করোনায় আটকে পড়া প্রবাসীদের সমস্যা এবং সরকারি পদক্ষেপ

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৯ এএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

মাছুম বিল্লাহ

আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার হচেছ রেমিট্যান্স। আর এই রেমিট্যান্স যারা পাঠান তারা হচ্ছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধা অর্থাৎ আমাদের প্রবাসী ভাইবোনেরা। করোনা কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্ব, তারপরও আমাদের অর্থনীতির চাকা অনেকটাই সচল রয়েছে আর তার মূল কারণ হচ্ছে এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো অস্ত্র অর্থাৎ ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোই হচ্ছে মূলত আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যুদ্ধক্ষেত্র। তারা দেশে বেড়াতে এসে করোনার কারণে আটকা পড়েছেন। তেলসমৃদ্ধ দেশ সৌদি আরবে বিশ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। করোনকালে তাদের বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে। প্রবাসীদের বেশিরভাগই দেশে এসেছিলেন বাধ্য হয়ে। ফিরে এসে শঙ্কার মধ্যেই কাটিয়েছেন পুরো বন্ধ, পুরো ক্রান্তিকাল। সে সময় তাদের পাশে কেউ দাঁড়ায়নি, নিজেরাই সব ব্যবস্থা করেছেন যা হয় আমাদের দেশে। পদে পদে সরকারি সব বাধা, আমলাতন্ত্র, অসহযোগিতা, অবজ্ঞা ইত্যাদি কারণে অবৈধ পথে নদী, সাগর, ভয়ংকর বনজঙ্গল আর উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান আমাদের দেশে কর্মপাগল মানুষ। সেখানে অবৈধ অভিবাসী হয়ে, ভয়ে ভয়ে, পালিয়ে থেকে বহু কিছু স্যাক্রিফাইস করে অর্থ উপার্জন করেন আর তাতেই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ হয় আর আমরা পুরো ক্রেডিট নেয়ার জন্য কতভাবেই না মিডিয়ায় তুলে ধরি অথচ এই প্রবাসীদের সমস্যা হলে তখন আর রাষ্ট্র থেকে বড় বড় বিবৃতি ছাড়া তেমন একটা কিছু পাওয়া যায় না।

লাখখানেক প্রবাসী পড়েছেন মহাবিপদে। তাদের দিতে হচ্ছে টিকিটের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে চার-পাঁচগুণ বেশি অর্থ। আর সৌদি প্রবাসীরা ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ফিরতে না পারলে সমস্যায় পড়বেন। তাদের ওয়ার্ক পারমিট থাকবে না। অথচ সৌদি আরবের সঙ্গে বিমান চলাচল পুনরায় চালু করা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা। জানা গেছে সৌদি এয়ারলাইন্স গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে সপ্তাহে দুই দিন ঢাকা থেকে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালানোর অনুমিত পেলেও ২২ তারিখ বিকেল পর্যন্ত বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটির কাছ থেকে ফ্লাইট চালুর অনুমতি পাওয়া যাচ্ছিল না। করোনার কারণে ১ মার্চ বন্ধ হওয়া বিমান চলাচল এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। সৌদি এয়ারলাইন্সের দুটি ফ্লাইট চলছে। স্বাস্থ্যবিধির বাধ্যবাধকতায় ৬০০ আসনের এসব ফ্লাইটে সর্বোচ্চ ২৬০ জন যাত্রী পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। সৌদি এয়ারলাইন্সের চলমান দুটি ফ্লাইটে প্রতিদিন ৫২০ জন যাত্রী সৌদি আরবে ফিরলেও ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আটকে পড়াদের ৫ শতাংশও ফিরতে পারবেন না।

