of Bangladesh accepts the obligations contained in the Charter of the United Nations and that it solemnly undertakes to fulfill those obligations.
I should be grateful if this application could be placed before the Security Council Immediately, and other appropriate actions taken in this regard.
M. Abdus Samad Azad
Minister for Foreign Affairs of the People’s Republic of Bangladesh.

স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ এই চিঠিটি ১৯৭২ সালে ড. কুট ওয়াল্ড হেইমকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন। জাতিসংঘের চার্টারে আছে, যেকোনো শান্তিপ্রিয় দেশ জাতিসংঘের আদর্শ, উদ্দেশ্য এবং দায়-দায়িত্ব মেনে নিয়ে জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য দরখাস্ত করতে পারে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে খুব মর্যদাবান রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন। পাকিস্তানের কারাগারে নয় মাস কারাবাস শেষে দেশে ফিরে আসার আগেই দেশের স্বাধীন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ভিত্তি রচনা করেছিলেন। আমরা জানি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন; বঙ্গবন্ধু ৮ জানুয়ারিতে (১৯৭২ সালে) লন্ডনে পৌঁছেই সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বিবৃতিতে বিশ্ববাসীর কাছে জানান দুটি আবেদন। ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করুন’ আর ‘আমার ক্ষুধার্ত কোটি প্রাণের সাহায্যার্থে এগিয়ে আসুন।’ ইংল্যাল্ডের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে তাঁর সেদিন হয়েছিল ঘণ্টাব্যাপী সাক্ষাৎ। তিনি সেই সাক্ষাতে বাংলাদেশকে যথাসম্ভব শিগগির স্বীকৃতি ও সাহায্য প্রদানের জন্য ইংল্যান্ডের প্রতি আবেদন জানিয়েছিলেন। হোটেলে সেদিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন ইংল্যান্ডের তদানীন্তন বিরোধী দলের নেতা হ্যারল্ড উইলসন। পরবর্তী সময়ে দেখেছি যে তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর গড়ে উঠেছিল প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল আরনল্ড স্মিথ তাঁর সঙ্গে সেদিনই দেখা করেছিলেন। তাঁর কাছে বঙ্গবন্ধু ব্যক্ত করেছিলেন কমনওয়েলথে যোগদানে বাংলাদেশের অভিপ্রায়। এপ্রিল ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ করেছিল কমনওয়েলথের সদস্যপদ লাভ।

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের নাটের গুরু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকেই বাংলায় চিঠি লিখেছিলেন, সেটা আমাদের অনেকের ভাবনার বাইরে ভাবনার বাইরে ছিল। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক ‘প্রথম আলো’তে মিজানুর রহমান খানের প্রতিবেদন থেকে তা জানতে পেরেছি। সেটা ছিল এ রকম যে যুদ্ধ-উত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বিচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর উপমহাদেশীয় রাজনীতি ও কূটনীতির হিসাব-নিকাশের সঙ্গে তা মিলছিল না। স্বাধীনতার পর রিচার্ড নিক্সন বিশেষ করে তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার দ্রুত মনোযোগ দেন, বাংলাদেশ যাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে না পারে সেই দিকে। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো ততদিনে গোঁ ধরেছেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি ত্যাগ না করলে তিনি বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন না। বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়াতে তিনি ১৯৭৩ সালের পাকিস্তান সংবিধানে ‘পূর্ব পাকিস্তানকে’ প্রদেশ হিসেবেই উল্লেখ করেন। ১৯৭৩ সালে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জায়গায় ছিল উপমহাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণ। ৪৭ বছর আগে ১৯৭৩ সালে নিক্সনকে লেখা বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক চিঠি অবিকল ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল। ওই চিঠি একটি আনুষ্ঠানিক ও রীতিনীতিনির্ভর কূটনৈতিক পত্র। গণহত্যার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীই দায়ী, পাকিস্তান বা পশ্চিমা সভ্যতা এর দায় মোচন করেনি।

