ভাস্কর্য, সাকিব আর তাদের মন-মানসিকতা

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৫৬ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০২০

সৈয়দ ইফতেখার

দিন যত যাচ্ছে আমরা আরও অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। হচ্ছি বিকৃত মানসিকতার এক একজন ব্যক্তি। কী বড়, কী ছোট। সবার মধ্যেই একই প্রবণতা! কে কাকে টেক্কা দেবে, কে কত বিত্তশালী হবে, কে ক্ষমতা নেবে, আরও কত কী! একবারও ভাবছি না- অন্যের কথা। পাশে থাকা মানুষটির কথা। অসহায়ের কথা। অর্থ-বিত্ত-ক্ষমতার পেছনে লোভ কাজ করে। ইদানীং ধর্মও ব্যাপকহারে ব্যবহার হচ্ছে লোভের অংশ হিসেবে। ধর্মকে রাজনীতির অংশ পরিণত করতে করতে, একে পেশাও বানিয়ে ফেলা হয়েছে। পেশা থেকে তা ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর সাঁকোও হয়ে উঠেছে। জল কিন্তু বহুদূর গড়িয়েছে।

মার্কিন লেখক মাল্টবি ডেভেনপোর্ট (Maltbie Davenport) ঠিকই বলেছেন, ধর্ম একটা সময় ব্যবসাই হয়ে পড়ে। হয় সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার। এমন উক্তি আরও অনেকেই করেছেন। ম্যাথিউ সি. গডফ্রি ও মাইকেল হবার্ডের ‘বিজনেস অ্যান্ড রিলিজিয়ন’ পড়লে বিষয়টি আরও স্পষ্ট লাগবে। সম্প্রতি রাজধানীর ধোলাইপাড়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্যকে ‘মূর্তি’ আখ্যা দিয়ে তা অপসারণের দাবি করেছে কিছু ইসলামিক গোষ্ঠী। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও তাদের বিরোধিতায় নির্মাণ করা যাচ্ছে না ভাস্কর্য। তাদের ভাষায় এটি ‘মূর্তি’! হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা, সরকার কথা না শুনলে তওহিদি জনতা নিয়ে শাপলা চত্বর কায়েম করবে! আশ্চর্য! ভাবা যায়! যিনি রচনা করলেন নতুন একটি দেশ, যার নেতৃত্বে আজ স্বাধীন বাঙালি আমরা তাকে নিয়ে এমন সব কথা! কত বড় স্পর্ধা হলে এমন বলা যায়? ‘মৌলবাদীদের কী আস্ফালন! এর আগে ২০১৭ সালের মে মাসে, হেফাজতে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলের অব্যাহত দাবির মুখে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে গ্রিক থেমিসের ভাস্কর্য সরানো হয়। সুতরাং তাদের আস্ফালন নতুনও নয়।

এটাও সত্য যে, ধর্মান্ধ গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে ইস্যু করে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। তাদের রুখে দিতে হবে, দেশ ও দেশের উন্নয়নের স্বার্থে। যারা এর বিরোধিতা করছেন তারা স্বাধীনতা, সংবিধান ও আইনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তারা দেশদ্রোহী। এমন মানুষদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি না করলে আদতে কোনো উন্নয়ন কাজে আসবে না। দেশ কেবল পেছাবেই। এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ তারাই করছে, যারা ঘুরে ফিরে ধর্মকে ব্যবহার করে ফায়দা নিতে চায়। কিছু দিন আগে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের সঙ্গেও যা করা হয়েছে সেটিও একই দুঃসাহসের অংশ। পদে পদে তারা বাধা সৃষ্টি করতে শুরু করেছে এখন। তাই বিভিন্ন কিছু ঘটাচ্ছে। প্রথমে ধর্ম, জাত যায়-যায় করে তারা ফেনা তোলে। পরে স্বাধীনচিন্তা আর মতপ্রকাশকে দমাতে আঘাত করে।

