সরকারি মাধ্যমিকের বিএড শিক্ষকগণ ইনক্রিমেন্ট বঞ্চিত কেন?

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০৩ এএম, ১৭ নভেম্বর ২০২০

মো. আব্দুল বাছেত

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডকে সোজা রাখতে শিক্ষকের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা যা ব্রত নিয়ে কাজ করেন। এটা পৃথিবীর সকল পেশার সেরা পেশা। শিক্ষকরা হচ্ছেন সভ্যতার ধারক বাহক। এরা শুধু শিক্ষাদানই করেন না, এরা জাতীর কাণ্ডারি,মানুষ গড়ার কারিগরও। আর এই কারিগরদের আলাদা দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা এবং আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি আর্থিক সম্মানী,বেতন ভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

আমার দেশের শিক্ষকদের জন্য শুধু মৌখিকভাবে মর্যাদা ও সম্মানীর কথা বলতে শুনি। অথচ প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষকদের মধ্যে নানা দাবি ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আর্তনাত সর্বদাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পত্র পত্রিকায় দেখা যায়। সরকার শিক্ষাকে দারিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার বিবেচনা করেছেন। যেখানে শিক্ষকের ভূমিকায় শ্রেয়। সেক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন প্রণোদনা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করলে যেমন শিক্ষাদানে গতি বাড়বে তেমনি শিক্ষার মানও বৃদ্ধি পাবে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (SDG) ৪ নম্বরেই রয়েছে মানসম্মত শিক্ষার বিষয়টি। যেখানে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে যে, মানসম্মত শিক্ষার পূর্ব শর্ত হলো শিক্ষকের গুণগত মানবৃদ্ধি। নিঃসন্দেহে শিক্ষকদের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে চাইলে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্মানীর বিষয়টিকেও সমান গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে নতুবা অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণ কখনোই সম্ভব হবে না।

দীর্ঘদিন যাবৎ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের সাপেক্ষে বিএড এর জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১৭.০৭.১৯৭০ সালের স্মারক নং -শিম/শাখা-৪/৮৩৩/১(৩০০) আদেশের কারণে মাস্টার্স ও বিএড এর ফলাফলের ভিত্তিতে যোগদানের আগে এবং পরে /৩ টি ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্য হন। ১৯৭০ সালের পর থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকগণ এই সুবিধা পেয়ে আসছেন।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, বিভাগ/জেলার সংশ্লিষ্ট এজি অফিস অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন ও অনুবিভাগ শাখার স্মারক নং ০৭.০০.০০০০.১৬২.০৭.০০২.২০১৮.২৭ তারিখ ০৫-০২-২০১৯ এর পত্রের আলোকে এবং ২০১৫ সালের পে-স্কেলের ১২ (৪) ধারা ব্যাখ্যা করে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অগ্রিম বর্ধিত বেতন মঞ্জুরের আদেশ প্রত্যাখ্যান করেছে৷

পত্রের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে, চাকুরিতে প্রথম নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে এই ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্তির সুযোগ আছে, কিন্তু চাকরিকালীন ও পদোন্নতির পর এই ইনক্রিমেন্ট প্রাপ্তির সুযোগ নেই। উল্লেখ্য, ১২(৪) কলামটি ৯ম গ্রেডের জন্য প্রযোজ্য যা ১০ম গ্রেডের জন্য নয় এবং ২০১৫ সালের জাতীয় পে-স্কেলে ১২ (৪) ধারাতে যা বলা আছে অনুরুপ পূর্বের ন্যায় ২০০৫ ও ২০০৯ সালের পে-স্কেলের ৯ (৪) ধারাতেও হুবহু একই কথা ছিল। এছাড়া ২০১৫ সালে জাতীয় পে-স্কেলে স্পষ্টভাবে ১৯৭০ সালের আদেশ বহাল রাখা হয়েছে।

অন্যান্য জাতীয় বেতন স্কেলের ন্যায় ১৪/১২/২০১৫ তারিখে জারিকৃত জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ তেও একইভাবে advance increments বা অগ্রিম বর্ধিত বেতন পাওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এখানে কোনরূপ পরিবর্তন করা হয়নি। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ এর অনুচ্ছেদ ১২ এর উপ অনুচ্ছেদ (২) এ বলা হয়েছে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান [বর্তমান বাংলাদেশ] শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্মারক নং- Education Department Memorandum Nos. SIV/830-Edu, dated 18th July, 1970; SIV/831-Edu, dated 18th July, 1970; 832-Edu, dated 17th July, 1970; 833-Edu, dated 17th July, 1970 অনুযায়ী উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা, যাহা অগ্রিম বর্ধিত বেতন মঞ্জুরির সহিত সম্পর্কযুক্ত বিধানাবলী বলবৎ থাকিবে।"