আজ থেকে ৪৮ বছর আগে দেশ স্বাধীন হওয়ারমাত্র আট (৮) মাসের মাথায় জাতিসংঘের মহাসচিব বরাবর বাংলাদেশ সরকারের এই চিঠি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ মহাসচিবকে উদ্দেশ্য করে এ চিঠি আবদুস সামাদ আজাদ এই ধারা অনুসারেই পাঠিয়েছিলেন। এই দরখাস্তটি পাওয়ার পর জাতিসংঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ড হেইম বাংলাদেশের সদস্যপদের ব্যাপারে নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের জন্য তা নিরাপত্তা পরিষদে পেশ করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চিঠি পাওয়ার পর নিরাপত্তা পরিষদ কোনো রকমের দেরি না করে দুদিনের মধ্যে ১০ তারিখেই এক সভায় মিলিত হয়। বাংলাদেশের সদস্যপদের দরখাস্ত এই দিনের সভার একমাত্র আলোচ্যসূচি ছিল। নিরাপত্তা পরিষদের ১০ আগস্টের অধিবেশনে বাংলাদেশের সদস্যপদ সংক্রান্ত দরখাস্ত বিবেচনা করার জন্য জাতিসংঘ সচিবালয় কর্তৃক যে খসড়া আলোচ্যসূচি প্রণীত হয়েছিল, গণচীনের প্রতিনিধি মি. হুয়াংহয়া সেদিন এই আলোচ্যসূচি গ্রহণের বিরুদ্ধে একমাত্র ভোটটি দিয়ে বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির বিরুদ্ধে দীর্ঘ বিরোধিতার সূচনা করেন। আলোচ্যসূচিই গ্রহণ করতে দিতে চায়নি সেদিন গণচীন। একেবারেই মামুলি পদ্ধতিগত বিষয়, যেকোনো আনুষ্ঠানিক সভার শুরুতেই থাকে খসড়া আলোচ্যসূচি গ্রহণ নিয়মমাফিক অ্যাডমিশন কমিটিতে আমাদের দরখাস্তটি পাঠানো হবে কি হবে না, তাই ঠিক করতে হলো এদিন নিরাপত্তা পরিষদের ভোটাভুটিতে। শুধু গণচীন বিষয়টি অ্যাডমিশন কমিটিতে পাঠানোর বিরুদ্ধে ভোট দেয়। তবে আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ভারত, ইতালি, জাপান, পানামা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুগোস্লোভিয়া আলোচ্যসূচিটি গ্রহণের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। ৩টি দেশ- গিনি, সোমালিয়া এবং সুদান ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করেনি।

নিরাপত্তা পরিষদের ১০ আগস্টের এই সভায় বাংলাদেশের সদস্যপদের দরখাস্তটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট দেয়ার জন্য ‘অ্যাডমিশন কমিটি’কে দায়িত্ব দেয়া হয়। নিরাপত্তা পরিষদের সভার মাত্র একদিন পর ‘অ্যাডমিশন কমিটি’ ১১ আগস্ট এক সভায় বসে। এই দিনের অ্যাডমিশন কমিটির মিটিংয়ে গণচীনের প্রতিনিধি বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখে বলেন যে, ৭১-এর ডিসেম্বরে সাধারণ পরিষদ এবং নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়ন না করা পর্যন্ত ভারত-পাকিস্তান এবং পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান ইস্যুগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ এ দিনের সভায় কমিটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে অসমর্থ হওয়ার কারণে অ্যাডমিশন কমিটি ২১ আগস্ট আবার বৈঠকে মিলিত হয়। গণচীনের প্রতিনিধি অ্যাডমিশন কমিটির এ দুদিনের সভায় বাংলাদেশের সদস্যপদের বিরুদ্ধে তার প্রবল বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন।

সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত যখন পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন বেলজিয়ামের প্রতিনিধির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২১ তারিখের সভায় বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রশ্নে কমিটির সদস্যদের কার কী অভিমত এ বিষয়ের ওপর ভোটাভুটি হয়। আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ভারত, ইতালি, জাপান, পানামা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুগোস্লোভিয়া এ ১১টি দেশ কমিটির এ ভোটাভুটিতে বাংলাদেশের সদস্য পদের অনুকূলে ভোট দেয়। বাংলাদেশের সদস্য পদের বিপক্ষে ভোট দেয় গিনি। গণচীন, সোমালিয়া এবং সুদান ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করেনি। বাংলাদেশের সদস্য পদের প্রশ্নে ‘অ্যাডমিশন কমিটি’ যে রিপোর্ট দেয় তা বিবেচনা করার জন্য ২৪ আগস্ট জাতিসংঘের সদর দপ্তরে বেলজিয়ামের প্রতিনিধির সভাপতিত্বে নিরাপত্তা পরিষদের সভা আবার শুরু হয়। পরিষদের ৫টি স্থায়ী দেশ- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং গণচীন এবং অন্য ১৯টি অস্থায়ী সদস্য দেশ- আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, গণচীন, ফ্রান্স, গিনি, ভারত, ইতালি, জাপান, পানামা, সোমালিয়া, সুদান এবং যুগোস্লোভিয়ার প্রতিনিধিরা এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ সভায় বিবেচ্য বিষয় ছিল যুক্তরাজ্য, ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুগোস্লোভিয়া- নিরাপত্তা পরিষদের এই ৪টি সদস্য দেশের উত্থাপিত নিম্নোক্ত খসড়া প্রস্তাবটি ২৩ আগস্ট ১৯৭২ তারিখ বিশিষ্ট ‘অ্যাডমিশন কমিটি’র রিপোর্টটি ও নিরাপত্তা পরিষদের এ দিনকার সভায় কার্যপত্র হিসেবে বিবেচ্য ছিল। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি, বেলজিয়াম প্রতিনিধি কয়েকটি বাক্যে তার উদ্বোধনী বক্তব্য রাখার পরপরই গণচীনের প্রতিনিধি প্রথম বক্তা হিসেবে বাংলাদেশের সদস্য পদের বিরুদ্ধে আবারও এবার তৃতীয়বারের মতো প্রবল বিরোধিতা শুরু করেন। এই দিন বিতর্ক অসমাপ্ত থাকে এবং পরদিন আবার শুরু করার পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়।

শুক্রবার ২৫ তারিখ অপরাহ্নে নিরাপত্তা পরিষদের ৩টার নির্ধারিত সভা ৩-৩৫ মিনিটে আবার শুরু হয়। দুই দিনের দীর্ঘ বিতর্ক শেষে ২৫ তারিখে বাংলাদেশের সদস্য পদের ওপর তিনটি প্রস্তাব ভোটাভুটিতে দেওয়া হয়। ১৯৭১-এর পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের ওপর গৃহীত জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে বাংলাদেশের সদস্যপদ বিবেচনা স্থগিত রাখার জন্য গণচীনের একটি খসড়া প্রস্তাব ভোটাভুটিতে প্রথম দেওয়া হয়। গণচীনের প্রতিনিধির দাবি অনুসারেই বাংলাদেশের সদস্যপদ বিবেচনা স্থগিত রাখার জন্য এ প্রস্তাবটি প্রথম ভোটাভুটিতে দেওয়া হয়। এই প্রস্তাবের পক্ষে চীন, গিনি এবং সুদান এ ৩টি দেশ ভোট দেয়। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুগোস্লোভিয়া প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, পানামা, সোমালিয়া, যুক্তরাজ্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভোটাভুটিতে বিরত থাকে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট পেতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে গণচীনের প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়।

সবশেষে নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ওই চার শক্তি আনীত বাংলাদেশের সদস্য পদের পক্ষের প্রস্তাবটি এই দিনের তৃতীয় ভোটাভুটিতে দেন। বাংলাদেশের সদস্য পদের পক্ষে এ প্রস্তাবে ভোট দেয়। ১১টি দেশ- আর্জেন্টিনা, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ভারত, ইতালি, জাপান, পানামা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুগোস্লোভিয়া। প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় মাত্র একটি সদস্য দেশ, নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যের একটি স্থায়ী সদস্য, গণচীন। ভোটাভুটিতে বিরত থাকে গিনি, সোমালিয়া এবং সুদান। গণচীনের এই ভেটো প্রয়োগের ফলে বাংলাদেশের সদস্য পদের পক্ষের প্রস্তাবটি সেদিন গৃহীত হতে পারেনি। যে গণচীনকে পশ্চিমা শক্তিবর্গ পঁচিশটি বছর জাতিসংঘের সদস্য পদের বাইরে রেখেছিল, সেই গণচীন ১৯৭১ সালে সদস্য হয়েই ’৭২-এর ২৫ আগস্টে তার প্রথম ভেটোটি প্রয়োগ করেছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ এবং ১৯৭২ এ গণচীন জাতিসংঘে যে কী দুঃখজনক ভূমিকা নেয় তা জাতিসংঘের সেই সময়কার নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদের দলিলে ইতিহাস হয়ে আছে। এসব কারও মন্তব্য নয়।

