পুঁজিবাজারে আবারও মন্দার হাওয়া

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:১৬ পিএম, ১৫ অক্টোবর ২০২০

ড. মো. বখতিয়ার হাসান

বিএসইসির নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশকিছু ইতিবাচক নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। যার দরুন ৩১ মে ২০২০ তারিখে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) পুনরায় চালু হওয়ার পর, দীর্ঘ দিনের মন্দাভাব কেটে বাজার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরে। সরকারের ইতিবাচক মনোভাব ও কমিশনের বেশকিছু ভালো সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদেরকে আশান্বিত করে। ধীরে ধীরে সূচক বাড়তে থাকে, যা বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসকে ফিরে আনতে সক্ষম হয়। এতে তারা বাজারে আবারও সক্রিয় হতে থাকে।

এমনকি যারা এতোদিন বাজার বিমুখ ছিলো তারাও ধীরে ধীরে বাজারে বিনিয়োগ করতে শুরু করে। যার দরুন বাজারের প্রধান সূচক পাঁচ হাজার পয়েন্টের মনস্তাত্বিক মাইল ফলক আবারও অতিক্রম করে। এর সঙ্গে লেনদেনও বাড়তে থাকে এবং গড় লেনদেন প্রায় হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যায়। সবকিছু মিলিয়ে বাজার ঠিকভাবেই চলছিল, কিন্তু গত ১৬ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাজার আবারও নিম্নমুখী ধারায় ফিরে যায়। মাঝখানে দুই-এক দিন সামান্য ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও তা ধরে রাখতে পারেনি। কী এমন হল যে, আশার আলো জাগায়ে বাজার আবারও মন্দা অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে?

বাজার পুনরায় চালু হওয়ার শুরু থেকেই আমি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিনিয়োগকারী উভয়কেই বিভিন্ন পরামর্শ ও সতর্কবার্তা দিয়ে আচ্ছি। কমিশন হয়ত খুবই আত্মবিশ্বাসী ছিল, এই জন্য হয়ত কোনকিছু কেয়ার করেনি। যাই হোক, বিগত এক মাসে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা আসলে বিনিয়োগকারীর পছন্দ হয়নি। আবার বাজার ব্যবস্থাপকদের অতিমুনাফালোভী আচরণও এই অবস্থার জন্য দায়ী।

প্রথমত, ওয়াটন বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে এক শতাংশেরও কম শেয়ার ছেড়ে পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেটা পুঁজিবাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন। একেইতো উচ্চমূল্য তার ওপর মাত্র এক শতাংশ শেয়ার হওয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় যোগানের পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় সঙ্কট তৈরি হয়েছে। যার ফলে, দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আবার এটা নিয়ে অনেক নেতিবাচক নিউজও হয়েছে। ২০১১ সালে উচ্চমূল্যের জন্য এমজেএল ও এমআই সিমেন্ট এর লিস্টিং অনেকদিন স্থগিত রাখা হয়েছিল। তারপর মূল্য পুনঃনির্ধারণ (কমিয়ে) করে লিস্টিং এর অনুমোদন দেওয়া হয়। ওয়াল্টনের ক্ষেত্রেও এরকম কিছু একটা করা যেত। তাহলে বাজারে খারাপ মেসেজ যেত না।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতির মূল সমস্যা হল এর বিডিং-এ। গুঞ্জন রয়েছে যে, কোম্পানি, মার্চেন্ট ব্যাংক, এমনকি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কিছু ব্যক্তির যোগসাজসে আইপিও অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে কাট অফ প্রাইস নির্ধারণ করে। আবার আইপিও পিছনে প্লেসমেন্ট বিজনেসের গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। এইসব নেতিবাচক খবরে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আবারও সঙ্কট হয়েছে। মাথাব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলতে হবে সেটা বলছি না। তবে, যেহেতু এই বুক বিল্ডিং পদ্ধতির এত সমস্যা এবং যেহেতু নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই পদ্ধতিতে সংঘটিত অনিয়ম ঠেকাতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, সেহেতু এই পদ্ধতিতে নতুন করে শেয়ার ইস্যু না করাই উচিৎ।

তবে আশার কথা হল যে, সাধারন বিনিয়োগকারীদের দাবীর প্রেক্ষিতে কমিশন কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে আইপিওতে আসা শেয়ারের বাজারমূল্য যদি অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, তবে ইস্যুয়ার কোম্পানিকে সেই শেয়ারগুলো ইস্যুমূল্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কিনে নিতে, তথা বাইব্যাক করতে হবে। এই আইন পাস হলে, বুক বিল্ডিং এর বিডিংয়ের যে অনিয়ম তা অনেকটায় কমে যাবে। এই আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত বুক বিল্ডিং পদ্ধতি বন্ধ রাখা উচিৎ। আর একটা কোম্পানি কখনও ১০ শতাংশের কম শেয়ার নিয়ে বাজারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিৎ নয়।