১৯৭০ এর আদেশে বলা আছে, advanced increments provided for higher qualifications against the various posts shown in the schedule shall be admissible , with effect from the 1st June 1970, on satisfying the conditions laid therein ,such advance increments shall also be admissible to the existing incumbents satisfying the prescribed conditions. উক্ত আদেশে কোথাও যোগদানের পূর্বে বিএড ডিগ্রি অর্জনের কথা বলা হয়নি।

শিক্ষকদের বিএড ডিগ্রি অর্জনের জন্য অগ্রিম বর্ধিত বেতন “The advance increments shall be allowed at the time of recruitment or acquisition of higher qualification, whichever is later.” –এর নীতির আলোকে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ এর পূর্বে উপর্যুক্ত ভাবেই প্রদত্ত হয়েছে। শিক্ষকতা পেশায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেমন-ভারত এবং পাকিস্তানের শিক্ষকগণ এ সুযোগ পূর্ব থেকেই পেয়ে আসছেন, যা শিক্ষকদের প্রণোদনা হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট ও উৎসাহ প্রদানের জন্য বর্তমানেও চলমান।

জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ এর অনুচ্ছেদ ৩৫ এর উপ অনুচ্ছেদ (২) এ বলা হয়েছে, “উপ-অনুচ্ছেদ (১) এর অধীন রহিতকরণ সত্ত্বেও উক্ত আদেশের ভাতাদি ও সুযোগ-সুবিধাদি সংক্রান্ত বিধানাবলী এবং তৎসম্পর্কিত প্রজ্ঞাপন, আদেশ, অফিস স্মারক ও পরিপত্রসমূহ, এই আদেশের অধীন ভাতাদি ও সুযোগ-সুবিধাদির সহিত সঙ্গতি সাপেক্ষে বলবৎ রহিয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে।”

অপরদিকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১৯৯১ সাল এবং ২০১৮ সালের সংশোধিত নিয়োগবিধিতে কোথাও যোগদানের পূর্বেই বিএড ডিগ্রি অর্জন করতে হবে এমন ধারা উল্লেখ করা হয়নি, যোগদানের পূর্বে এবং পরে বিএড ডিগ্রি অর্জনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ২০১৮ সালের সংশোধিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছে , যেখানে বলা হয়েছে-
(ক) ৪ (চার) বৎসর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান), বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা
(খ) শিক্ষায় ৪ (চার) বৎসর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান) অথবা
(গ) স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রি Bachelor of Education (B.Ed.)
বা Diploma in Education (Dip. In Ed.) ডিগ্রি/ডিপ্লোমা।
চার বৎসর মেয়াদি স্নাতক (সম্মান), বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের ৫(পাঁচ) বছরের মধ্যে Bachelor of Education (B.Ed.) বা Diploma in Education (Dip. In Ed.) ডিগ্রি/ডিপ্লোমা অর্জন করতে হবে। তাই নিয়োগবিধি অনুযায়ী উল্লিখিত ডিগ্রিধারীদের ৫(পাঁচ) বছরের মধ্যে উক্ত ডিগ্রি/ডিপ্লোমা অর্জন করলে তাদের অতিরিক্ত যোগ্যতা অর্জন হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ এর ২৪ অধ্যায়ের কৌশল ১ এ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে ২ মাসের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণ এবং ৩ বছরের মধ্যে বিএড কোর্স সম্পন্ন করার নির্দেশনা প্রদান করেন। আবার, জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০ এর অধ্যায় ২৫ এ শিক্ষকের মর্যাদা, অধিকার ও দায়িত্ব বিষয়ের কৌশল ৪ এ বলা হয়েছে যে, "শিক্ষাক্ষেত্রে ও সমাজে বিশেষ অবধান, মৌলিক রচনা ও প্রকাশনার জন্য শিক্ষকদের সম্মানিত ও উৎসাহিত করা হবে"। অথচ অগ্রিম বর্ধিত বেতন থেকে বঞ্চিত করায় শিক্ষকদের উচ্চ শিক্ষা অর্জনে নিরুৎসাহি করা হচ্ছে। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ২০১৫ সালের পূর্বে ৯০০০ শিক্ষক বর্ধিত বেতন পেলেও পরবর্তীতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ তাদের প্রাপ্য অগ্রিম বর্ধিত বেতন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যা একই অধিদপ্তরে কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে চরম বেতন বৈষম্য তৈরি করেছে৷

সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ জারির পর হতে। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ জারির পূর্বে ৪৫ বছর ধরে কার্যকর ছিল, এখন সরকার এটি হতে সরে এসে চাকরিতে প্রথম নিয়োগ লাভের সময় প্রাপ্য হবেন, কর্মরত অবস্থায় অর্জন করলে পাবেন না এই নীতি কার্যকর করেছেন । এই ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে শিক্ষা ডিপার্টমেন্টের সাথে অন্যান্য ডিপার্টমেন্টকে তুলনা করলে হবে না। শিক্ষকদের এই অগ্রিম বর্ধিত বেতন থেকে বঞ্চিত করলে অবশ্যই গুণগত শিক্ষার্জনে ব্যত্যয় ঘটবে। এটি শিক্ষক শিক্ষিকাদেরকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করবে, যা শিক্ষার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এটি ভেবে দেখা দরকার এবং মানসম্মত শিক্ষার স্বার্থে ও মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করতে শুধু পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়, পদোন্নতির পদেও সম্প্রসারণ করা আবশ্যক।

এ নীতি গ্রহণ করায় শিক্ষক শিক্ষিকাদের উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য ১৯৭০ সাল হতে দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে প্রচলিত 'অতিরিক্ত/অগ্রিম বর্ধিত বেতন (advance increments)’ কর্মরত অবস্থায় অর্জিতদের জন্য বন্ধকরণ উপর্যুক্ত আদেশ ও জাতীয় শিক্ষানীতির ঐ কৌশলের সাথে সাংঘর্ষিক । একই সাথে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৪৫ বছর ধরে প্রচলিত এ সুবিধা এভাবে বন্ধকরণ বা সংকোচনের বিষয়টি সংবিধান এবং সরকারি মাধ্যমিকের নিয়োগবিধির সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

বর্তমানে সরকারি মাধ্যমিকের শিক্ষকগণ টাইম স্কেল, সিলেকশন গ্রেড থেকে বঞ্চিত, নেই কোন যৌক্তিক পদসোপানের মাধ্যমে পদোন্নতি, একই পদে ৩০/৩৫ বছরের চাকরি করার বঞ্চনা, তার ওপর উচ্চতর বিএড ডিগ্রি অর্জনের জন্য অগ্রিম বর্ধিত বেতন থেকে বঞ্চিত, এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। একজন শিক্ষক এতো আর্থিক অপ্রাপ্তি, এতো বিয়োগব্যথা নিয়ে কীভাবে ফলপ্রসূ শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করবেন তা শিক্ষা মনোবিজ্ঞানিরাই বলতে পারবেন।

সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা এখন আদালতমুখী। সকল সমস্যার সমাধানের জন্য আদালতের রায়ের অপেক্ষায় থাকতে হয়। মাধ্যমিক আজ কেসে কেসে জর্জরিত। এরকম চলতে থাকলে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়বে। তাই সরকারের কাছে স্বনির্বন্ধ আবেদন মানসম্পন্ন শিক্ষার্জনের লক্ষ্যে জাতীর কাণ্ডারি প্রত্যেক শিক্ষক কে গুণগত শিক্ষক তৈরির নিমিত্তে শিক্ষকদের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রিম বর্ধিত বেতন পূর্বের ন্যায় বহাল রাখার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি কামনা করছি ।

লেখক : সহকারী শিক্ষক, ৩৪ তম বিসিএস নন-ক্যাডার (মাধ্যমিক শিক্ষা) বিএল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সিরাজগঞ্জ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

শিক্ষকদের এই অগ্রিম বর্ধিত বেতন থেকে বঞ্চিত করলে অবশ্যই গুণগত শিক্ষার্জনে ব্যত্যয় ঘটবে। এটি শিক্ষক শিক্ষিকাদেরকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে নিরুৎসাহিত করবে, যা শিক্ষার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এটি ভেবে দেখা দরকার এবং মানসম্মত শিক্ষার স্বার্থে ও মেধাবীদের এ পেশায় আকৃষ্ট করতে শুধু পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনাই যথেষ্ট নয়, পদোন্নতির পদেও সম্প্রসারণ করা আবশ্যক।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]