১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৩৬তম সদস্য দেশ হিসেবে আমরা জাতিসংঘের সদস্য পদ পাই। গণচীন এবার আর বাধা দেয়নি। তারপর থেকে জাতিসংঘ পরিবারে আমাদের কার্যপরিধি এবং কর্মতৎপরতা বেড়েছে। ১৯৭৪-এর সেপ্টেম্বরে আমাদের সদস্যপদ প্রাপ্তির পরপরই জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাঁর ভাষণটি দিয়েছিলেন বাংলায়। এই প্রথম জাতিসংঘ পরিবারের কোনো সভায় বাংলা ভাষা উচ্চারিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি-ভিক্ষায় কোনো দেশে যাননি কখনো। ১৯৭২ সালে তিনি লন্ডনে তাঁর অস্ত্রোপাচারের পর জেনেভায় ছিলেন দ্রুত আরোগ্যের পথে। মিসরের রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত তাঁকে সেখানে বাংলাদেশে ফেরার পথে কায়রো সফরের জন্য জানালেন আমন্ত্রণ। কিন্তু মিসর তখনো বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। তবু সাদাত জানালেন যে কায়রোতে তিনি বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বাগত জানাবেন আর বাংলাদেশকে তখনই প্রদান করবেন স্বীকৃতি। মনে পড়ে, স্বীকৃতি কামনায় কারও কাছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, যাওয়াকে বঙ্গবন্ধু অশোভন বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর শরীরের অবস্থা উল্লেখ করে মিসর সফরের অপারগতা তিনি কূটনৈতিক ভাষায় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতকে জানিয়েছিলেন। তার দুই বছর পর ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি সাদাতই প্রথম বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার পরই গিয়েছিলেন ফিরতি রাষ্ট্রীয় সফরে মিসরে। দেশের সম্মান রক্ষায় আপসহীন ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ মুজিব।

বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ই আমরা লাভ করেছিলাম বিশ্বের প্রায় সব দেশের স্বীকৃতি। চীন ও সৌদি আরব তখনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সময় পর্যন্ত এ দুই দেশের সঙ্গে সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর স্থির বিশ্বাস ছিল যে এই দুটি দেশের সঙ্গেই আমাদের একদিন গড়ে উঠবে অর্থবহ সম্পর্ক। তিনি অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে ছিলেন এই দুই দেশের স্বীকৃতির অপেক্ষায়। উৎসাহ দিয়েছিলেন যে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির অপেক্ষা না করেই যেন সেই দেশগুলোর সঙ্গে শুরু হয় আনাগোনা আর বাণিজ্যিক লেনদেন। পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় সুস্থিরচিত্ত, দূরদশী শেখ মুজিব।

ইতিহাসের পাদটীকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সাথে জাতিসংঘের কুটনৈতিক নানান বিষয় যুক্ত হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ৯ আগষ্ট পাকিস্তান সামারিক জান্তা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু ওই দিনই অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিকভাবে রুশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল । নয়াদিল্লির সঙ্গে ওয়াশিংটনের সময়ের ব্যবধান সাড়ে ১০ ঘন্টার মতো। ফলে নয়াদিল্লিতে মৈত্রী চুক্তিসংক্রান্ত ঘোষণার পর ওই দিন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে কোনো দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে পাকিস্তানকে সতর্ক করে দেয়। জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট ১০ আগস্ট শেখ মুজিবের বিচার প্রশ্নে সামরিক জান্তার উদ্যোগ হস্তক্ষেপ করেন।

মহাসচিব বিষয়টিকে শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থার এখতিয়ারাধীন বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেননি। তিনি মনে করেছিলেন যে রাজনৈতিক গুরুত্ব ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ব্যতিক্রমী বিষয় (Extra-Ordinary Case)। সভ্যতার স্বাভাবিক মানদণ্ডে এবং জাতিসংঘ সনদের মুখবন্ধে বর্ণিত পঙ্ক্তিমালা অনুযায়ী এই বিচারের আয়োজন সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্ট আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে প্রেরিত এক টেলিগ্রামে গোপন বিচারের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। এ সংস্থা পরিষ্কারভাবে বলে যে ‘ÔJustice has nothing to hide.’

