সাকিবের ক্ষমা প্রার্থনা এবং মৌলবাদের সাম্প্রতিক চিত্র

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:০১ পিএম, ১৯ নভেম্বর ২০২০

ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান সম্প্রতি কলকাতার একটি কালীপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কারণে মৃত্যুর হুমকি পেয়ে জনতার কাছে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছেন। সাকিবের ঘটনাটি তখনই ঘটল যখন কয়েকটি ইসলামী দল বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের জন্য দাবি তুলেছে। তারও দুই সপ্তাহ আগে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাটে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে এবং মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ১ নভেম্বর কুমিল্লার মুরাদনগরে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার গুজব তুলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা ঘটেছে।

সাকিবের ক্ষমা চাওয়ার দরকার ছিল কিনা এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে এখন। এবং তা বাংলাদেশ নয়, ভারতেও বিস্তৃত হয়েছে। এএফপিসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের এ সংক্রান্ত খবর দেখলাম ভারতীয় পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে এসেছে। ভারতের নানা হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীও এখন সাকিবের কাজে হতাশা ব্যক্ত করেছে। বলেছেন, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকারের প্রতি সাকিব আরও মর্যাদা দেবেন বলেই তারা আশা করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ও আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত একাধিক নেতা বলছেন, আজকের বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তাতে ‘প্রাণের ভয়ে’ কার্যত বাধ্য হয়েই যে সাকিবকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে এটা তারা বুঝতে পারছেন।

সাকিবের ঘটনা নিয়ে আমি একটি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, সাকিবকে আমি পছন্দ করি খেলোয়াড় হিসেবে। তার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ড যদি আমাদের রাষ্ট্র এবং খেলার জন্য ক্ষতিকারক না হয় তাহলে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কালীমন্দিরে যাওয়ার জন্য তাকে যারা তলোয়ার নিয়ে মারতে চায় আমি তাদের তীব্র নিন্দা জানাই। সেসব কথিত মুসলিমদের জন্য আমার করুণা হয় আর এ ঘটনায় সাকিব যদি বিতর্ক এড়াতে ক্ষমা চায় সেটা তার ব্যক্তিগত অধিকার এবং অভিরুচি। সেখানে দোষের কিছু দেখি না।

আমি কেন নিন্দা জানালাম সে কারণে সাকিবকে কালীমন্দিরে যাওয়ার অপরাধে যারা সাজা দিতে চায় সে মানসিকতার লোকজন আমার ওয়ালে এসে আমাকে আক্রমণ করেছে। তাতেই বুঝতে পারি কতটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেলে একজনকে কালীমন্দিরে পূজা তো নয়, সামান্য আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেওয়ার জন্য ক্ষমা চাইতে হয়। আমার ওয়ালের কমেন্ট সেকশন ফিল্টার করা ফলে অনেকে কমেন্ট করে দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। আবার ভুয়া আইডির অনেককে অ্যাগ্রেসিভ কমেন্টের জন্য ব্লক করতে হয়েছি।

ক্ষমার প্রসঙ্গ আসায় বলে রাখি যে সাকিব ক্ষমা চেয়েছে তার দিক থেকে বিতর্ক এড়িয়ে নির্ঝঞ্ঝাট থাকার জন্য। বছর দুই আগে এক হিন্দু দেবীর প্রশংসা করতে গিয়ে আমার শব্দ প্রয়োগের অসাবধানতার জন্য বিতর্ক সৃষ্টি হলে আমাকেও ক্ষমা চাইতে হয়েছে। ধর্মীয় বিতর্কে ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে আমি কোনও অপরাধ দেখি না। ক্ষমা চাওয়ার মতো দোষ কেউ করেছে কী করেনি- চিন্তা করার দরকার নেই। দোষ না করলেও, কোনো ধর্মকে অবমাননা করার ইচ্ছে না থাকলেও, ধর্মীয় উন্মাদদের সঙ্গে বিরোধ এড়াতে ক্ষমা চাওয়াই উত্তম। কারণ ঘটনার পেছনে ধর্মের কলকাঠি নাড়ানো ধর্মীয় মৌলবাদী নেতারা যে এটাকে ব্যবসা হিসেবে নিয়েছে, তাদের কথায় যে লোকগুলো রাস্তায় নেমেছে তাদের এইটুকু আক্কেল-জ্ঞান নেই কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক বিবেচনা করার।

কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের সমাজে মৌলবাদ এতটা প্রকট হিসেবে দেখা দেয়নি, এখন যা দেখছি। আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি, ২০০৩ সালের। আমি তখন ঢাকেশ্বরী মন্দিরের কাছাকাছি পলাশী এলাকায় থাকতাম। কাছাকাছি থাকার কারণে এরশাদ আমলের শেষ দিকে বাবরী মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে তৌহিদী জনতার নামে মন্দিরটি পোড়ানোর সময় জীবনের ভয়কে উপেক্ষা করে মন্দির পোড়ানোর কিছু ছবি তুলতে পেরেছিলাম। একমাত্র আমিই পেরেছিলাম আগুন লাগানোর ছবি তুলতে। রয়টার্স সেই ছবি প্রচার করেছিল ঢাকা থেকে। যাক, সাংবাদিক হিসেবে ২০০৩ সালে আমাকে আরতি নৃত্য প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণের অতিথি করা হয়। প্রতিযোগিতায় প্রথম হওয়া ছেলেটির হাতে আমি পুরস্কার তুলে দিয়েছিলাম।

অনেক দিন পর পলাশী এলাকায় একটি ছেলে আমাকে সালাম দিয়ে এগিয়ে এসে পরিচয় দেয়। আমি তাকে চিনতে পারছিলাম না বলে সে তখন পুরস্কার দেওয়ার কথা বলে। নাম জিজ্ঞেস করলে সে একটি মুসলিম নাম বলায় আমি বিস্মিত হই। তারপর সে বলল যে, সে ধর্মীয় পরিচয় গোপন করে মন্দিরের আরতি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। আমি জানি না প্রতিযোগিতার আয়োজকরা এটা জানতেন কিনা। জানলে তাদের প্রতিক্রিয়া কি হতো! কিন্তু আমি এখন চিন্তা করছি এই সময়ে যদি এ ধরনের একটি খবর মিডিয়ায় আসতো তাহলে ওই ছেলেটির জান নিয়ে সমস্যা হয়ে যেত। সাকিব আল হাসানের মতো তাকেও কেউ কেউ কুপিয়ে টুকরো টুকরো করার কথা বলতো। আমার ধারণা শুধু মুসলিম মৌলবাদীরা নয়, হিন্দু মৌলবাদীরাও তাকে সহ্য করত না এখন।

গত দুই দশকে বাংলাদেশে যে হারে মুসলিম মৌ্লবাদীরা জঙ্গি রূপে আত্মপ্রকাশ করেছে, হলি আর্টিজান ঘটাচ্ছে, গলা কেটে ভিন্ন মতের মানুষদের হত্যা করছে, কুপিয়ে মারছে- সেই মাত্রায় না হলেও হিন্দু মৌলবাদও জোরেশোরে মাথাছাড়া দিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি হিন্দু মৌলবাদীরাও হিংস্রতা নিয়ে রাস্তায় শক্তি প্রদর্শন করছে- চিহ্নিত কিছু হিন্দু মৌলবাদীর প্ররোচনায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় মুসলিম মৌলবাদীরা যেরকম নানা গোষ্ঠী, নানা পেজ খুলে অন্য ধর্মের প্রতি, নিজের ধর্মের ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে, তেমনি হিন্দু মৌলবাদীরাও একই কাজ করছে।

বাংলাদেশি মুসলিম মৌলবাদীরা কথায় কথায় পাকিস্তানের উদাহরণ দেয়, যেমন- সাকিব আল হাসানকে ফেসবুক লাইভে এসে সিলেটের যে লোকটি দা দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করার কথা বলেছে সে লোকটি সাকিবকে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মতো আচরণ করতে পরামর্শ দিয়েছে। অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশী হিন্দু মৌলবাদীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুপ্রাণিত কলকাতার হিন্দু মৌলবাদীদের দিয়ে। এরা যৌথভাবে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ চালাচ্ছে- পেজ চালাচ্ছে- যেখানে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা তো আছেই, আছে হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যা অনেকগুলো অভিযোগ। ‘ইন্ডিয়া বাংলাদেশ ইয়ুথ ফোরাম’ তেমন একটি।

প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন আসছে আমাদের সোসাইটি এত দ্রুত মৌলবাদী মানসিকতায় আচ্ছন্ন হচ্ছে কেন? এ নিয়ে আরেক দিন বলবো আশা করছি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]