জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩১ পিএম, ২০ অক্টোবর ২০২০

অধ্যাপক ড. কামালউদ্দিন আহমদ

২০ অক্টোবর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী যা ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত। করোনা মহামারির কারণে দিবসটি আগের মতো এবার উদযাপিত না হলেও দেশবাসীর কাছে এই প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু সাফল্য মিডিয়ার বদৌলতে সামনে এসেছে। সকলে জানেন, অগ্রসরমান বিশ্বের সাথে উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সঙ্গতি রক্ষা ও সমতা অর্জন এবং জাতীয় পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, আধুনিক জ্ঞানচর্চা ও পঠন-পাঠনের সুযোগ সৃষ্টি ও সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত ২০০৫ সালে ২৮নং আইনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ সরকারি কলেজটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং ২০০৫ এর ২০ অক্টোবর একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু হয়। বিলুপ্ত সরকারি জগন্নাথ কলেজ ক্যাম্পাসের ৭ একর (প্রায়) জমির উপর বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থিত।

৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত এই বিদ্যাপীঠের ছাত্র-শিক্ষকরা ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের সুপরিচিত মুখ। পাকিস্তানি জেনারেলদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে ঢাকা কলেজ থেকে যেসব ছাত্রকে বিতাড়িত করা হয়েছিল- এই বিদ্যাপীঠ তাদের আশ্রয় দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, সৈয়দ শামসুল আলম হাসু, রাজিউদ্দিন আহমদ রাজু, কাজী ফিরোজ রশিদ, কেএম সাইফুদ্দিন আহমদ, এমএ রেজা, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, সাইফুর রহমান, আখতারুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম জিন্নাহ, ফজলে এলাহি মোহন, হুমায়ুন কবির শেলী, মুরাদ আলী, শরীফ, আবুল হাসনাত প্রমুখ।

এই তেজোদীপ্ত ছাত্রনেতাদের পেয়ে জগন্নাথ আরও আন্দোলন-সংগ্রামে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তৎকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত ছয় দফা আন্দলনেও জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষিত হলে তার সমর্থনে সফল হরতাল পালনে ভূমিকা পালন করে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান কাজী আরেফ আহমেদ ও চিত্রনায়ক ফারুক। হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে ঢাকা শহরকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন এই বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা।

দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ২০১১ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত শিক্ষকতা করি। তখনই দেখেছি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সমস্যা। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজন একাডেমিক যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, স্বচ্ছভাবে ভর্তিপরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাই এবং সাথে সাথে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় দেখেছি এখানে গবেষণায় তেমন আগ্রহ কিংবা ওই ধরনের সুযোগ-সুবিধাসহ বিভিন্ন প্রজেক্ট ছিল না। ভর্তি পরীক্ষায় ছিল প্রশ্ন ফাঁসের সম্ভাবনা আর অবকাঠামোগতভাবে এই প্রতিষ্ঠানটি একেবারেই নাজুক অবস্থায় ছিল। ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তেমন কোন কার্যক্রম ছিল না, গৎবাধা কিছু অনুষ্ঠান ছাড়া।

গত বছরের(২০১৯) নভেম্বর মাসে আমাকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ট্রেজারার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন। এখানে আমি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান এর সাথে কাজ করতে পারব জেনে অনেক আনন্দ অনুভব করি। আমি যোগদানের কয়েকদিন পরই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক (১৮,৩২১ জন) শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ম সমাবর্তন অনুষ্ঠান হয়। এটি ছিল একটি কঠিন কাজ। এত সংখ্যক শিক্ষার্থী নিয়ে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে উপাচার্যের নেতৃত্বে সমাবর্তন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরাও এজন্য উপাচার্য মহোদয়কে ধন্যবাদ জানান। আমার যতদূর মনে পড়ে ২০১৩ সালে জগন্নাথে ২৮ টি বিভাগ ছিল, বর্তমান উপাচার্যের একাগ্রতায় আরও ১০ টি বিভাগ, ২টি ইনস্টিটিউট এবং একটি ল্যাবরেটরি স্কুল পরিপূর্ণ ও সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

এর মধ্যে চারুকলা, নাট্যকলা, সংগীত এবং ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন বিভাগগুলো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিপূর্ণতা দেওয়ার জন্য পুরনো ঢাকায় সাংস্কৃতিক জোয়ার সৃষ্টিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এর সবকিছুরই নেতৃত্বে ছিলেন উপাচার্য। গত কয়েক বছরে ক্রীড়াক্ষেত্রেও এই প্রতিষ্ঠানটি অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এসবের আড়ালেও উপাচার্যের সহযোগিতা সবসময় অত্যন্ত আন্তরিক।

‘মুজিববর্ষে’র শুরুতে প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণরোধে ১৭ মার্চ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আমাদের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করবে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সময় আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। সংক্রামক ব্যাধির দুর্যোগের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস খোলা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে দেখেছে, নিজ নিজ সার্টিফিকেটও সংগ্রহ করার সুযোগ পেয়েছে। উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশনা মোতাবেক করোনাকালে শিক্ষার্থীদের মেস বা বাড়ি ভাড়া প্রদানের জন্য একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিত না হলেও শিক্ষার্থীদের দিতে হচ্ছে মেস অথবা বাড়িভাড়া। যেসব শিক্ষার্থী টিউশনি কিংবা পার্টটাইম জব করত তারাও সংকটে রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের তালিকা অনুসারে অর্থ প্রদান এবং ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে মোবাইল কেনার টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলটি উদ্বোধন করা হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক সমস্যা নিরসনকল্পে প্রধানমন্ত্রী অনেক দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন, এসবের নেপথ্যে যে ব্যক্তিটি দিন-রাত পরিশ্রম করছেন, তিনি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান। ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ক্যাম্পাস স্থাপন : ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ২০০ একর জমি অধিগ্রহণের মধ্যে ১৮৮.৬০ একর জমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, অবশিষ্ট অংশ প্রক্রিয়াধীন। এত বড় বিশাল প্রকল্প প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় উপাচার্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এগিয়ে চলেছে।

উপাচার্য ড. মীজানুর রহমানের মেয়াদকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের ৪ টি প্রোগ্রামের অধীনে শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষার গুণগত ও আধুনিক মানোন্নয়নের লক্ষ্যে সকল বিভাগের শিক্ষকদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন প্রশিক্ষণসহ কম্পিউটার ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। হেকেপ প্রকল্পের আওতায়ও ৩ টি উপপ্রকল্পে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিকল্পে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রসায়ন বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত Chemistry for Health and Welfare শীর্ষক ICRAC এবং ইতিহাস বিভাগের আয়োজনে State and Society in South Asia: A Historical Perspective শীর্ষক সেমিনার ছিল উল্লেখযোগ্য।

বর্তমান উপাচার্যের আমলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে যে, ২০২০ সাল থেকে কোন শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক হতে পারবেন না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ই বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে ১০৪ জন অধ্যাপকের মধ্যে ১০১ জনই পিএইচডি ডিগ্রিধারী, বাকি ৩ জনের ডিগ্রিও প্রক্রিয়াধীন। অতীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনা ছিল না কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগে ১০ টি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশনার সংখ্যা আগামীতে আরো বাড়বে বলে উপাচার্য মহোদয় আশ্বাস দিয়েছেন। বিগত তিন বছর যাবত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় স্টল বরাদ্দ পেয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে হাজির হয়- যার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরেই প্রকাশনায় স্বতন্ত্র মর্যাদা অর্জনে সক্ষম হয়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি।

ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি ব্যাচ বের হয়ে বিসিএস, ব্যাংক, সাব-ইন্সপেক্টরসহ বিভিন্ন চাকরিতে নিয়োগ পেয়েছে। এমনকি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজে যোগদান করেছে যা অনেক গৌরবজনক বলে সকলে স্বীকার করেন। সামগ্রিক দিক থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের অবদান অনন্য। উচ্চশিক্ষার পুনর্জাগরণে ও অসাধারণ নেতৃত্বের কারণে তিনি আগামীতেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে এই প্রত্যাশা আমাদের।
লেখক : ট্রেজারার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/জেআইএম

বর্তমান উপাচার্যের আমলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে যে, ২০২০ সাল থেকে কোন শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপক হতে পারবেন না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ই বাংলাদেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যেখানে ১০৪ জন অধ্যাপকের মধ্যে ১০১ জনই পিএইচডি ডিগ্রিধারী, বাকি ৩ জনের ডিগ্রিও প্রক্রিয়াধীন। অতীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকাশনা ছিল না কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের নিজস্ব উদ্যোগে ১০ টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]