১৯৭১ সালে বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি চীনের বৈরী নীতি ছিল এক বিপন্ন বিস্ময়। তখন চীন পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যে বাগাড়ম্বর করেছিল, তার পেছনে কাজ করেছে তার জাতীয় স্বার্থ। ওই সময় চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব ও সীমান্ত সংঘর্ষ ইত্যাদি কারণে উভয় দেশের সম্পর্ক চূড়ান্ত অবনতি হয়েছিল। সোভিয়েত পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের একটা অংশ তখন চীনের দিকে তাক করানো ছিল। সর্বোপরি ৪৪ ডিভিশন সোভিয়েত সেনা চীনা সীমান্তে মোতায়েন করা হয়। আর জাতীয় স্বার্থের কারণেই চীন-মার্কিন আঁতাত ১৯৭১ সালে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যাকে একটা চিরায়ত সম্পর্কের অভিধায় অবহিত করা চলে। কারণ, মার্কিন সমর্থনে চীন ফিরে পেয়েছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি পাকিস্তানের প্রতি ‘ঝুঁকে পড়া’ নীতি গ্রহণ করে এবং চীনকে ব্যবহার করে পাকিস্তানি সামরিক জান্তাকে উজ্জীবিত রেখেছিল, যাতে উপমহাদেশে ক্রমবর্ধমান সোভিয়েত আধিপত্যকে রুখে দেওয়া যায়। ফলে জাতিসংঘে মার্কিন-চীন’ বনাম ‘সোভিয়েত-ভারত’ মেরুকরণ হয়েছিল এবং সাধারণভাবে প্রকাশ্যে এই সমীকরণ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক ফোরামে প্রতিফলিত হয়েছিল।

নিক্সনকে বঙ্গবন্ধুর বাংলায় চিঠি

আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের নাটের গুরু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকেই বাংলায় চিঠি লিখেছিলেন, সেটা ভাবনার বাইরে ছিল। সেটা ছিল এ রকম যে যুদ্ধ-উত্তর বঙ্গবন্ধুর সরকার একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বিচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নির্বিশেষে তৎকালীন পরাশক্তিগুলোর উপমহাদেশীয় রাজনীতি ও কূটনীতির হিসাব-নিকাশের সঙ্গে তা মিলছিল না। স্বাধীনতার পর রিচার্ড নিক্সন বিশেষ করে তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার দ্রুত মনোযোগ দেন, বাংলাদেশ যাতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে না পারে সেই দিকে। তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো তত দিনে গোঁ ধরেছেন। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি ত্যাগ না করলে তিনি বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবেন না। বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়াতে তিনি ১৯৭৩ সালের পাকিস্তান সংবিধানে ‘পূর্ব পাকিস্তানকে’ প্রদেশ হিসেবেই উল্লেখ করেন। ১৯৭৩ সালে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের জায়গায় ছিল উপমহাদেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণ।

৪৭ বছর আগে ১৯৭৩ সালে নিক্সনকে লেখা বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক চিঠি অবিকল তুলে ধরলাম।

ওই চিঠি একটি আনুষ্ঠানিক ও রীতিনীতিনির্ভর কূটনৈতিক পত্র। সুতরাং এর ভাষা ও রচনাশৈলীকে সেই আলোকেই দেখতে হবে। গণহত্যার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনীই দায়ী, পাকিস্তান বা পশ্চিমা সভ্যতা এর দায় মোচন করেনি। আমরা ট্রাইব্যুনাল করে বেসামরিক ব্যক্তিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করলাম। বাংলাভাষীদের ওপর পরিচালিত যুদ্ধাপরাধের দায়ে সামরিক কুশীলবদের কারও বিচার হলো না। মস্কোতে তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত এস কে দেহলভীর (একসময় খুলনায় ডিসি ছিলেন) মাধ্যমে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর কাছে মরিয়া হয়ে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, এখন বিচার বসালে পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান হবে।

(তথ্যসূত্র : মহিউদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; ফারুক চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্র সচিব)

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - j[email protected]