আত্মঘাতী নয় জীবনকে ভালোবাসতে হবে

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:১২ এএম, ১৪ অক্টোবর ২০২০

ফারিয়া ইয়াসমিন

বর্তমানে আত্মহত্যা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন মিলছে আত্মহত্যার খবর। স্বজনদের হাহাকার যেন বেড়েই চলেছে। যেকোনো সংকট বা সমস্যা সমাধানের পথ কখনোই আত্মহত্যা হতে পারে না। আত্মহত্যা বলতে স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়া বোঝায়। আত্মহত্যার সাথে শুধু একজন ব্যক্তির জীবন শেষ হয় না বরং শেষ হয়ে যায় পরিবারের আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বপ্ন। সামান্যতম কারণে জীবনকে যারা তুচ্ছ মনে করেন তারাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

কেন এই আত্মহত্যা? এর সমাধান কী? প্রতিনিয়ত প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হচ্ছি আমরা আর খুঁজে চলেছি এর উত্তর। প্রতিটি আত্মহত্যার পেছনে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট তবে এর কারণগুলো অজানা নয়। শুধু সমাধানের পথ সংকীর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। একটা জরিপ অনুযায়ী সারাবিশ্বে আত্মহত্যায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম যা ২০১১ সালে ছিল ৩৪তম। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে। পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা বেশি, বয়সের হিসাবে তরুণ-তরুণী বেশি আত্মঘাতী হচ্ছে।

আত্মহত্যার কারণ অনুধাবনের জন্য আমাদের সমাজ,পরিবার ও রাষ্ট্র কাঠামোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়- আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হলো মানসিক সমস্যা। মানসিক রোগ বা হতাশায় ভোগে নিজের আশপাশের সবকিছু নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে যা তাদের চিন্তাভাবনার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশ্বের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ হতাশা। বাংলাদেশের শতকরা ১৮-২০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো কারণে হতাশায় ভুগছেন। পারিবারিক সমস্যা, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, বেকারত্ব, বৈবাহিক সমস্যা, প্রেমে ব্যর্থ, স্বামীর নির্যাতন, ইভটিজিং এবং অর্থনৈতিক সংকট আত্মহত্যার অন্যতম কারণ।

সামাজিক সংহতি যদি নষ্ট হয়ে যায় তাহলে মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বোধ জন্ম নেয় যার ফলস্বরূপ হতাশা ঘিরে ধরে। হতাশার ফলে মানুষের মনে জীবনের প্রতি হতাশার মনোভাব চলে আসে যা তাকে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে। পরিবার হলো অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্র। পরিবার থেকে যেমন ভালো কিছু শেখা যায় তেমনি খারাপ প্রভাবগুলো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করে পরিবারের সদস্যদের। পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে আত্মহত্যা করাটা এখন সাধারণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হলো স্বাধীনচেতা মনোভাব। বর্তমানে সন্তান স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পছন্দ করে কিন্তু স্বাধীনভাবে চলাফেরা করা মানে যে, পরিবারের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করা নয় এটা তারা ভুলে যায়। পিতামাতার সাথে সন্তানের একটা দূরত্ব বজায় থাকার ফলে হতাশার কারণটাও তারা শেয়ার করে না বাবা মায়ের সাথে। ফলে সৃষ্টি হয় একাকীত্বর মনোভাব। যার ফলস্বরূপ আত্মহত্যার মতো ঘৃণিত সিদ্ধান্ত নেয় তারা।

মাদকাসক্তের হার বেড়ে যাওয়া প্রমাণ করে নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় কতটা ঘটছে। মাদকে আসক্ত মানুষ ধীরে ধীরে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যারা মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তি এমনিতেই বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে থাকে এর সাথে যদি সামাজিক ও পারিবারিক কোনো কারণ যুক্ত হয় তাহলে তারা আত্মহত্যা করতে দ্বিতীয়বার ভাবে না।

পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না করলে শিক্ষার্থীদের ওপর পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ভর করে। বর্তমানে প্রেমে ব্যর্থতার ফলে আত্মহত্যা অনেক বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু আত্মহত্যার কারণ উদঘাটন করলেই বোঝা যায়।

বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ফলে ১১.৮% এবং ভালোবাসায় কষ্ট পাওয়ার ফলে ১১.৮% আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ইভটিজিং, স্বামীর নির্যাতন ও যৌন হয়রানি এগুলোর ফলে অনেক মেয়েরা আত্মহত্যা করে। নির্যাতিত নারীরা মুক্তির পথ খোঁজে কিন্তু আসল মুক্তির পথ তারা জানে না; তারা জানে, আত্মহত্যায় মুক্তি মিলবে।

অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও আত্মহত্যার হার বেড়ে যায় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দেশে বিরাজমান পরিস্থিতি, সামাজিক বিশৃঙ্খলা এগুলোর ফলে আত্মহত্যার হার বেড়ে চলেছে।

আত্মহত্যা বন্ধে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সচেতনতা সবার আগে প্রয়োজন। নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা, সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক এইগুলো আত্মহত্যা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মাদকাসক্তদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রদানের ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে।

যাদের আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি যেমন মাদকাসক্ত ব্যক্তি, মানসিক রোগী, বেকার, সাংস্কৃতিকভাবে শ্রেণিচ্যুত এদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। যৌতুক,নির্যাতন ও উত্ত্যক্তকরণ এর ফলে যাতে আত্মহত্যা না ঘটে সে জন্য নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন প্রয়োজন।

বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ, জরিপ গবেষণা চলছে আত্মহত্যা নিয়ে। তবুও কেন কমছে না আত্মহত্যার হার? এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যায় আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। বিভিন্ন কর্মসূচি ও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে তবে আমাদের মাঝে এগুলো মেনে চলার ঘাটতি রয়েছে।

সমস্যা সমাধানের পথ হিসেবে আত্মহত্যাকে বেছে না নিয়ে, আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। জীবনকে ভালোবাসতে হবে। আমাদের জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশ। তাই আত্মহত্যাকে না বলা শিখতে হবে। আগামী প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]