ট্রাম্প নাকি বাইডেন?

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৪৪ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২০

রোদেলা হানিফ সুমি

৩ নভেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্র্যাট পার্টি থেকে জো বাইডেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সারাবিশ্ব যখন করোনাভাইরাসের ভয়াবহতায় বির্পযস্ত, তখন দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। করোনার বিস্তার দেশটিতে এখনও সর্বোচ্চ। এ ভাইরাসটির আক্রমণে সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণহানিও ঘটেছে দেশটিতে।

মার্কিন নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ থাকে দুনিয়াব্যাপী। পরবর্তী চার বছরের জন্য কে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, সে নিয়ে সারা বিশ্বে আগ্রহের কোনো কমতি নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট দেশটির সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পদ্ধতি কিছুটা জটিল। সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, ইলেকটোরাল কলেজ নামে পরিচিত একদল কর্মকর্তার পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ইলেকটোরাল কলেজের মোট ভোট সংখ্যা ৫৩৮টি। এ ৫৩৮ টির মধ্যে যে প্রার্থী ২৭০ বা তার বেশি ভোট পাবেন তিনিই প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবেন।

আমেরিকায় ছোট বড় মিলিয়ে অঙ্গরাজ্য মোট ৫০টি। এ ৫০ টি রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইলেকটোরাল ভোট রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায়, তারপর টেক্সাস, নিউইয়কর্ ও ফ্লোরিডায়। কোনো কোনো রাজ্য রিপাবলিকানদের আবার কোনো কোনো রাজ্য ডেমোক্র্যাটদের দুর্গ। রিপাবলিকানদের প্রভাবিত রাজ্যগুলোকে লাল এবং ডেমোক্র্যাটদের প্রভাবিত রাজ্যগুলোকে নীল রাজ্য বলা হয়। আবার কিছু রাজ্য রয়েছে যেগুলোর ভোট যে কোনো প্রার্থীর অনুকূলে যেতে পারে। এ রাজ্যগুলোই মূলত নির্ধারণ করে কে হতে যাচ্ছে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।

জনমত জরিপে জো বাইডেন সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন বলে জানান দিচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে টেলিভিশনে প্রচারিত হওয়া প্রেসিডেন্সিয়াল বির্তকের পর একটি জনমত জরিপ করা হয়, সেখানে জো বাইডেন এগিয়ে আছেন বলে জানানো হয়। বলা প্রয়োজন যে, ১৯৬০ সাল থেকে জাতীয় পর্যায়ের টেলিভিশনে প্রেসিডেন্সিয়াল বির্তকটি চলে আসছে। সে সময় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন রিচাডর্ নিক্সন ও জন এফ কেনেডি। সে সময়ে শুরু হওয়া বির্তকটি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূণর্ সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। সিএনএন- এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ২০২০ এর প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বির্তকে ট্রাম্প ব্যক্তিগত আক্রমণে ব্যস্ত রাখার মধ্য দিয়ে মূলত নির্বাচন সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়গুলোর আলোচনা থেকে বাইডেনকে দূরে সরিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছিলেন।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সেই বির্তকে ট্রাম্প ও বাইডেনের মধ্যে অনেক বাক-বিতন্ডা হয়। এ বির্তকের ২ দিনপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত হন। এ কথা অজানা নয় যে, মহামারি করোনা ভাইরাস নিয়ে ট্রাম্প অনেক সমালোচিত হয়েছেন। তিনি এ ভাইরাসটিকে কোনো গুরুত্বই দিতে চাননি। ট্রাম্পের দায়িত্বহীন মন্তব্য, খামখেয়ালিপনা ও আগাগোড়া করোনা ভাইরাস নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার কারণে আমেরিকায় করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প নিজে করোনায় আক্রান্ত হলে মার্কিন জনসাধারণের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এই নেতিবাচক প্রভাব ভোটেও পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে এবং ভার্চুয়াল বির্তকে সম্মত না হওয়ায় ১৫ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় বির্তক বাতিল করা হয়েছে। সর্বশেষ বির্তক হয় গত ২৩ অক্টোবর ২০২০ তারিখে। এ বির্তকের বিষয়বস্তু হিসেবে করোনাভাইরাস মোকাবেলা গুরুত্ব পায়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী শ্লোগান হিসেবে ‘'আমেরিকা ফার্স্ট' নির্ধারণ করেছেন। এই শ্লোগানের মধ্যদিয়ে তিনি সবকিছুতে আমেরিকা অগ্রাধিকার পাবার কথা বলতে চেয়েছেন। এটি তাঁর পূর্ববর্তী নির্বাচনী শ্লোগান ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এ্যাগেইন’-এর সংস্করণ। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি এই শ্লোগানে ভোটারদের কাছে ভোট চেয়েছিলেন। ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী শ্লোগানের ব্যাখায় জানাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পুন-প্রতিষ্ঠা এবং প্রত্যেকটি দেশের যার যার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। ট্রাম্প নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমেরিকা ফার্স্ট বলে জানাচ্ছেন।

প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের নির্বাচনী শ্লোগান বিল্ড ব্যাক বেটার। এটি বারাক ওবামার ‘চেঞ্জ উই নিড’ শ্লোগানের সংস্করণ। বারাক ওবামার এই নির্বাচনী শ্লোগানটি সেই সময়ে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের নয়; অন্যদেশেও এটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ‘দিন বদলের অঙ্গীকার’ নির্বাচনী শ্লোগানটি অনেকেই মনে করেন সেই আদলেই তৈরি।