সৌদি এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ বলেছেন, আগামী ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখসহ তাদের মোট চারটি ফ্লাইট আছে যেগুলোর আসনসংখ্যা ১০৬০টি অথচ টিকিটপ্রত্যাশীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। এই বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর টিকিট ও ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা অসম্ভব। আরও দুই মাস মেয়াদ বাড়িয়ে দিলেও তাদের টিকিটের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এ সময়ের মধ্যে আরও চারটি ফ্লাইট বাড়ানো হতে পারে বলে জানিয়েছেন অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি সূত্র। তার মানে হচ্ছে দুই সরকারের তরফ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে প্রবাসীদের যথাসময়ে ফেরত যাওয়ার ক্ষেত্রে। এটি শক্ত কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত।

২০১৯-২০ অর্থবছরে যে এক হাজার ৮২০ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে তার মধ্যে ৪০১ কোটি ৫১ লাখ ডলারই সৌদি প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন। এই পরিমাণই বলে দেয় যে, এখানকার প্রবাসীদের প্রতি আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। কিন্তু আমরা সেই ধরনের দৃষ্টি তাদের দিকে দিচ্ছি কি? রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের টানা পাঁচদিন কর্মসূচির পরে সরকারের হুঁশ হয়। তারা সুনির্দিষ্ট কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন- যেমন, বাংলাদেশে থাকতেই আকামার মেয়াদ বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনেকেরই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তারা ঝুঁকির মধ্যে আছেন। তাই ভিসার মেয়াদ বাড়তে হবে। তৃতীয়ত, বিমানের টিকিটের দাম যা, তা-ই যেন তারা দিতে পারেন। বাড়তি টাকা যাতে গুনতে না হয়। আকামার মেয়াদ বাড়াতে নাকি তিন থেকে চার লাখ টাকা দিতে হয় সৌদি সরকারকে যা দেয়ার সামর্থ্য তাদের নেই। ওখানে ফেরত গিয়ে তারা উপার্জন করে স্থায়ী আকামা নিতে চান।

তাই, আপাতত তিন মাসের সময় বাড়িয়ে দেয়ার আবেদন করেন যাতে তারা নির্বিঘ্নে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন। আর এ কাজটি তো রাষ্ট্রকেই করতে হবে। তারা নিজেরা যতক্ষণ পর্যন্ত পারেন সামলিয়ে নেন কিন্তু যেগুলো একান্তই রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সেখানে রাষ্ট্রকে সেই দায়িত্ব পালন করারই কথা কিন্তু আমরা সবসময়ই এখানে সমস্যার জট দেখতে পাই। বিমানের টিকিট ও ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির দাবিতে দেশে ছুটিতে আসা সৌদি প্রবাসীরা সড়ক অবরোধ ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ঘেরাও করেন। সেই সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেন। একমাত্র তখনই সরকারি মহলে একটু নাড়াচাড়া শুরু হয়। ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে দ্রুত সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। আলোচনা শেষে প্রবাসীদের ভিসার মেয়াদ ২৪ দিন বাড়ানোসহ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটের অনুমতি পান।

আগামী ১ অক্টোবর থেকে সৌদি আরবে ননশিডিউল ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ল্যান্ডিং পারমিশন পাওয়া গেছে বলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া সেপ্টেম্বরে জেদ্দা ও রিয়াদগামী দুটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন বিমানের জনসংযোগ বিভাগ। পূর্বনির্ধারিত ১ অক্টোবরের পরিবর্তে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে বিমান বাংলাদেশের বিশেষ ফ্লাইট চলাচল শুরু করবে। একইসঙ্গে সৌদি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটও চলবে। তবে এক্ষত্রে একটি শর্তও থাকছে। তাতে বলা হয়েছে যে, সৌদিতে প্রবেশের আগে যাত্রার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীদের করোনা পরীক্ষা নেগিটিভ সনদ হস্তান্তর করা। এটি আর এক ধরনের ঝামেলা। এখানেও সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন তা না হলে দ্রুত মেডিকেল রিপোর্ট কেউ দিতে চাইবে না, অবৈধ টাকার খেলা হবে।

