সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ আমরা

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৮:৫৭ এএম, ২২ অক্টোবর ২০২০

শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গোৎসব। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আবহমানকাল থেকে বাংলা ভূখণ্ডে নানা জাতি-গোষ্ঠী ও ধর্মমতের অনুসারীরা পারস্পরিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে মিলেমিশে একত্রে বসবাসের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির ঐতিহ্য সংহত রেখেছে। যার যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে এটাই ধর্মের শিক্ষা। কেননা একই আদম হাওয়া থেকে আমাদের সবার উদ্ভব।

কে কোন ধর্মের অনুসারী তা মূল বিষয় নয়, বিষয় হল আমরা সবাই মানুষ। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই এক জাতি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মানব জাতি! আমি নর ও নারী থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছি। আর আমি বিভিন্ন গোষ্ঠী ও গোত্রে তোমাদের বিভক্ত করেছি যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পার।’ (সুরা আল হুজুরাত: আয়াত ১৩) এই আয়াত বিশ্ব-মানবের ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের মহাসনদ। জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ব অথবা বংশগত গৌরবের মিথ্যা ধারণা থেকে উদ্ভূত আভিজাত্যের প্রতি এ আয়াত কুঠারাঘাত করেছে। এক জোড়া পুরুষ-মহিলা থেকে সৃষ্ট মানবমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে সকলেই আল্লাহ তাআলার সমক্ষে সমমর্যাদার অধিকারী।

চামড়ার রং, ধন-সম্পদের পরিমাণ, সামাজিক মর্যাদা, বংশ ইত্যাদির দ্বারা মানুষের মর্যাদার মূল্যায়ন হতে পারে না। মর্যাদা ও সম্মানের সঠিক মাপকাঠি হলো ব্যক্তির উচ্চমানের নৈতিক গুণাবলী এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি তার কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে আন্তরিকতা। বিশ্বমানব একটি পরিবার বিশেষ। জাতি, উপজাতি, বর্ণ, বংশ ইত্যাদির বিভক্তি কেবল পরস্পরকে জানার জন্য, যাতে পরস্পরের চারিত্রিক ও মানসিক গুণাবলী দ্বারা একে অপরের উপকার সাধিত হতে পারে। মহানবির (সা.) মৃত্যুর অল্পদিন আগে বিদায় হজের সময় বিরাট ইসলামি সমাগমকে সম্বোধন করে তিনি (সা.) উদাত্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এবং তোমাদের আদি পিতাও এক। একজন আরব একজন অনারব থেকে কোনো মতেই শ্রেষ্ঠ নয়। তেমনি একজন আরবের ওপরে একজন অনারবেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। একজন সাদা চামড়ার মানুষ একজন কালো চামড়ার মানুষের চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়, কালোও সাদার চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়। শ্রেষ্ঠত্বের মূল্যায়ন করতে বিচার্য বিষয় হবে, কে আল্লাহ ও বান্দার হক কতদূর আদায় করলো। এর দ্বারা আল্লাহর দৃষ্টিতে তোমাদের মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যিনি সর্বাপেক্ষা বেশি ধর্মপরায়ণ।’ (বায়হাকি) এই মহান শব্দগুলো ইসলামের উচ্চতম আদর্শ ও শ্রেষ্ঠতম নীতিমালার একটি দিক উজ্জ্বলভাবে চিত্রায়িত করেছে। শতধা বিভক্ত একটি সমাজকে অত্যাধুনিক গণতন্ত্রের সমতা ভিত্তিক সমাজে ঐক্যবদ্ধ করার কী অসাধারণ উদাত্ত আহ্বান।

ইসলাম ধর্মে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নেই। যারা সামাজিক পরিমন্ডলে বিশৃংখলা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, রক্তপাত ঘটায়, ধ্বংস যজ্ঞ এবং নৈতিকতা বর্জিত অনৈইসলামিক কর্মকাণ্ড চালায়, তারা কখনো শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী হতে পারে না। পবিত্র কুরআনের সুরা আল বাকারার ২৫৬ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো বল প্রয়োগ নেই। কারণ সৎ পথ ও ভ্রান্তি উভয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে; সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে (পুণ্যের পথে বাধা সৃষ্টিকারী বিদ্রোহী শক্তিকে) অস্বীকার করে এবং আল্লাহর ওপর ঈমান আনে, সে নিশ্চয়ই এমন এক সুদৃঢ় মজবুত করে ধরেছে, যা কখনো ভাঙ্গবার নয়।’