একথা প্রচলিত আছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট বদলও হলেও তাদের পররাষ্ট্র নীতি বদলায় না। এক্ষেত্রে ট্রাম্প কিছুটা ব্যতিক্রম ছিলেন। নির্বাচনী বির্তক এবং ভোট চাওয়ার প্রচারণায় ট্রাম্প এবং জো বাইডেনের মধ্যে সেই পার্থক্য বেড়িয়ে আসছে। জো বাইডেন বলেছেন, নির্বাচিত হলে তিনি জাতীয় ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেবেন। তিনি বলেছেন, তার কোন পররাষ্ট্র নীতি নেই কিন্তু বিশ্বে আমেরিকার নেতৃত্ব পুন-প্রতিষ্ঠা করার জন্য তার একটি পরিকল্পনা আছে। জো বাইডেনের পররাষ্ট্র নীতি বিশ্ব পর্যায়ে 'বহু দেশের অংশগ্রহণের নীতি' থেকে দূরে সরে গেছে। কিন্তু ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পক্ষে। জো বাইডেন বলেছেন, তার কাজ হবে এই বিচ্ছিন্নতা দূর করে আবারও আন্তর্জাতিক চুক্তি, পরিকল্পনা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম একটি ভিত্তি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কমিয়ে আনা। তিনি এবার অঙ্গিকার করছেন, তিনি পুন-নির্বাচিত হলে মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখবেন। এখনও পর্যন্ত তিনি ৭২২ মাইল সীমান্তের মধ্যে ৪৪৫ মাইল প্রাচীর নির্মাণের অর্থ সংস্থান করতে পেরেছেন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র বসবাসরত অভিবাসীদের পরিবারের সদস্যদেরকে তাদের নিজেদের দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার নীতির অবসান ঘটানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ট্রাম্প লটারি ভিসা পদ্ধতি বাতিল করে যোগ্যতার ভিত্তিতে ভিসা ব্যবস্থা চালু করার কথা বলেছেন।

জো বাইডেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে নির্বাচিত হলে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্ত, যেগুলো তিনি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জারি করেছিলেন, সেগুলো বাতিল করে দেবেন। তিনি স্বাস্থ্যখাতে ওবামা কেয়র ফিরিয়ে আনবেন, যা ট্রাম্প বাতিল করেছিলেন। জো বাইডেন সকল আমেরিকানের ৯৭%কে এই ইনস্যুরেন্সের আওতায় নিয়ে আসারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি সকলের জন্যস্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেছেন, যাতে বয়স্ক মানুষের জন্য স্বাস্থ্য সেবা লাভ সহজ হয়। জো বাইডেন এ জন্য আগামী ১০ বছরে সোয়া দুই ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করার পক্ষপাতি।

সব মিলিয়েই জো বাইডেন সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু ট্রাম্প বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি ২০১৬ সালেরও বেশি ব্যবধানে বিজয়ী হতে যাচ্ছেন বলে ক্ষণ গণনা শুরু করেছেন। অনেকেই আবার মনে করছেন যে, এবারের নির্বাচনের ফলাফলটি আদালত কর্তৃক নির্ধারিত হতে পারে। ট্রাম্প সে আভাসও দিয়েছেন। করোনাভাইরাসের কারণে এবার অনেকেই পোস্টাল ভোট দিচ্ছেন। আর পোস্টাল ভোট যারা দিয়েছেন বা দিচ্ছেন তাদের মধ্যে বাইডেনের সমর্থক বেশি। এই তথ্যটি ট্রাম্পের কাছেও আছে। তাই শুরু থেকেই তিনি পোস্টাল ভোট নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে আসছেন।

এরপরও কথা থাকে ট্রাম্প হেরে গেলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন কী না? এ বিষয়ে পূর্বানুমান করা যাচ্ছে না। কারণ, ট্রাম্প সম্পর্কে আগাম মন্তব্য করা যায় না। বিগত সময়ে ট্রাম্প কখন কী করেছেন বা কী বলেছেন, তা বলা যাবে। কিন্তু আগাম বলা যায় না। ট্রাম্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এমন মন্তব্য করতে হচ্ছে। জটিলতা সৃষ্টি করে কিংবা আদালতের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার অনুন্নত অনেক দেশের সংস্কৃতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা দিতে পারে। সুতরাং শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেজন্য শুধু বুথ ফেরত জরিপ-ই নয়, নির্বাচনী ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সম্মান চতুর্থ বর্ষ, ইডেন মহিলা কলেজ।

এইচআর/এমএস

‘ট্রাম্প হেরে গেলে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন কী না? এ বিষয়ে পূর্বানুমান করা যাচ্ছে না। কারণ, ট্রাম্প সম্পর্কে আগাম মন্তব্য করা যায় না। বিগত সময়ে ট্রাম্প কখন কী করেছেন বা কী বলেছেন, তা বলা যাবে। কিন্তু আগাম বলা যায় না। ট্রাম্পের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য এমন মন্তব্য করতে হচ্ছে। জটিলতা সৃষ্টি করে কিংবা আদালতের দোহাই দিয়ে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার অনুন্নত অনেক দেশের সংস্কৃতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা দিতে পারে। সুতরাং শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেজন্য শুধু বুথ ফেরত জরিপ-ই নয়, নির্বাচনী ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]