চীনের জাতীয় দিবসের প্রেক্ষিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

শান্তা মারিয়া
শান্তা মারিয়া শান্তা মারিয়া , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:০৭ এএম, ০১ অক্টোবর ২০২০

চীনের জাতীয় দিবস আজ। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় পিপলস রিপাবলিক অব চায়না। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং সমাজতান্ত্রিক আদর্শে দেশ পরিচালনার ভার গ্রহণ করে।

এ বছর চীন ও বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক পঁয়তাল্লিশ বছর অতিক্রম করছে। সেদিক থেকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে একথা বলা যায়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন অংশীদার চীন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের একাধিক বৈঠক ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ট করেছে।

চীন এখন বিশ্বের নতুন অর্থনৈতিক পরাশক্তি। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন সবচেয়ে বড় উৎপাদক রাষ্ট্র। একটা কথা প্রচলিত আছে যে, চাঁদের বুকে তাকালে যদি মার্কিন পতাকা চোখে পড়ে তাহলে সেই পতাকাকে বড় করে দেখলে সেখানে মেইড ইন চায়না লেখা কথাটিও চোখে পড়বে।

চীনা পণ্য এখন সারা বিশ্বে একেবারে মানুষের ঘর গৃহস্থালির ভিতরে যেভাবে প্রবেশ করেছে তাতে মার্কিন রাজনীতির সাম্প্রতিক চীন-বিরোধী জিগির তুলেও পরিস্থিতি বদলের আর কোন উপায় ট্রাম্প সরকারের সামনে খোলা নেই।

এ বছর বাংলাদেশে যে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ বইটি প্রকাশিত হয়েছে সেটি হলো, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্মৃতিমূলক বই ‘আমার দেখা নয়া চীন’। আমাদের প্রাণের মুজিববর্ষে প্রকাশিত এ বইটি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, জনগণের প্রতি ভালোবাসা ও দেশের উন্নয়নের জন্য তাঁর আবেগ ও পরিকল্পনাকে যেমন প্রকাশ করেছে তেমনি নতুন চীনের প্রতি তাঁর সমর্থনমূলক দৃষ্টিভঙ্গীকেও তুলে ধরেছে। বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক উন্নয়নে বইটি নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক।

এ বছর কোভিড ১৯ মহামারির সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে চীনে যে বন্ধুত্বের স্মারকস্বরূপ মেডিকেল সামগ্রী উপহার হিসেবে পাঠানো হয় সেটি ছিল শেখ হাসিনা সরকারের অত্যন্ত সুবিবেচনার পরিচায়ক একটি সিদ্ধান্ত। এর বিনিময়ে আমরা দেখেছি লক ডাউনের মধ্যেও চীনের চিকিৎসক দলের বাংলাদেশে আসা, মেডিকেল সামগ্রী উপহার হিসেবে পাঠানোসহ বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ড যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সেইসঙ্গে চীনে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যের শুল্ক মুক্ত প্রবেশাধিকারের সাম্প্রতিক ঘোষণাও দুই দেশের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠতর করেছে। বিশ্বে চীন এখন উদীয়মান সূর্য। তাই সেদিকে বন্ধুত্বের প্রকাশ ঘটিয়ে বাংলাদেশ কূটনীতির ক্ষেত্রে সুবিবেচনারই পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নতুন নয়। চীনের সঙ্গে সুপ্রাচীনকাল থেকেই বঙ্গভূমির সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক যেমন সাংস্কৃতিক তেমনি অর্থনৈতিক। ফা হিয়েন,(ফা শিয়েন) হিউয়েন সাং(শুয়েন চাং), মা হুয়ানসহ আরও অনেক চীনা পর্যটক প্রাচীন বাংলায় এসেছিলেন।

