শরীরচর্চা ও স্বাস্থ্যবান্ধব খাবারের দিকে ঝুঁকছে চীনারা

আলিমুল হক
আলিমুল হক আলিমুল হক বেইজিং থেকে
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ এএম, ১৬ অক্টোবর ২০২০

প্রাচীন চীন সমৃদ্ধ ছিল। কালের বিবর্তনে সেই সমৃদ্ধ চীন একসময় হতদরিদ্র হয়ে পড়ে। বিশেষ করে, বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, বিদেশি আগ্রাসন ও গৃহযুদ্ধের ফলে গোটা চীনজুড়ে দেখা দেয় খাদ্যাভাব। সময়টা তখন সত্যিই কঠিন ছিল। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জোটানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হতো না; তাদের অনাহার-অর্ধাহারে দিন গুজরান করতে হতো। তখন চীনারা একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে প্রথমেই যে- প্রশ্নটি করতো, সেটা হচ্ছে: ‘তুমি কি খেয়েছো?’

এখন দিন বদলেছে। নয়াচীন প্রতিষ্ঠার পর কঠোর পরিশ্রম আর নেতৃবৃন্দের সঠিক দিকনির্দেশনায় চীনারা নিজেদের ভাগ্য বদলে ফেলেছে আমূল। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। বিগত চার দশকে সমাজ থেকে দারিদ্র্যকে ঝেটিয়ে বিদায় করেছে চীনারা। দশক চারেক আগেও চীনে যেখানে প্রায় শত কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতো, সেখানে বর্তমানে সে সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র কয়েক লাখে। চীনা মানুষকে এখন আর আগের মতো দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের চিন্তা করতে হয় না; তারা এখন চিন্তা করে উন্নত জীবনমান নিয়ে। চীন এগিয়ে চলেছে সার্বিকভাবে সচ্ছল সমাজ গড়ার দিকে। সমাজের সবাই একসময় ধনী হবে- এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করছে চীনা জনগণ, চীনা নেতৃবৃন্দ।

চীনা সমাজ থেকে ক্ষুধা দূর হয়েছে কবেই। কিন্তু একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে এখনও বহু চীনা প্রশ্ন করেন: ‘তুমি কি খেয়েছো?’ বিশেষ করে প্রবীণদের মাঝে এই প্রবণতা দেখা যায়। নবীনদের অনেকেই এখন আর এমন ধারা প্রশ্ন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাদের বক্তব্য, এতে বিদেশিরা অবাক হয়; অনেকসময় ভুল বোঝে। কথাটা অসত্য নয়। আমি যখন চীনে আসি, তখন শুরুতে অনেক প্রবীণকে এমন ধারা প্রশ্ন করতে শুনে অবাক হয়েছিলাম বৈকি! আসলে, এখনও আমার সহকর্মীদের কেউ কেউ দেখা হলেই স্পষ্ট বাংলায় প্রশ্ন করেন: ‘আপনি খেয়েছেন?’ আমি এখন আর অবাক হই না। আমি বরং অবাক হই আজকাল নতুন ধরনের একটি প্রশ্ন শুনে। প্রশ্নটি হচ্ছে: ‘তোমার কি খানিকটা ওজন কমেছে?’ হ্যাঁ, এটা এখন নতুন ট্রেন্ড। চীনের অনেক শহরে আজকাল চীনারা একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে শুরুতেই এই প্রশ্নটি করে। ভবিষ্যতে হয়তো এই প্রশ্নের আড়ালে হারিয়ে যাবে ‘তুমি কি খেয়েছো?’ প্রশ্নটি।

jagonews24

চেচিয়াং প্রদেশের হাংচৌ শহরের একটি মিডিয়া কোম্পানিতে ম্যানেজার পদে কাজ করেন ছেন সিন। সম্প্রতি তিনি ১০ কেজি ওজন কমিয়েছেন। এর জন্য তাকে একজন পুষ্টিবিদের সাহায্য নিতে হয়েছে, ডায়েট করতে হয়েছে। আগে তিনি প্রচুর অস্বাস্থ্যকর খাবার খেতেন। এতে তার ওজন বেড়ে যায়; বেড়ে যায় রক্তের লিপিড, ইউরিক এসিড, ইত্যাদি। ছেনের স্বাভাবিক জীবন এতে বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। পরে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে তিনি ওজন কমিয়ে এখন অনেক ভালো আছেন। আজকাল তিনি ‘তুমি কি খানিকটা ওজন কমিয়েছো?’ প্রশ্নটি শুনতে পছন্দ করেন।

ছেন সিনের মতো লক্ষ লক্ষ চীনা বর্তমানে ওজন সমস্যায় ভুগছেন। অতিরিক্ত ওজন তাদের শরীর ও মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। অনেকে বলেন, এটা হচ্ছে সচ্ছলতার খারাপ দিক। যেমনটি আগেই বলেছি, চীনা মানুষকে এখন আর তিন বেলা খাবারের চিন্তা করতে হয় না; বিশেষ করে চীনের ৪০ কোটি মধ্যবিত্তকে। টাকার সমস্যা নেই। খাবার সংগ্রহে কোনো ঝক্কিও সামলাতে হয় না। বিস্তৃত ফুড ডেলিভারি সিস্টেমের কারণে ঘরে বসেই পছন্দের খাবার চটজলদি পেয়ে যাচ্ছেন শহুরে চীনারা। ফুড ডেলিভারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও দেখার মতো। কে কত কম দামে ভালো রেডি খাবার কাস্টমারদের দরজায় পৌঁছে দিতে পারে- এ নিয়ে তাদের মধ্যে চলে প্রতিযোগিতা। এতে সুবিধা খাদ্য-ক্রেতাদের। কিন্তু এই সুবিধার কুফলও ভোগ করতে হয় ছেন সিনের মতো বহু চীনাকে, অতিরিক্ত ওজন গেইন করে।

jagonews24

তবে আশার কথা, ছেন সিনের মতো অনেক চীনাই এখন সচেতন হচ্ছেন; শরীরের অতিরিক্ত ওজনটুকু ঝেড়ে ফেলে দেয়ার পথ খুঁজছেন। আবার যাদের শরীরে অতিরিক্ত মেদ নেই, তারা চেষ্টা করছেন ছেন সিনের অবস্থায় না-পড়তে। ‘লো ক্যালিরি ফুড’ (কম ক্যালরিযুক্ত খাবার), ‘লাইট ফুড’ (হালকা খাবার), ইত্যাদি টার্মগুলো এখন চীনাদের মধ্যে ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে। তারা স্বাস্থ্যবান্ধব খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। অনেকেই ফাস্টফুড খাওয়া ছাড়ছেন বা কমিয়ে দিচ্ছেন। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমলপানীয় ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে চীনাদের খাদ্যতালিকা থেকে।

আমার এক চীনা সহকর্মীকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি এতে শুকিয়েছেন কীভাবে?’ তিনি হেসে উত্তর দিলেন: ‘কম খেয়ে ও শরীরচর্চা করে।’ বস্তুত, শুধু স্বাস্থ্যবান্ধব খাবার খাওয়া ও কম খাওয়াই যথেষ্ট নয়; ওজন ঠিক রাখতে বা অতিরিক্ত ওজন ঝেড়ে ফেলতে চাই নিয়মিত শরীরচর্চা। চীনারা এই কাজটা ভালোই পারেন। ভোরে বা সন্ধ্যায় বেইজিংয়ের পার্কগুলোতে গেলেই এর সত্যতা বোঝা যাবে। এখানকার প্রায় প্রতিটি পার্কেই শরীরচর্চার যন্ত্রপাতি আছে। অনেকেই সেখানে গা গরম করে নেন। আবার কেউ কেউ দলবেঁধে গানের তালে তালে নৃত্য করেন। এতে চিত্ত-বিনোদনও হয়, শরীরচর্চাও হয়।

jagonews24

চীনের শহরগুলোতে অসংখ্য জিম আছে। এসব জিমের অধিকাংশই বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা। কোথাও কোথাও কমিউনিটি জিমও দেখা যায়। কমিউনিটি জিমগুলো একাধারে শরীরচর্চা ও আড্ডার স্থান। কমিউনিটির মানুষ, বিশেষ করে প্রবীণরা, এসব জিমে আসেন, শরীরচর্চা করেন, আড্ডা দেন। সদস্যদের বছরে একটা টোকেন ফি দিতে হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জিমগুলো মুনাফা করে। এসব জিমে আধুনিক যন্ত্রপাতি বেশি; সুযোগ-সুবিধা বেশি। সচ্ছল চীনারা এমন জিম পছন্দ করেন। চিয়াং ইছেন তাদের একজন। তিনি বেইজিংয়ের একটি বিদেশি কনসাল্টিং ফার্মের কনসাল্টেন্ট। তিনি নিয়মিত জিমে যাতায়াত করেন। জিমে ওয়ার্ক-আউট করার পর তিনি বেশ আরাম বোধ করেন; তার শরীর ও মন চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

কোনো কোনো উৎসাহী চীনা নিজেদের বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন বা তুলছেন মিনি জিম। এর সুবিধা বেশি। নিজের পছন্দমতো সময়ে বাড়িতেই শরীরচর্চার কাজটা সেরে নেয়া যায়। নিজের বাড়িতে মিনি জিম গড়ে তুলেছেন- চীনে এমন মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে বাড়ছে ওজন মাপার যন্ত্র, মাসাজ গান, ট্রেডমিলের মতো শরীরচর্চার যন্ত্রাপাতির চাহিদা। অনলাইনে আজকাল বেস্টসেলার এ ধরনের যন্ত্রপাতি। চীনের ই-কমার্স প্লাটফর্ম ‘টিমল’-এর ২০১৯ সালের উপাত্ত অনুসারে, বিগত দু’বছরে চীনে শরীরচর্চার যন্ত্রপাতির বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

jagonews24

বলা হয়, দৌড় হচ্ছে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শরীরচর্চা। চীনা দৌড়বিদরা এখনও বিশ্বমানে পৌঁছাতে পারেননি, এ কথা সত্য। কিন্তু সাধারণ চীনাদের অনেকেই দৌড়াতে পছন্দ করেন। মূলত শরীরচর্চা হিসেবেই বহু চীনা নিয়মিত দৌড়ান। এ সংখ্যাও বাড়ছে। আর দৌড়কে জনপ্রিয় করে তুলতে গোটা চীনজুড়েই প্রতিবছর আয়োজন করা হয় দূরপাল্লার দৌড় প্রতিযোগিতা বা ম্যারাথন। এসব ম্যারাথনে অংশগ্রহণ বর্তমানে চীনাদের কাছে অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। ‘চায়না ম্যারাথন’-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯ সালে দেশের ৩১টি প্রদেশ ও অঞ্চলে মোট ১৮২৮টি ম্যারাথন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এসব ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেন প্রায় ৭১ লাখ মানুষ।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি দেশের মানুষের স্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতি ঘটলে, সে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন-প্রক্রিয়ার ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। চীন চলতি বছরই সার্বিকভাবে সচ্ছল সমাজ গড়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি চীনের স্বাস্থ্যখাত একটি বিশাল শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে। বর্তমানে চীনাদের কাছে স্বাস্থ্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের কাছে সুস্বাস্থ্য হচ্ছে তৃপ্তি, সুখ ও নিরাপত্তার প্রতীক।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]