শমী কায়সারের বিয়ে এবং আমাদের ধর্ষকামী মন

প্রভাষ আমিন
প্রভাষ আমিন প্রভাষ আমিন , হেড অব নিউজ, এটিএননিউজ
প্রকাশিত: ১০:১৩ এএম, ১২ অক্টোবর ২০২০

দেশজুড়ে যখন ধর্ষণ এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ঝড় বইছে। তখন শমী কায়সারের বিয়ে আরেকটি পাল্টা ঝড় বইয়ে দিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিপুলসংখ্যক মানুষ তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। তার চেয়েও বেশি মানুষ অশ্লীল বাক্যবাণে তাকে ঘায়েল করতে চেয়েছে। বিয়ে একজন ব্যক্তির পছন্দ, ইচ্ছা, স্বাধীনতা। এখানে আমাদের বলার কিছু নেই, থাকা উচিত নয়। তবুও শমী কায়সার একজন সেলিব্রেটি। কিন্তু তার বিয়ে নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবল কৌতূহল থাকা আর অশ্লীল বিদ্বেষ প্রকাশ করা এক ব্যাপার নয়। ভেবেছিলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই নোংরামি এড়িয়ে প্রিয় অভিনেত্রী ও প্রিয় বন্ধু শমীকে ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানাব। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ঝড়-ঝাপ্টা দেখে শেষ পর্যন্ত কি-বোর্ডে আঙুল চালাতেই হলো।

হাতেগোনা দু-একটি সিনেমায় অভিনয় করলেও শমী কায়সার ছিলেন টেলিভিশন অভিনেত্রী এবং তুমুল জনপ্রিয়। আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন দেখে। তখন ছিল সুবর্ণা মুস্তাফার একক সাম্রাজ্য। এরপর দীর্ঘদিন চলেছে শমী-বিপাশার দ্বৈত সাম্রাজ্য। মাঠে যেমন আবাহনী-মোহামেডান, সিনেমায় যেমন ববিতা-শাবানা, গানে যেমন রুনা-সাবিনা; তখন টেলিভিশনেও তেমন শমী-বিপাশা। এ দুজনের স্নিগ্ধ উপস্থিতি আমাদের মধ্যবিত্তদের আকৃষ্ট করেছে। অভিনয় ছেড়ে শমী এখন পুরোদস্তুর ব্যবসায়ী, এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচিত নেতা।

অভিনয় ও ব্যবসায়ী পরিচিতির বাইরেও শমী কায়সার পারিবারিকভাবে অনন্য গৌরবের উত্তরাধিকারী। তার পিতা শহীদুল্লাহ কায়সার সাংবাদিক ও লেখক; ’৭১ সালে রাজাকার-আলবদররা যাকে তুলে নিয়ে গেছে, যিনি আর ফিরে আসেননি। হারিয়ে যাওয়া ভাইকে খুঁজতে গিয়ে নিজেও চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছেন শমী কায়সারের চাচা, এ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার ও লেখক জহির রায়হান। পাকিস্তানি হানাদাররা যখন বুঝতে পারে তাদের পরাজয় নিশ্চিত, তখনই মরণ কামড় দেয়। স্বাধীনতা পেলেও যেন বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে, সে কারণে বিজয়ের আগ মুহূর্তে এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের সহায়তায় তালিকা ধরে ধরে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের তুলে নিয়ে যায়। তাই শহীদ জায়া বা শহীদ সন্তানদের প্রতি আমার বিশেষ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আছে। আমাদের একটি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দিতে তারা তাদের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। স্বাধীনতার পর, বিশেষ করে ‘৭৫ এর পর শহীদ পরিবারগুলো যে কঠিন সময় পার করেছে অবর্ণনীয়।

একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়েছে, সেদিনই শুরু হয়েছিল শহীদদের পরিবারের নতুন যুদ্ধ, টিকে থাকার লড়াই। সেই শহীদ পরিবারের সন্তানরা যখন আজ উৎকর্ষের চূড়ায়, সাফল্যে ঝলমল করছে; তখন আমাদের মন ভালো হয়ে যায়। তারা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য লড়াই করেননি, তাদের পিতা যে আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছেন, সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে মাঠে নেমেছেন। শহীদ সন্তানরা ১৯৯১ সালে গড়ে তোলে প্রজন্ম '৭১। এই সংগঠনটির সাথে আমার আত্মার যোগাযোগ। আমার জন্ম গণঅভ্যুত্থানের বছর মানে ১৯৬৯ সালে। প্রজন্ম '৭১ এর অনেকের জন্মই তার আগে-পড়ে। তাই তাদের সাথে নৈকট্যটা অনেক বেশি। প্রজন্ম '৭১ এর অনেকের সাথেই আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা আছে। এসব কারণে শমী কায়সার আমার বিশেষ পছন্দের এবং তার প্রতি আমার বিশেষ পক্ষপাতও।

কিন্তু যদি শমী কায়সার শহীদ সন্তান না হতেন, জনপ্রিয় অভিনেত্রী না হতেন, সফল ব্যবসায়ী না হতেন, আমার সাথে ব্যক্তিগত পরিচয় নাও থাকতো; তাও তো তিনি বাংলাদেশের একজন মানুষ, একজন নারী। তার পছন্দ-অপছন্দ করার, বিয়ে করার, বিয়ে ভাঙার, একাধিক বিয়ে করার, একা থাকার স্বাধীনতা আছে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন মেনে একজন নারীর, একজন মানুষের যা ইচ্ছা তাই করার স্বাধীনতা আছে, অধিকার আছে। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের দেশে নারীর অধিকার আর মানুষের অধিকার সমান্তরাল নয়। আইনে, কাগজে-কলমে সমান হলেও আমাদের পুরুষতান্ত্রিক নোংরা মানসিকতা নারীকে পুরোপুরি মানুষ ভাবতে দেয় না। তাই তো শমী কায়সারের বিয়ে, মিথিলার বিয়ে, গুলতেকিনের বিয়ে নিয়ে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। যার বিয়ে তার খবর নাই, ফেসবুকপড়শির ঘুম নাই।

এ বয়সে বিয়ে করতে হবে কেন, এত বড় মেয়ে রেখে বিয়ে করতে হবে কেন, ভিনদেশি বিয়ে করতে হবে কেন, ভিন্ন ধর্মের কাউকে বিয়ে করতে হবে কেন, এতগুলো বিয়ে করতে হবে কেন? হাজার প্রশ্ন, হাজার কৌতূহল, মুরুব্বিপনার শেষ নেই। আরে ভাই, যার যাকে পছন্দ সে তাকে বিয়ে করবে। আপনার এত মাথাব্যথা কেন? আপনার কাছে কেউ সাহায্য চেয়েছে? নারী তোমার এসব প্রশ্ন শোনারই দরকার নেই। তুমি স্বামী নিয়ে মধুচন্দ্রিমায় যাও। প্রেমে বয়স, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী, দেশ কোনো বিষয় নয়। তোমার জীবন তোমারই। সেটা নিজের মতো যাপন করার পূর্ণ অধিকার তোমার আছে। ১৬ বছরের পর যেকোনো বয়সে বিয়ে করার, বিয়ে ভাঙার, আবার বিয়ে করার, আবার ভাঙার, একা থাকার ধর্মীয়, আইনগত এবং নৈতিক অধিকার তোমার আছে।

বলছিলাম বাংলাদেশে মানুষের অধিকার আর নারীর অধিকারের আলাদা ধরন সম্পর্কে। বাংলাদেশের কোনো সেলিব্রেটি পুরুষ তিনটা কেন চারটা বিয়ে করলেও কেউ আপত্তি করবেন বলে মনে হয় না বা করলেও মৃদু- না করলেও পারতো। বরং বাংলাদেশে কারও স্ত্রী মারা গেলে বা ডিভোর্স হয়ে গেলে দুই মাস যেতে না যেতেই আত্মীয়-স্বজন তাকে বিয়ে করানোর জন্য উঠেপড়ে লাগে। পুরুষ মানুষের নাকি সঙ্গী লাগে। কেন ভাই নারীদের বুঝি সঙ্গী লাগে না। পুরুষ একদমই একা থাকতে পারে না। দ্রুততম সময়ের মধ্যেই সঙ্গী খুঁজে নেয়। আর নারীরা সঙ্গী খুঁজতে গেলেই পুরুষদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। শমী কায়সারের বিয়ের পর আকাশটা শুধু পুরুষদের মাথায় নয়, অনেক নারীর মাথায়ও ভেঙেছে। তবে তারা নারী হলেও মাথায় ধারণ করেন পুরুষতান্ত্রিকতা। বাংলাদেশে কোনো নারী দ্বিতীয় বিয়ে করতে গেলেই সমাজে গেল গেল রব ওঠে। তৃতীয় বিয়ে মানে তো যেন কেয়ামতের আলামত। একজন নারী তৃতীয় বা চতুর্থ বিয়ে করতে পারবেন না; এটা কোন আইনে, কোন ধর্মে লেখা আছে? ধর্ম এবং আইন যদি অনুমোদন করে, সমাজের সমস্যা কোথায়?

শমী কায়সারের নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা। তবে আমি তাকে অভিনন্দন জানাই সাহসিকতার জন্য। ঘুনে ধরা সমাজকে থোরাই কেয়ার করে নিজের হৃদয়ের ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য, নিজের পছন্দকে বেছে নেয়ার জন্য। আমি চাই সব নারী, সব মানুষ তার পছন্দের জীবনযাপন করুক। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক নারী এটা পারেন না, পারার কথা কল্পনাও করতে পারেন না, আরও অনেকদিন পারবেনও না। শমী কায়সার পেরেছেন তিনি শমী কায়সার বলে, তিনি স্বাবলম্বী বলে, তার পরিবার তাকে সাপোর্ট করেছে বলে। তার ভাগ্য ভালো। কিন্তু বাংলাদেশে অসংখ্য নারীর কপাল তার মতো ভালো নয়। তাদের অনেককেই শত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, নির্যাতন, অবহেলা নিয়ে আজীবন অনিচ্ছার সংসার টেনে নিতে হয়। কারণ তাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। তাই তারা নিজেদের সংসার করা না করা বা বিয়ে ভেঙে দেয়া বা আবার বিয়ে করার কথা ভাবতেই পারে না। শমী কায়সার চিরনির্যাতিত সেই নারীদের সামনে সাহস হয়ে দাঁড়ালেন।

তবে নারীদের পছন্দ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে। নইলে আপনি কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারবেন না। সারাজীবন অনিচ্ছুক সংসারের ঘানি টেনে যেতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের সমস্যা হলো, গ্রামের অশিক্ষিত, অবহেলিত নারীরা তো বটেই; শহরের শিক্ষিত নারীরাও নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভাবেন না, স্বাবলম্বী হওয়ার কথা ভাবেন না। স্বামী-সন্তান সংসারকেই ধ্যান-জ্ঞান মানেন। কখনো হঠাৎ করে পছন্দ-অপছন্দের প্রশ্ন আসলে, তখন আর তার করার কিছু থাকে না।

ধরুন বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের দুই শিক্ষার্থী প্রেম করে বিয়ে করলেন। মেধায় নারী এগিয়ে থাকলেও তিনি কিন্তু তার স্বামীর জন্য নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেন। অথচ স্বামীর চেয়ে তার ক্যারিয়ার ভালো হতে পারতো। স্বামী-সন্তান-সংসারের জন্য নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছেন, এমন অসংখ্য নারী আছেন। কিন্তু দারুণ মেধাবী স্ত্রীর জন্য নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করেছেন, এমন উদাহরণ বিরল। আমাদের পৌরুষে আঘাত লাগে। এই যে শহীদ পরিবারের কথা বললাম। একাত্তরে স্বামী হারানো নারীদের প্রায় সবাই কিন্তু বাকি জীবনটা বৈধব্যেই মুক্তি খুঁজেছেন, সন্তান মানুষ করাকেই জীবনের ধ্যান-জ্ঞান মেনেছেন; নিজের চাওয়া-পাওয়ার কথা ভাবেননি। কিন্তু একাত্তরে স্ত্রী হারিয়ে সন্তানদের জন্য আর বিয়ে করেননি, এসন কাউকে আপনারা চেনেন?

নিজের পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিতে হলে নারীদের সবকিছুর আগে নিজের ক্যারিয়ার, নিজের স্বাবলম্বী হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেটার জন্য যে সবাইকে অনেক পড়াশোনা করতেই হবে, তা কিন্তু নয়। যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী, সে সে আয় করবে। সব নারীকে ডাক্তার বা ব্যাংকার হতে হবে এমন নয়। আপনি গার্মেন্টসে কাজ করুন, ছোট ব্যবসা করুন, নিদেনপক্ষে বাড়িতে দুইটা গরু পেলে দুধ বিক্রি করুন। কোনোদিন কোনো পুরুষ যেন আপনাকে ভাতের খোঁটা দিতে না পারে। সংসারটা যখন দুজনের হবে; তখন সেখানে সাম্য আসবে, মর্যাদা আসবে, পারস্পরিক আস্থা-ভালোবাসা থাকবে। নইলে স্বামী আপনাকে মনে মনে হলেও লাগেজ মনে করবে। এই সুযোগ কখনো কাউকে দেবেন না। শমী কায়সার যতদিন ভালো লেগেছে প্রথম সংসার করেছেন। যতদিন ভালো লেগেছে দ্বিতীয় সংসার করেছেন। যতদিন ইচ্ছা একা ছিলেন। এখন আবার পছন্দের সঙ্গী বেছে নিয়েছেন। শমী কায়সারের পঞ্চাশ পেরিয়েছে তাতে আপনার সমস্যা কোথায়?

দেশজুড়ে যখন ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শমী কায়সার কেন পঞ্চাশ পেরিয়ে তৃতীয় বিয়ে করলেন, তা নিয়ে তাকে যে ভাষায় আক্রমণ করা হলো, সেটা কি অপরাধ হিসেবে কারও অংশে কম? ধর্ষণ শুধু শারীরিকভাবেই হয় না। চোখ দিয়ে, কথা দিয়ে, ভাষা দিয়ে, মানসিকতা দিয়েও নারীকে ধর্ষণ করা যায়। এক শমী কায়সারের বিয়ের ঝড় আমাদের চারপাশের অনেক সম্ভাব্য ধর্ষকের মুখ থেকে করোনা মাস্কের নিচে থাকা ভদ্রতার মুখোশটাও উড়িয়ে নিয়েছে। তাদের মগজভর্তি নোংরা আবর্জনা আমরা সবাই দেখে ফেলেছি। সুযোগ পেয়েই তারা শমী কায়সারের বিয়ের বিভিন্ন লিঙ্কের নিচে এবং ফেসবুকে ঢেলে দিয়েছে নিচের অবদমিত আকাঙ্ক্ষার কথা, নোংরা ভাষায়। সুযোগ পেলে তারাই নারীকে ধর্ষণ করবে। ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনটা আরও বিস্তৃত করে, এই সম্ভাব্য ধর্ষকদের বিরুদ্ধেও সামাজিক আন্দোলন গড়তে হবে।

আর প্রিয় শমী কায়সারের প্রতি অনুরোধ, আপনি সাহসী নারী, আপনি সবার অনুপ্রেরণা। আপনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই আবর্জনা থেকে আপাতত দূরে থাকুন। নিজের জীবনকে যাপন করুন নিজের মতো করে, আনন্দের সাথে। শুভকামনা।

১১ অক্টোবর, ২০২০

এইচআর/বিএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]