এমন ধর্মান্ধদের উদ্দেশ্যে করবো একটা প্রশ্ন। কখনও মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের পূজা উদ্বোধন করতে দেখেননি? মণ্ডপে কখনও বক্তৃতা দিতে শোনেননি? খবরের কাগজ, টেলিভিশন কিংবা অনলাইন নিউজ পোর্টালে পড়েননি সে সংবাদ? পড়েছেন হয়ত। ভুলে গেছেন। যদি পড়ে না থাকেন, সার্চ দিয়ে পড়ে নিন। মাথায় কিছু ঢুকলো কিনা, একা একা নিজের মনকে প্রশ্ন করুন। কথা হচ্ছে, মন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা পূজা উদ্বোধন করলে ঠিক আছে, কিন্তু ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান কলকাতায় সেটি করলে মহাভারত অশুদ্ধ!

মহসিন তালুকদার, যে মানুষটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লাইভ ভিডিও’তে দা উঁচিয়ে মিস্টার সেভেনটি ফাইভকে হত্যার হুমকি দিয়েছে সেও একই মতাদর্শের। সিলেটের সদর উপজেলার শাহপুর তালুকদারপাড়ার আজাদ বক্স তালুকদারের ছেলের কঠিন বিচারের দাবি জানাচ্ছি। এমনকি সাকিবকে নিয়ে ভার্চুয়ালি যারা বিরূপ মন্তব্য ছড়িয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। মন-মানসিকতা কতটা নীচ হলে বিরূপ মন্তব্য হতে পারে! তারা কট্টর, তারা চরমপন্থি। এমন কি ক্ষমা চাওয়ার পরও বাজে মন্তব্য এসেছে (যা আরেকজনের মতপ্রকাশকে অশ্রদ্ধা করার শামিল)। কটুক্তিকারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে সাজার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। কারণ এটি শুধু দেশীয় সংবাদ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হয়েছে আন্তর্জাতিক শিরোনামও। আর এর রেশও টানতে হবে অনেকদিন। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাকিবকে দেয়া হয় গান-ম্যান। হুমকিটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নেয়া হয়েছে বলেই এটি করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এখন কথা হচ্ছে, গান ম্যান দেয়ার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো কেন! বাংলাদেশ কি তাহলে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের পথে! সাধারণভাবে সাকিবের চলাফেরায় রয়েছে কি শঙ্কা! এগুলো ভাবলে নিজেকে ছোট মনে হয় এখন।

ধর্মের দোহাই দিয়ে কিছু দিন আগেই একজন ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। লালমনিরহাটের পাটগ্রামের বুড়িমারীতে গেলো ২৯শে অক্টোবর আবু ইউনুস মোহাম্মদ শহীদুন্নবী জুয়েলের নির্মম সেই পরিণতি দেখেছি আমরা। শুধু পিটিয়েই নয়, পরে পুড়িয়ে ফেলা হয় তাকে। এই ঘটনায় জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি পবিত্র কোরআন অবমাননার প্রমাণ পায়নি। সুতরাং স্পষ্ট হয়েছে, পুরোপুরি গুজব ছড়ানোর বিষয়টি। আর যদি অবমাননা হয়েই থাকে, তাহলে কাউকে এমনভাবে মেরে ফেলার জন্য এলাকাবাসী কে? কিসের এখতিয়ার তাদের! এই ঘটনাগুলোর দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না বলেই পরবর্তীতে অন্য কোনো ব্যক্তি, অন্য কোনো স্থানে সাহস পায় ধর্মকে ব্যবহারের। লালমনিরহাট কেবল উদাহরণ মাত্র। প্রতীক মাত্র। ধর্ম ছাড়াও সাধারণ গুজব ছড়িয়ে দেশের আনাচে কানাচেতে প্রায়ই নানান ঘটনা ঘটছে। যার নেই প্রতিকার।

ধর্ম অবমাননার গুজব রটিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও কম নয়। যা নিয়ে উদ্বেগজনক এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ধর্ম অবমাননার গুজবে হিন্দুদের মন্দিরে ও বাড়িঘরে ঘটে হামলার ঘটনা। যা সাম্প্রতিক ইতিহাসে জঘন্যতম ