মালেকের পর কে, শেষ কোথায়?

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭:৫৪ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

ইরানী বিশ্বাস

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ অতিক্রম করে বাংলাদেশ এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে বৈদেশিক অনুদান হিসেবে সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য সাড়ে সাত কোটি কম্বল এসেছিল। তবে বিলি বণ্টনের শেষ পর্যায়ে দেখা গেল, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু নিজেই কম্বল থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর এই কৈফিয়ত থেকেই বোঝা যায় শুধু বর্তমানেই নয়, সুদূর অতীত আমাদের সততা নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে। করোনার শুরু থেকেই গণমাধ্যম তথা সামাজিক মাধ্যমে হৈ চৈ পড়ে যাচ্ছে এক একটি প্রশ্নবিদ্ধ ঘটনা নিয়ে। এ যেন ক্রিকেট খেলার মাঠে বিরোধী দলের উকেট পতনের মতো উত্তেজনা। একটি উইকেট পতনের পর ফের অপেক্ষা পরবর্তী উইকেটের জন্য। ক্যাসিনো শামীম, সম্রাট, পাপিয়া, সাহেদ, সাবরিনা, সর্বশেষ উইকেটের পতন হয়েছে ড্রাইভার আব্দুল মালেক। এদের প্রত্যেকের নামের সাথে অবৈধ শব্দটি সংযোজন রয়েছে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ দ্বিধায় পড়ে যায় মাঝে মাঝে। আমরা আসলে কোন দেশের নাগরিক। আমাদের দেশ কি মধ্যম আয়ের দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, নাকি ধনী দেশের অন্যতম! সাবেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সামান্য ড্রাইভার আবদুল মালেক। তার সম্পদ ও অর্থের হিসাব দেখে রীতিমতো ভিমরি খেয়ে পড়তে যাচ্ছিলাম। এ সম্পদ তিনি রাতারাতি হাতের নাগালে পেয়ে যাননি। তাহলে কি আমরা যে সমাজে বসবাস করি সেখানে সব অন্ধ মানুষ বাস করে? কোন নারী ওড়না পরেনি, কে অন্যের ধর্ম অমান্য করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে, কে নিজেকে নাস্তিক বলে ঘোষণা দিয়েছে এসব দেখার এবং শোনার মানুষরাই আমাদের সমাজে বাস করে। অথচ এই আবদুল মালেকের প্রতিবেশি, সহকর্মী, আত্মীয়, শুভাকাঙ্খীরা নেহাত কম নেই। এদের মধ্যে কারো মনে, একবারও কি প্রশ্ন জাগেনি, এই মানুষটি মাত্র ২৪ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করে। তার এত বিলাসবহুল বাড়ি হয় কি করে? অথবা বাড়ি কেনার সময় লেনদেন করতে হয়েছে, রেজিস্ট্রেশন করতে হয়েছে। সেখানে নিশ্চয়ই টাকার অংক লেখা ছিল।

তাছাড়া কখনোকি আয়কর বিভাগ খোঁজ নিয়েছে, যে মানুষটি এত টাকার ফ্ল্যাট/জমি রেজিস্ট্রি করেছে, তার আয়ের উৎস কি? আমি ফেসবুকে কোন কথা লিখতে ভয় পাই। মোবাইলে ম্যাসেজ লিখতে ভয় পাই। আমার জানা মতে, বাংলাদেশের (এনএসআই) এমন একটি ডিপার্টমেন্ট, যাদের কাছে সকলের বায়োডাটা জমা থাকে। নিজের অজান্তে কোন অন্যায় করলেও তাদের ফাঁকি দেওয়া যায় না। তাহলে কি বলবো, এসব ডিপার্টমেন্ট শুধু নিরিহ ভদ্রলোকের বায়োডাটা চোখের সামনে ঝুলিয়ে রেখে নিজেদের সততা প্রমাণ করেন!

এখন ইলিশের মৌসুম। রাস্তায় রাস্তায় ঝুড়ি নিয়ে ইলিশ বেপারীদের বিক্রির উৎসব চলছে। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের মানুষের বিক্ষোভের কারণ ছিল ভারত পেঁয়াজ দিলো না অথচ আমরা ইলিশ দিলাম। ভারতে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের রূপালী ইলিশ। এতদিন জানতাম, দেশে উৎপাদিত সম্পদ জনগণের প্রয়োজন মিটিয়ে যা বেশি থাকে তা-ই রপ্তানি যোগ্য। দেশে ইলিশের ছড়াছড়ি অথচ দাম ১০০০ টাকা কেজি। সারা বাংলাদেশেটা যেমন ঢাকাশহর না। তেমনি সারা ঢাকাশহরটাও গুলশান-বনানী না। একটু হিসাব করে বলবেন, এ দেশের কতো পার্সেন্ট মানুষ ইলিশ খেতে পারে? বিশ্বের কাছে লোভনীয় মাছ ইলিশ। দেশের সব জনগণের নাগালের মধ্যে কি ইলিশ মাছ আছে? অর্থনীতির হিসাবে বলা হয়, চাহিদার তুলনায় যোগান কম থাকলে দাম বৃদ্ধি পায়। চাহিদার তুলনায় যোগান বেশি থাকলে দাম কমে যায়। আর চাহিদা ও যোগান সমান থাকলে দাম স্থিতিশীল থাকে। তাহলে ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতির কোন পর্যায়ে আছে। যোগান যদি কম থাকে, তাহলে রপ্তানি কেন? কার স্বার্থে বিদেশে ইলিশ মাছ রপ্তানি করা হচ্ছে?