আমরা যতটা বুঝি যে, সরকারি তরফ থেকে উচিত ছিল এসব প্রবাসীরা দেশে আসার সাথে সাথেই কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সৌদি সরকারের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা। কারণ করোনা কবে শেষ হবে, কীভাবে শেষ হবে তা পুরোটাই অনিশ্চিত অথচ এসব প্রবাসীদের তাদের কর্মস্থলে ফিরে যেতে হবে। সেটি কীভাবে ও কখন হতে হবে তা দুই রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে হবে। এখানে প্রবাসীরা নিজেরা কিছু করতে পারবেন না। করোনা পরিস্থিতি যদি চলতেই থাকে তাহলে কীভাবে প্রবাসীরা সৌদি আরবে পৌঁছাবেন, যদি পৌঁছাতে বিলম্ব হয় তাহলে কী করা, ইত্যাদি বিষয় ভালোভাবে রাষ্ট্রীয পর্যায় থেকে করা প্রয়োজন। বিক্ষোভে অংশ নেয়া সৌদি প্রবাসীদের দাবির মধ্যে প্রধান দাবি হচ্ছে আকামা বা ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি করা। যারা রিটার্ন টিকিট নিয়ে দেশে এসেছেন তারা যেন সেই টিকিটে ফিরে যেতে পারেন। এছাড়া টিকিটের মূল্য বৃদ্ধি ও টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে কালোবাজারিদের প্রভাবমূক্ত করার দাবিও জানিয়েছেন। সৌদি এয়ারলাইন্সে কর্মরত আনসাররা টাকার বিনিময়ে টিকিট আবেদনের সিরিয়াল পরিবর্তন করেন বলে অভিযোগ এসেছে। অর্থাৎ যে যেখানে এবং যতটুকু পারছেন দু’পাইস কামাচ্ছেন দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে। কেউ যেন পিছিয়ে নেই, এতটুকু সুযোগও কেউ হাতছাড়া করছেন না। আমরা মনে করি এসব ক্ষেত্রে সরকারি প্রকৃত আন্তরিকতা ও প্রচেষ্টা থাকতে হবে।

অমরা সবসময়ই প্রত্যক্ষ করি রাস্তায়, ফেরিঘাটে মাইলের পর মাইল, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে শত শত গাড়ি, হাজার হাজার মানুষ নারী-শিশুসহ চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ে থাকে। দেখা যায় সেখানে কোনো সরকার নেই, পেঁয়াজের বাজার আলুর বাজার যখন যার ইচ্ছে বাড়িয়ে দিয়ে কয়েক কোটি টাকা কামিয়ে নিল, এখানে কোনো সরকার নেই। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি এখানে কোনো সরকার নেই। প্রবাসীরা দেশে এসেছে তারা করোনার কারণে আটকা পড়ে আছেন কীভাবে যাবেন, কীভাবে তাদের চাকরি রক্ষা হবে এসব তো কূটনৈতিক মিশনের কাজ, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাজ।

দেখা যাচ্ছে প্রবাসীদের নিজেদেরই এসব ব্যবস্থা করতে হয়। যখন তাদের সীমার মধ্যে থাকে না তখন তারা রাষ্ট্রের আশ্রয় নেন। তারা সাধারণভাবে অভিযোগগুলো জানাতে থাকেন। যখন দেখা যায়, তাতে কাজ হয় না তখন তারা রাস্তা অবরোধ, মন্ত্রণালয় অবরোধের মতো কঠিন কোনো কর্মসূচি দেন, তখন রাষ্ট্রের হুঁশ হয় এবং তড়িঘড়ি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নেমে পড়ে। তারা যাওয়ার পর যদি আবার তাদের ফেরত পাঠানো হয় তখন সংকট আরও বাড়বে।

অতএব, সব ধরনের ক্লিয়ারেন্স তাদের হাতে নিয়ে যাওয়াটা খুব জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সরকারি প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, কথা বলার চেয়ে কাজে দেখাতে পারলে সবাই সব মহল এমনিতেই জেনে যায় যে, কাজ হচ্ছে, সরকার কাজ করছে। সেগুলো মুখে বলে বলে প্রচার করার আর প্রয়োজন হয় না।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, বর্তমানে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত এবং প্রেসিডেন্ট- ইংলিশ টিচার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইট্যাব), সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও বাউবি-র শিক্ষক ।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]