আল্লাহপাকের প্রেরিত নবিগণ আল্লাহর নির্দেশে পথহারা মানুষকে হেদায়াত দিতে থাকেন। যখন তারা স্বয়ং এ শিক্ষা দেন, তখন তারা শুধু ধর্মান্তর গ্রহণের কারণে কারো প্রতি বল প্রয়োগ বা জুলুম করা কিরূপে শিক্ষা দিতে পারেন? ধর্ম কখনো অশান্তি ও রক্তপাতের উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয় নাই। কোনো ধর্ম গ্রহণ বা বর্জন করলে ইসলামে এর কোনো ধরণের শাস্তির বিধান নেই। শাস্তি দেয়ার মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ তাআলা। আমরা দেখতে পাই হজরত নূহ (আ.) সমসাময়িক লোকদের ধর্মপথ ও পুণ্যের দিকে আহ্বান করেন। তিনি কখনো কারো প্রতি অত্যাচার করেন নাই। হজরত নূহ (আ.)-এর বাণী শুনে লোকজন বলেছিল, ‘হে নূহ! যদি তুমি এই ধর্ম হতে বিরত না হও এবং তোমার চালচলন পরিবর্তন না কর, তবে নিশ্চয়ই তোমাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হবে।’ (সুরা শোয়ারা: রুকু ৬) হজরত ইব্রাহিম (আ.) শান্তি, প্রেম, সহানুভূতি ও গাম্ভীর্যের সাথে মানুষজনকে সত্যের পথে আহ্বান করেন। তার হাতে তো কোনো তরবারি ছিল না, ছিল না জুলুম করার কোনো উপকরণ। তার জাতির লোকজন তাকে বললো, ‘যদি তুমি তোমার বিশ্বাস ও প্রচার পরিত্যাগ করো, তাহলে ভাল কথা, নচেৎ তোমাকে আমরা প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে ফেলবো।’ (সুরা মারইয়াম: রুকু ৩) অনুরূপভাবে, হজরত লুত (আ.) ও হজরত শোয়েব (আ.) এর প্রতিও বিরুদ্ধবাদীগণ একই নীতি অবলম্বন করেছিল।

আমরা সবাই জানি, আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করানো ধর্মীয় দৃষ্টিতে যদিও সবচেয়ে বড় অপরাধ কিন্তু এর জন্য জাগতিক কোন শাস্তির শিক্ষা ইসলামে পাওয়া যায় না। কুরআন শরিফে আল্লাহর শরিক করার তথা তাঁকে অবমাননা করার অনেক উদাহরণ দেয়া আছে। কিন্তু কোথাও তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করানোর অপরাধে বা আল্লাহর প্রতি এক পুত্র-সন্তান আরোপ করার অপরাধে কোনো রকম জাগতিক শাস্তির বিধান দেয়া হয় নি। মহানবি (সা.) নিজেও আল্লাহ তাআলার অংশীদার দাঁড় করানোর কারণে কাউকে কখনও শাস্তি দেন নি। এসব বিষয়ের মিমাংসা হবে পরকালে আর স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এসবের বিচার করবেন, কোনো বান্দা করবে না।

একইভাবে, পবিত্র কুরআনে মহানবিকে কাফেরদের পক্ষ থেকে যেসব ভাষায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো তারও অনেক উদাহরণ দেয়া আছে। (নাউযুবিল্লাহ মিন যালিকা) কিন্তু কুরআনের কোনো একটি স্থানেও এসব অবমাননাকর কথার জন্য জাগতিক কোনো শাস্তির নির্দেশ বা বিধান দেয়া হয় নি। একজন বিশ্বাসী মুসলমানের অন্তর এসব কটুক্তির কারণে ক্ষত-বিক্ষত হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এসব গর্হিত অপরাধের বিহিত একমাত্র আল্লাহর হাতে। এসব অন্যায় কাজের বিচারের ভার স্বয়ং আল্লাহ নিজের কাছে রেখেছেন। বিশ্বাসের-স্বাধীনতা হচ্ছে সব মানুষের মৌলিক অধিকার। ইসলাম ধর্মের বিধান মতে ‘ধর্ম’ হচ্ছে নিজ, পছন্দের একটি বিষয়। এ ধর্ম একটি সুস্পষ্ট ও শান্তির ধর্ম।

এই ধর্ম গ্রহণের পরেও চাইলে কেউ এটা ত্যাগ করতে পারে, কোন জোর নেই, তবে এর বিচার সর্বশক্তিমান আল্লাহ নিজ হাতেই রেখেছেন। ধর্মে যদি বল প্রয়োগের বিধানই থাকতো, তাহলে মহানবি (সা.) মক্কা বিজয়ের পর অমুসলমানদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য বাধ্য করতেন এবং মক্কায় বসবাসের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নাই! এতে প্রমাণিত হয় যে, ধর্মের জন্য বল প্রয়োগ ইসলামের শিক্ষা নয়। ইসলামের আদর্শ হল শত্রুর সাথেও বন্ধুসুলভ আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

সবার সৃষ্টি যেহেতু একই উৎস থেকে তাহলে কেনো একে ওপরের সাথে বিরোধ। আমার ধর্মের সাথে, আমার মতের সাথে আরেক জন একমত নাও হতে পারে, তাই বলে কি তার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খারাপ রাখার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে? তাই আবারো বলতে চাই, ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, ইসলাম সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ধর্ম নয় আর আমাদের এই দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ, এখানে কোনোরূপ সন্ত্রাস ও জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত কোনো অপশক্তির স্থান নেই। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্মের সাথে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দৃষ্টান্তই আমরা লক্ষ্য করে আসছি। আমরা আশা করব এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে কেউ বাধা সৃষ্টি করতে পারবে না।

সকল ধর্মাবলম্বী তাদের নিজ নিজ রীতি অনুসারে তাদের ধর্মীয় উৎসব স্বাধীনভাবে পালন করবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

এইচআর/পিআর

আমার ধর্মের সাথে, আমার মতের সাথে আরেক জন একমত নাও হতে পারে, তাই বলে কি তার সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক খারাপ রাখার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে? তাই আবারো বলতে চাই, ইসলাম শান্তি ও কল্যাণের ধর্ম, ইসলাম সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ধর্ম নয় আর আমাদের এই দেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাঁধনে আবদ্ধ, এখানে কোনোরূপ সন্ত্রাস ও জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী, নাশকতামূলক কাজে লিপ্ত কোনো অপশক্তির স্থান নেই

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]