প্রাচীন বাংলার সামাজিক ইতিহাসের মূল্যবান দলিল আমরা তাদের কাছ থেকেই পেয়েছি। পক্ষান্তরে বাংলার চর্যাপদের কবি ও নাথপন্থার গুরু মৎসেন্দ্রনাথ বা মীননাথ এবং তার শিষ্য নাথপন্থী বিখ্যাত গুরু গোরক্ষনাথ যখন তিব্বতে যান এবং সেখানেই অন্তিমকাল পর্যন্ত জীবন অতিবাহিত করেন তখন অনিবার্যভাবে তারা বাংলার সহজসাধন জ্ঞানকে এবং দোহা বা বুদ্ধিস্ট মিস্টিক সং ও বাংলার সংস্কৃতিকে সেখানে বয়ে নিয়ে যান। বাংলার পণ্ডিত অতীশ দীপংকর যখন তিব্বতে যান তিনিও একইভাবে শুধু বৌদ্ধশাস্ত্রকেই নয় বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকেও চীনে নিয়ে গিয়েছিলেন।

প্রাচীনকালে চীনের রেশম পথ ছিল বিশ্বের প্রধানতম বাণিজ্য পথ। চীনের শিয়ান শহর থেকে শুরু হয়ে এই পথ চীন সাম্রাজ্যের বিভিন্ন নগর ছুঁয়ে মধ্য এশিয়ার ভিতর দিয়ে চলে গিয়েছিল রোম মহানগরী পর্যন্ত। এই সিল্ক রুট বা রেশম পথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাশগড়, সমরখন্দ, বুখারা, গুরগঞ্জসহ কত ইতিহাসখ্যাত শহরের নাম।

শেরশাহের আমলে যে গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড নির্মিত হয় তা দিল্লি থেকে বাংলা পর্যন্ত পৌঁছায়। এই পথ দিল্লি থেকে রেশমপথের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে রেশমপথের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাংলার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। বাংলার মসলিন ও সুতিবস্ত্র যেমন চীন, আরব, মিশর, গ্রিস ও রোমে পৌঁছায় তেমনি চীনের রেশমও পৌঁছে যায় বাংলায়।

বাংলার প্রাচীন রাজধানী সোনার গাঁও এর সঙ্গে চীনের কেন্দ্রভূমির মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন তখন থেকেই প্রচলিত ছিল। বাংলার অভিজাত সমাজ যেমন রাজা, সুলতান, ভূস্বামীরা চীনের রেশম ব্যবহার করতেন। তেমনি বাংলার মসলিন এবং সুতিবস্ত্র চীনে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

সুপ্রাচীন সেই রেশম পথকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলতে নতুন শতাব্দিতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনের সবচেয়ে আলোচিত কর্মসূচি হলো ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইনিশিয়েটিভ (এক অঞ্চল এক পথ উদ্যোগ)।‘এক অঞ্চল এক পথ’ নামে রেশমপথ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে মৈত্রী গড়তে চাইছে চীন। চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সি চিন পিং এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচিকে ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সংক্ষেপে বলা যায়, চীন এখন এক অঞ্চল এক পথ নামে প্রাচীন রেশম পথ অঞ্চলকে নতুনভাবে জাগাতে চাচ্ছে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে চাচ্ছে। বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটাচ্ছে তারা। এর সুবিধাভোগী হচ্ছে এশিয়ার রেশমপথ অঞ্চলের দেশগুলো। বাংলাদেশও এই বলয়ের বাইরে নয়। শুধু মধ্য, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিই নয়, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গেও সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়াতে চাচ্ছে চীন। এক অঞ্চল এক পথ থেকে বাংলাদেশ এরমধ্যেই লাভবান হওয়া শুরু করেছে।