আমরা নিজেদের খুব উদার বলে ঘোষণা দিতে কটাক্ষ করে কোলকাতার দাদাদের সঙ্গে তুলনা করি। রঙ্গ করে বলে থাকি, কোলকাতার দাদারা বাজার থেকে কাটা মাছ কিনে খায়! আপনি কখনোকি জিজ্ঞেস করেছেন, যে বুয়া আপনার বাসায় সারাদিন ইলিশমাছ কাটা-ধোয়া, রান্না করে। তিনি তার বাচ্চার মুখে ইলিশমাছ দিয়েছে কিনা। বাংলাদেশের এমন অনেক পরিবার আছে যারা বংশপরম্পরায় মৃত্যু বরণ করেছে। যারা নিজেদের মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ না নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। হয়তো তাদের মনে ইচেছ ছিল কোন একদিন, মায়ের হাতের রান্না করা সরু চালের ভাত আর সর্ষে ইলিশ খাবে। হয়তো জীবনে কোনদিন সে বলতেও পারেনি, আমার মায়ের হাতের সেরা রান্না খেয়েছি। আমাদের দেশেও যদি মাছ, মাংস কেটে বিক্রি হতো। হয়তো এসব পরিবার শখ করে দুই টুকরা মাছ কিনে মৃত্যু পথযাত্রী মা-বাবার শেষ ইচ্ছা পুরণ করতে পারতো।

১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধু চীন সফরে গিয়েছিলেন। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার এক প্রতিনিধি তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমার দেশের রাষ্ট্রদূত ও কর্মচারীরা যেভাবে থাকেন, আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও সেভাবে থাকতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধুর এ কথা থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিদেশে কি পর্যায়ে আছে। ইতিহাস থেকেই জানা যায়, আমাদের দেশের মানুষের ঠাট-বাট একটু বেশিই। হয়তো এ জন্য নিজেকে ভাল রাখার প্রতিযোগীতায় প্রত্যেকেই সমান অংশগ্রহনকারী। হযতো কিছুদিন আগে যে মানুষ অন্যের কাছে হাত পেতে চলেছে। সে হঠাৎ করে একটা গাড়ি কিনে ফেলেছে। এমন পরিবর্তন এখন আর কারো মনে প্রশ্নের জন্ম দেয় না। বরং অন্যরা মনে করে, সে ৫০ লাখ টাকার গাড়ি কিনেছে, যে কোন উপায়ে হোক আমাকে ৯০ লাখ টাকার গাড়ি কিনতে হবে। এই প্রতিযোগিতা মানুষকে অন্যায়ের পথে নিয়ে যাচ্ছে। আগে মানুষ মনিষীদের জীবনী পড়তো। তাদের আদর্শ অনুসরণ করতো। বর্তমান সামজে দেখছি ইতিহাসের কুখ্যাত মানুষদের জীবনী পড়া শুরু করেছে। হয়তো তাদের দেখানো পথে অল্প সময়ে বিখ্যাত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সে পথেই হাটতে শুরু করেছে।

বাংলাদেশে অবৈধ পথে অর্থ উপার্জন করা যত সহজ, বিশ্বের অন্য কোন দেশে এত কম সময়ে অর্থের পাহাড় গড়া যায় কিনা আমার জানা নাই। হয়তো এ কারণে বাজারে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লে প্রতিবাদ করার মানুষ নেই। এই প্রতিবাদী মানুষই বরং নিগৃহীত হয় সর্বস্তরে। অন্যরা তাদের দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকায়। ‘আস্ত একটা ছোটলোক’ বলে গালি দেয়। এখন আর কেউ নিজেকে ছোটলোকের খাতায় নাম লেখাতে চায় না। কেউ যদি কারো অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, পরের দিনই তাকে ডিজিটাল আইনে মামলা দেখিয়ে এ্যারেস্ট করা হচ্ছে। অনেকেই এই হয়রানির ভয়ে চোখের সামনে সব দেখেও পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। ফলে একের পর এক অবৈধ উইকেটের জন্ম হচ্ছে। এই অবৈধ মানুষ ক্যান্সারের জীবাণুর মতো দ্রুত জন্ম নিচ্ছে। ক্যান্সারের দ্রুত প্রজনন বৃদ্ধি ঠেকাতে দরকার ডবল ডোজের কোরামিন। তা না হলে পুরো সমাজটাই ক্যান্সারে গ্রাস করে নিবে।

লেখক : সাংবাদিক, নাট্যকার ও পরিচালক।

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]