সম্প্রতিক সময়ে কমিশন অনেকগুলো কোম্পানিকে, বিশেষকরে ২৫টি ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে আইপিও মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের সবুজ সংকেত দিয়েছে। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে অধিকাংশের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভাল না। আবার, একটি বহুজাতিক মোবাইল কোম্পানিও পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আইপিও নিয়ে অন্তর্ভুক্তি হতে যাচ্ছে, যদিও কোম্পানির আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক এবং অদূর ভবিষ্যতে লভ্যাংশ প্রদান করার সক্ষমতাও নেই। পুঁজিবাজারে আইপিও আসবে এটা স্বাভাবিক এবং ইতিবাচক। এক্ষেত্রে কমিশন ও স্টক একচেঞ্জকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে, মিথ্যা তথ্য দিয়ে অতি মুল্যায়িত দেখায়ে অস্বাভাবিক অধিক মূল্যে না আসে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জ উভয়ই এই কাজ করতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে, যার খেসারত সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজারকে দিতে হয়েছে।

বাজার যেহেতু ইতিবাচক ধারায় ছিল এবং ধীরে ধীরে চাহিদা বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, সেহেতু কমিশনের উচিৎ ছিল ভাল মৌল ভিত্তিক কোম্পানির শেয়ার, বিশেষকরে সরকারি লাভজক কোম্পানির শেয়ার আস্তে আস্তে বাজারে নিয়ে আসা। বেসরকারি ও বহুজাতিক ভাল কোম্পানির শেয়ারও বাজারে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারত। কিন্তু সেটা না করে দুর্বল ও লোকসানি কোম্পানির শেয়ারের বন্যা বইয়ে দেয়ার প্রস্তুতিও শুরু করেছে, যা বাজারকে নেতিবাচক মেসেজ দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আবারও চিড় ধরেছে। তারা মনে করছে, বর্তমান কমিশন সেই আগের কমিশনের দেখানো পথেই হাঁটছে।

আর একটা বিষয় কয়েকদিন ধরে বাজারে গুঞ্জন হচ্ছে তা হল, ভাল কোম্পানির শেয়ার বাড়তে থাকলে কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জ সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিকে তলব করে, কিন্তু খারাপ মৌলভিত্তিক কোম্পানির ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটে না। বিগত কিছুদিন ধরে অনেক খারাপ মৌলভিত্তিক কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়া। উদাহরনস্বরূপ, ইন্স্যুরেন্স সেক্টরের অধিকাংশ কোম্পানির আর্থিক অবস্থার অবনতি হলেও, কিছুদিন থেকে কোন এক অজানা কারণে তাদের দাম হুহু করে বাড়ছিল। মনে হচ্ছে দুষ্টু ম্যানুপুলেটররা এখনও বাজারে সক্রিয়। এইসব দুর্নীতিবাজ ও অতিমুনাফালোভী চক্র, বিশেষকরে বাজার ব্যবস্থাপকদের বিষাক্ত ছোবল থেকে বাজারকে রক্ষা করতে না পারলে, বাজারকে কখনও ভাল রাখা সম্ভব না। বাজার নিয়ন্ত্রকের সকল আয়োজনই ব্যর্থ হবে।
পুঁজিবাজার অনেক স্পর্শকাতর। এখানে কোন বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে কমিশন ও স্টক এক্সচেঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে আরও সচেতন হওয়া উচিৎ। কোন নির্দিষ্ট সেক্টর নিয়ে তাদের যেকোন মন্তব্যই (ইতিবাচক বা নেতিবাচক ) বাজারে প্রভাব ফেলবে। সম্প্রতি, মিউচুয়াল ফান্ডের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।

বাজারে চাহিদার বাড়ার সাঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যোগান দিতে হবে। নতুন নতুন ডাইভারসিফাইড প্রডাক বাজারে নিয়ে আসতে হবে। কমিশন সুকুক নিয়ে আসার যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটা ভাল উদ্যোগ। সুকুক এর সাথে সাথে ইসলামিক সূচকের দিকেও নজর দিতে হবে। ২০১৪ সালে ইসলামিক সূচক চালু হলেও এটি এখন পর্যন্ত খুব বেশি বিনিয়োগকারীকে আকর্ষিত করতে পারেনি। আমেরিকা, ইউরোপ, মিডিল-ইস্ট, মালয়েশিয়া, চায়না, ভারতসহ অনেক দেশেই ইসলামিক সূচক চালু আছে এবং ধীরে ধীরে সেখানে জনপ্রিয় হচ্ছে। কাজেই, ভালো করে প্রচারণা করলে এটি বাংলাদেশেও জনপ্রিয় হতে পারে।

উপরের বিষয়গুলোকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে কমিশনকে সামনে আরও সাবধান হতে হবে এবং দক্ষতা ও সততার সহিত বাজারকে পরিচালিত করতে হবে, নতুবা বাজারের এই ডাউনটার্ন ঠেকানো সম্ভব হবে না।

লেখক : সভাপতি, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া।

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]