নিরাপদ সড়ক : রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন জরুরি

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:১৬ এএম, ২২ অক্টোবর ২০২০

মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী

আমরা সকলেই সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রতিদিনই উদ্বিগ্ন। সংবাদপত্র বা টেলিভিশন খুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য তাজা প্রাণহানির খবর। সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তে কর্মক্ষম জনসম্পদ বা প্রাণগুলো হারিয়ে সংখ্যায় পরিণত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ হাজার ৩১৬ জনের প্রাণহানী ঘটেছে, যদি ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে একই বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৬৪২ জন নিহত হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিগত ৫ বছরে ২৬,৯০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭,১৭০জন নিহত ও ৮২,৭৫৮জন আহত হয়েছে।

সংখ্যা যাই হোক, সড়কে মৃত্যুর মিছিল যে থামানো যাচ্ছে না তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে জাতিসংঘ ২০১১ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়কে “সড়ক নিরাপত্তা দশক” হিসেবে ঘোষনা করেছে। এসব সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণকালে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের সময়ে সড়ক-মহাসড়কে উন্নয়নের ফলে যানবাহণের গতি বেড়েছে, এই সময়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ী চালানো এবং বিপদজনক অভারটেকিং বেড়ে যাওয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। এ সময়ের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানী অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমতও হয়েছে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) তে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। সড়ক নিরাপত্তা দশককে কেন্দ্র করে পৃথিবীর দেশে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে ইতোমধ্যে বহুদেশে সড়ক নিরাপত্তায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যথাযথ কোন পরিকল্পনা তৈরি করেনি। সড়ক নিরাপত্তায় যুক্ত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নেওয়া পরিকল্পনা গুলো ছিল গতানুগতিক। এর মাধ্যমে কী অর্জিত হয়েছে আর কী অর্জিত হয়নি বা কী অর্জন করা প্রয়োজন তার সঠিক কোন ব্যাখ্যা নেই।

সড়ক দুর্ঘটনা গবেষনা প্রতিষ্ঠান (এআরআই) এর গবেষণায় দেখা গেছে ৫৩ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বেপরোয়া গতি। কিন্তু গতি নিয়ন্ত্রণ, মহাসড়কে ছোট যানবাহন বন্ধ ও বেপরোয়া যানবাহন চলাচল বন্ধে সাফল্য নেই। এখনো দেশের সড়ক মহাসড়কে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে ১০ লক্ষ নছিমন-করিমন-ইজিবাইক। অবাধে আমদানী হচ্ছে অটোরিক্সা, ব্যাটারি চালিত রিক্সা, ইজিবাইক। দেশব্যাপী ৫ লক্ষ ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, হিউম্যান হলার অবাধে চলছে। নিবন্ধন বিহীন ৪ লক্ষ অটোরিক্সা ও মোটর সাইকেল চলাচল করছে সড়ক-মহাসড়কে। এসব যানবাহন সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান উৎস।

দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানীর প্রায় ৪৭ শতাংশ পথচারী। আমাদের সড়ক-মহাড়কে স্বল্প খরচে ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস, ওভারপাস নির্মাণ ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানী অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব। ফুটপাত দখল মুক্ত করে পথচারীর যাথাযাত নিশ্চিত করা গেলে এই বিশাল অর্জন সম্ভব। উন্নত বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যেসব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেগুলো খুবই সুনির্দিষ্ট হয়। কিন্তু বাংলাদেশে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দায়সারা গোছের। কত বছরে কি পরিমাণ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো হবে। কিভাবে তা অর্জিত হবে, কারা তা সফল করবে। এটা স্পষ্ট করা দরকার। পরিকল্পনা করে রেখে দিলে বা প্রতিদিন নতুন নতুন কথার ফুলঝুড়ি দিলে বা রাস্তায় রাস্তায় লিফলেট দিলে দুর্ঘটনা কমে যাবে এটা আশা করা ঠিক নয়। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। সড়ক মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে বিশৃংখলা। চালক-মালিকদের বেপরোয়া মনোভাব এই সেক্টরকে দিন দিন অনিরাপদ করে তুলছে। সরকার জনবান্ধব যে কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে তারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে সড়ক নিরাপত্তা আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।

দেশের বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণের মাঝে সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে প্রতিবছর নিরাপদ সড়ক দিবস পালন করা হচ্ছে। এই জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সড়কে প্রাণ দিচ্ছে, আহত হচ্ছে, পঙ্গু হচ্ছে। তাদের সুরক্ষা দিতে এই দিবসটি অন্যান্য জাতীয় দিবসের ন্যায় গতানুগতিকভাবে একদিন পালন না করে, নিরাপদ সড়ক দিবসকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার সংক্রান্ত আলোচনা সভা, মসজিদ-মন্দির-গীর্জায় সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সংক্রান্ত আলোচনাসহ দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সমাজের সকল স্তরে নিরাপদ সড়কের বার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে দিবসটি উদযাপনের সুফল পাওয়া যাবে।

জনগণের বহুল প্রত্যাশিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের পরেও সড়কে কাঙ্খিত উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়নি। বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি ঠিক আগের মতোই বিদ্যমান। ফলে যাত্রী ভোগান্তি, যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলেছে। সড়কে এহেন পরিস্থিতি বহাল রেখে নিরাপদ সড়ক দিবস পালন নেহায়েত বেমানান। একই সাথে বর্তমান সরকারের নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার নির্বাচনী অঙ্গীকার জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।

২০২১ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে জাতিসংঘের অনুস্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সড়কে পথচারীর মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এই অঙ্গীকার নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করা সম্ভব বলে মনে করি।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

এইচআর/পিআর

জনগণের বহুল প্রত্যাশিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের পরেও সড়কে কাঙ্খিত উন্নয়ন লক্ষ্য করা যায়নি। বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি ঠিক আগের মতোই বিদ্যমান। ফলে যাত্রী ভোগান্তি, যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা দিনদিন বেড়েই চলেছে। সড়কে এহেন পরিস্থিতি বহাল রেখে নিরাপদ সড়ক দিবস পালন নেহায়েত বেমানান। একই সাথে বর্তমান সরকারের নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার নির্বাচনী অঙ্গীকার জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]