চীনা ব্যবসায়ীরা এরমধ্যেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করছেন। বিনিয়োগ আরও বাড়বে। চীনের কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা যেন বাংলাদেশ পেতে পারে সে জন্য চীনের সৃষ্ট সুযোগগুলোর সদ্ব্যবহার করতে হবে পুরোমাত্রায়। প্রচলিত পণ্যের বাইরেও বাংলার আরও অনেক রপ্তানি পণ্য রয়েছে, রয়েছে সুলভ শ্রমশক্তি। চীন এখন অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ এশিয়ায় স্থাপন করতে চলেছে। কারণ তাদের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রমশক্তি অপেক্ষাকৃত সুলভ। প্রতিবেশীদের তুলনায় এ সুযোগ গ্রহণে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। চীনের সঙ্গে বিনিময় বাড়াতে আমাদের অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। আর তা করতে হবে দ্রুত।

বাংলাদেশের হোটেল ও পর্যটন ব্যবসায় চীনা ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ শুরু করেছেন। বিনিয়োগের আরও অনেক খাত রয়েছে। বস্ত্র ও চামড়ার মতো শিল্পখাত এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশলের মতো মাঝারি ও ভারি শিল্পখাতে চীনা ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করতে পারেন।

চীনে প্রচুর বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী রয়েছেন। বাংলাদেশীদের জন্য চীন সরকারের অনেক স্কলারশিপও রয়েছে। এই শিক্ষার্থীরা চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে সেখানেই কিভাবে কর্মসংস্থান করতে পারেন সে বিষয়েও রয়েছে অনেক সুযোগ।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব যত দৃঢ় হবে দুটি দেশই ততো বেশি উপকৃত হবে। চীন বাংলাদেশের বন্ধুত্বকে তাই আরও দৃঢ় করতে হবে। পুরনো রেশম পথের মতো নতুন রেশম পথ যুগেও যেন চীন ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত থাকে।

পহেলা অক্টোবর থেকে সাতদিন চীনের উৎসব। জাতীয় দিবস তো রয়েছেই সেইসঙ্গে আছে ঐতিহ্যবাহী মধ্য শরৎ উৎসব। চীনের অন্যতম প্রধান উৎসব হলো মধ্য শরৎ উৎসব বা মিড অটাম ফেস্টিভাল। এটি শরৎকালীন বা হেমন্তকালীন প্রধান উৎসব। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুপ্রাচীন চন্দ্রদেবীর আরাধনা এবং ফসল তোলার রীতি রেওয়াজ। এই উৎসব হয় চীনের চান্দ্র পঞ্জিকা বা লুনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অষ্টম চান্দ্র মাসের ১৫তম দিনে বা শরতের ভরা পূর্ণিমার রাতে।

২০২০ সালে এ দিনটি পড়েছে ১ অক্টোবর। চীনের উৎসবগুলো বেশিরভাগই চাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রাচীন তাও ধর্ম, কনফুসিয়াসের ধর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের সঙ্গে মিলেছে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার বছর ধরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বিভিন্ন লোকজ ধর্ম, রীতিনীতি, প্রাচীন প্রথা ইত্যাদি। এসবগুলোই এখন যত না ধর্মীয় তারচেয়ে অনেক বেশি সাংস্কৃতিক উৎসব। মধ্য শরৎ উৎসবের চীনা নাম হলো চোং ছিউ চিয়ে।

বাংলাদেশের ভালো বন্ধু ও উন্নয়ন অংশীদার চীন ও চীনের বন্ধু প্রতীম জনগণকে তাদের এই উৎসবে শুভ কামনা জানাই। ভবিষ্যতে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব ও উন্নয়ন সম্পর্ক আরও জোরদার হবে এমনটি প্রত্যাশা করি।

লেখক : কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/পিআর

চীনে প্রচুর বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রী রয়েছেন। বাংলাদেশীদের জন্য চীন সরকারের অনেক স্কলারশিপও রয়েছে। এই শিক্ষার্থীরা চীনের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ শেষে সেখানেই কিভাবে কর্মসংস্থান করতে পারেন সে বিষয়েও রয়েছে অনেক সুযোগ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]