বিএনপি কি প্রাসঙ্গিক থাকতে পারছে?

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ০৯:৩৪ এএম, ২১ নভেম্বর ২০২০

সম্প্রতি জাতীয় সংসদের দুটি আসনের উপনির্বাচন হয়ে গেল। ঢাকা-১৮ এবং সিরাজগঞ্জ-১। দুটিতেই বিএনপি পরাজিত হয়েছে। কিন্তু এটি আসলে খবর নয়। খবর বিএনপির ভোট প্রাপ্তি। সিরাজগঞ্জে বিএনপি প্রার্থী ভোট পেয়েছে মাত্র ৪৬৮ আর ঢাকায় ৫ হাজার ৩৬৯। যে কেউ বুঝবে যে, এটি বিএনপির ভোট নয়। আরও অনেক বেশি ভোট তার আছে।

নির্বাচনের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন আছে, অস্বস্তি আছে, অভিযোগ আছে। প্রশ্ন আছে নির্বাচন কমিশনের কাণ্ড নিয়ে, শাসকদল আওয়ামী লীগের আচরণ নিয়ে। এবং এই প্রশ্নগুলো বিএনপির দিক থেকেই বেশি উচ্চারিত। কিন্তু বিএনপি এমন বাস্তবতায় নিজেকে কীভাবে দেখছে সেটি বড় জানবার জায়গা। যে নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা নাই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে বা না করলে কোনো হেরফের হয় না, সেই নির্বাচনের মনোনয়ন নিয়েও নিজেদের মধ্যে রক্তারক্তি করে দলের নেতাকর্মীরা।

বিএনপি বড় রাজনৈতিক দল। বহু নেতাকর্মীও আছে তার। বহুবছর দেশ শাসন করেছে দলটি। নেতা, আছে, কর্মী আছে, বক্তা আছে, কিন্তু সংগঠক আছে কিনা সেটি বোঝা যায় না। বিএনপি এমন একটা দল যার যার নেতৃত্ব জিয়া পরিবারের বাইরে যেতে পারবে না। এমন একটা কাঠামো যেন, অনেকটা এই পরিবারের মালিকানা। জিয়া পরিবারের নেতৃত্ব ছাড়া এই দলকে কল্পনা করা যায় না, তারা যেখানে বা যত দূরেই থাকেন না কেন। তাই খালেদা জিয়া জেলে গেলে বা না গেলেও দল চালান পুত্র তারেক রহমান কিন্তু এতবড় দল সামলানোর মতো ব্যক্তিত্ব তার আছে কিনা সে নিয়ে দলের ভেতরই সংশয় আছে। দলের শৃঙ্খলা ধরে রাখার যোগ্যতা ও সক্ষমতা, আন্তরিকতা নিয়েও আনেক জিজ্ঞাসা।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতকে নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর দল ও দেশ কার্যত চালিয়েছেন তারেক রহমান ও তার বন্ধুরা তাদের হাওয়া ভবন নামের সদর দফতর থেকে। দেশব্যাপী খুন, হত্যা, ধর্ষণের সেই সময়টায় ঘটে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ঘটনা আর সেটি হলো ২০০৪ সালের একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করা, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করে ফেলা। বলা হয় এই একটি ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিকে চিরতরে বিভাজিত করেছে যেখানে বিশ্বাসের জায়গাটি আর নেই একেবারে। এবং এর পুরো দায় গিয়ে বর্তায় তারেক রহমানের ওপর।

বিএনপি-জামায়াতের শাসন কার্যের ব্যর্থতায় আসে সেনাসমর্থিত বিরাজনীতির ১/১১। মাত্র ২৯ আসন নিয়ে ভরাডুবি হয় ২০০৮ সালের নির্বাচনে। এবং সেই থেকে তাদের বিপর্যয় চরছে।

বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেন তাদের নেতাকর্মীরা শাসকদলের অত্যাচারে বিপর্যস্ত। কিন্তু গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তারেক রহমান আছেন লন্ডনে। তিনি সেখানে আছেন সপরিবারে, সবান্ধব। দল পরিচালনার দায়িত্ব অসুস্থ মায়ের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তিনি বিদেশে গেছেন। তারপর খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে জেলে গেলে তারেক রহমানই হয়ে যান একক নেতা। তবে নেতা হলেও রাজনীতির কোনো ঝামেলা গায়ে লাগেনি তারেক রহমানের।

একটা কথা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, জোশহীন মনোবৃত্তি দিয়ে দল চালানো কঠিন। যে সাহস ও নিবেদন লাগে দল চালাতে সেটা নেই বিএনপিতে। তাই দলের নেতারা যখন অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়নি, তখন পাল্টা প্রশ্ন জাগে আপনাদের দলের নেতা, কর্মীরাই বা কেন ভোট দিতে কেন্দ্রে উপচে পড়ে না? সব করব, কিন্তু ঝুঁকি নেব না, এমন কর্মীরা অনেকটা সেই রাজনীতি করেন যেটা অনেকটা পার্টটাইম কাজের মতো। এটাই রাজনীতির জোশহীন মনোবৃত্তি।

দলের প্রধান নেতা এখন তারেক রহমান। খালেদা জিয়া থেকেও নেই। তিনি বিদেশে বসে দল চালান। দেশে অনেক নেতা আছেন। কিন্তু দলের গন্তব্য কোথায় সেটি নিয়ে দলের ভেতরই সংশয়। হয়তো ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না।

মির্জা ফখরুল, গয়েশ্বর বা রিজভী অনেক কথা বলেন। তারা গুছিয়ে কথাও বলেন। কিন্তু দলের শীর্ষপর্যায়ের এই অবস্থা, কর্মীদের এমন হালকা ঝাপসা জড়িত থাকার মতো আচরণ নিয়ে রাজনীতিতে ভালো ফল করা যায় না। নির্বাচনী ময়দান হলো লড়াইয়ের ক্ষেত্র। সেখানে অন্যের মুখের গ্রাস ছিনিয়ে আনতে না পারলে জয় পাওয়া সম্ভব নয়। আর সেটা করার মতো নৈতিক মনোবল লাগে, মানুষের সাথে সেই সম্পর্কটা লাগে যার ভিত্তিতে জনগণ একটা দলকে গ্রহণ করে। জনগণের ইস্যুতে নীরব থেকে শুধু একটি পরিবারের জন্য উদ্বেগ মানুষকে উজ্জীবিত করে না।

১৯৭৫-এর পর একুশ বছর আওয়ামী লীগ কি কঠিন সময পার করেছে। করেছে সেটা বাংলাদেশের মানুষ জানে। কত কষ্ট করেছে দলের কর্মীরা। কীভাবে কত নির্মম নির্যাতন সইতে হয়েছে তাদের। কিন্তু তারপরও দলের নেতাকর্মীরা চোয়াল টিপে সামরিক শাসকদের সঙ্গে, লড়াই করেছে। চরমভাবে বিদ্বেষ লালন করে এমন শাসকদলের সাথে লড়াই যুদ্ধ করেছে আওয়ামী লীগ কর্মীরা, সেটি হয়তো লীগ কর্মীরা। এটি ভেবে দেখে দেখার গুরুত্ব আনেক। ক্ষমতায় থাকা বা না থাকা বিএনপি নেতৃত্ব। থাকা- রাজনৈতিক দলের কাজ হলো নিজেকে সবসময় দেশ, জাতির কাছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রাসঙ্গিক রাখা।

শেখ হাসিনার নিজস্বতা, তার কর্মীদের তেজস্বী মনোভাবের কারণেই শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট আর ২০০৪ সালের একুশে আগস্টের মতো দুটি বড় ঘটনার পরও উদ্যমে ফিরেছে ক্ষমতায়। অন্যের অনুকম্পার উপর বেঁচে থাকতে শেখেননি শেখ হাসিনা। দল হতে হয় জনতার, কর্মী হতে হয় তেজস্বী আর নেতৃত্বের থাকতে লড়াই করে যাওয়ার দৃঢ়তা। তবেই না জনগণ সাড়া দেয় তার ডাকে।

এইচআর/বিএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]