মুজিববর্ষে স্মরণীয় শেখ হাসিনার জন্মদিন

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৫১ পিএম, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

অধ্যাপক ড. এস. এম. আনোয়ারা বেগম

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিবের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ সন্তান। স্কুল জীবন থেকে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ষাটের দশকে তিনি স্কুলে পড়াবস্থায় আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে কলেজ ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। বিরামহীন এই যাত্রা অবিরাম গতিতে ৭৪-এ পা দিয়েও দীপ্তমান। যা ক্ষণিকের জন্যও থেমে থাকেনি। নানা বাধাবিপত্তি, ঘাতপ্রতিঘাত, যড়যন্ত্র, হত্যার প্রচেষ্টা কোন কিছুই তাকে দমাতে বা থামাতে পারেনি কোন চক্র। সফলতা তাঁর এখানেই যে তিনি পিছু হটেননি, ভয় পাননি, বরং সাহসের সাথে দৃঢ়চিত্তে শুধু তিনিই নন, তাঁর একমাত্র পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং একমাত্র কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে ও সম্পৃক্ত করেছেন আধুনিক উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ভয়াল রাতে প্রায় সপরিবারে ঘাতকচক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দু’বোন জার্মানিতে অবস্থানের কারণে প্রাণে বেঁচে যান।

এমন ভয়াবহ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সব বাধা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলার মাটিতে পা দেন এবং আওয়ামীলীগের ‘ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলকে সুসংগঠিত করেন। ১৯৯৬ সালের দীর্ঘ ২১ বছর পর প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেন। ২০০৮ সালে দ্বিতীয়, ২০১৪ সালে তৃতীয় এবং ২০১৮ সালে চতুর্থবারের মতো নির্বাচনে জয়লাভ করে চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে প্রথম মেয়াদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করেছেন। ‘শান্তি চুক্তি’ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পদ্মা নদীর পানি বণ্টনে ঐতিহাসিক চুক্তি করে মৃত প্রায় নদীটিকে আবার জীবন্ত করেছেন।

২০০৯ সালে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রস্ফুটিত করেছেন, প্রজ্বলিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সুদীর্ঘ ২৪ বছরের লড়াই সংগ্রাম আর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের নিকট তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। নতুন প্রজন্ম তা অনুধাবন করতে পারছে।

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের কোন দেশ যেখানে উন্নতির এমন অসাধ্যসাধন করতে পারেনি, যেমন পেরেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ। একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে, নিম্ন মধ্যম আয়ের পথ পেরিয়ে উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলার নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তাঁর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে সক্ষম হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে সুদূর প্রসারী ‘ভিশন’ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। তাঁর মূল ‘ভিশন’ ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা।

বঙ্গবন্ধু কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানচিত্র দ্বিগুণ হয়েছে, বেড়েছে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, বাড়ছে অর্থনৈতিক সক্ষমতা, হ্রাস পেয়েছে দারিদ্রের হার, খাদ্যে হয়েছে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিদ্যমান রয়েছে। জঙ্গী দমনে সফল হয়েছেন। দুর্নীতি দমনে কঠোর মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু কন্যা পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সুসম্পর্ক বজায় রেখে কূটনৈতিকভাবে চমকপ্রদ সাফল্য দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। মাথাপিছু গড় আয়ু ও বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। স্বাস্থ্যখাতে তিনি নিজ উদ্যোগে কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তৃনমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকার বিশেষ করে দারিদ্র বিমোচন, সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা এবং লিঙ্গ সমতা ব্যতীত ও MDG-র অন্যান্য লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

২০২১ এর মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশে ও বাংলাদেশকে একটি মাঝারি আয়ের দেশ হিসেবে গঠন করতে ICT অ্যাক্ট এবং আইসিটি পলিসি ২০০৯ এর দ্রুত বাস্তবায়ন , আইসিটির মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, কৃষি সংক্রান্ত তথ্য প্রদানে উন্নতি লাভ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম বার্তা দেওয়াসহ সামাজিক নিরাপত্তা জাল সৃষ্টি এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন দ্রুততর করা সম্ভব হচ্ছে। স্কুল, ট্রেনিং কলেজ, স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের ৪৫০০০ পোস্ট অফিস এবং সম্প্রতি ৪৫০৩টি ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা সেন্টার ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং গ্লোবাল ওয়ারমিং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোযোগ সুদূরপ্রসারি। তিনি পৃথিবীকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য জাতিসংঘে সম্প্রতি পাঁচ দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করে জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কামনা করেছেন।

প্রথম প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে পৃথিবীকে এবং নিজেদের রক্ষার জন্য আমি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবশ্যই জোরালো আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় উৎসাহিত করার পরামর্শ দেবো। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের ৭৫তম সাধারণ অধিবেশনে জলবায়ু সংক্রান্ত ভার্চুয়াল গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ প্রস্তাব দেন।

দ্বিতীয় প্রস্তাব: বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখতে হবে এবং সমস্ত প্যারিস সংবিধান বাস্তবায়ন করতে হবে।

তৃতীয় প্রস্তাব: দুর্বল দেশগুলোকে প্রতিশ্রুতি তহবিল সরবরাহ করতে হবে।

চতুর্থ প্রস্তাব: দুষণকারী দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের এনডিসি (জাতীয় নির্ধারিত অবদান) বাড়াতে হবে।

পঞ্চমত প্রস্তাব: জলবায়ু শরণার্থীদের পুনর্বাসন একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

তিনি জলবায়ু ও পানি ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ প্রস্তত রেখেছেন।

শেখ হাসিনার দূরদর্শি নেতৃত্বগুণের সাথে যুক্ত হয়েছে মানবতাগুণ। তিনি মিয়ানমারের নাগরিক প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের বুকে মানবিকতার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। শান্তি, মানবতাবাদ, জনকল্যাণ এবং সর্বোপরি মানুষের প্রতি সর্বদা শাসক নয়, সেবা প্রদানকারী বিবেচনায় নোবেল শান্তি পুরস্কার বিবেচনায় নেয়া যায়।

করোনাকালে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কারোনা মহামারির মধ্যেও দেশ ও মানুষের জন্য দিনরাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনগণের জীবন ও জীবিকা নিশ্চিত করতে দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি এবং একের পর এক নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ভবিষৎ দুর্যোগ মোকাবিলার কথা চিন্তা করে সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনাসমূহ সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব নির্দেশনা বই আকারে ৫টি ভলিউমে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎতের কথা চিন্তা করে নির্দেশনাগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে করোনা মোকাবেলায় সরকারের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যায়।

কোভিড-১৯ মহামারী থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং জীবিকা নিশ্চিত করতে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার ২১টি প্রণোদনা প্যাকেট ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ।

করোনা মহামারীর মধ্যে ও নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জনগণের জীবন জীবিকা নিশ্চিত করতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক যার হাত ধরে একদিকে বঙ্গবন্ধুর আজীবনের লালিত স্বপ্ন ‘সোনার বাংলা’ বাস্তবায়ন আর অন্যদিকে বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে একটি সুখী সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সফল নায়ক বাংলার কাণ্ডারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে শুভ জন্মদিন ও অভিনন্দন। মুজিববর্ষে তোমার জন্মদিন স্মরণীয় হয়ে থাক। শতবর্ষ নিয়ে বেঁচে থাকো প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।
লেখক : ডিন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ও চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, সাবেক সদস্য, পিএসসি।

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]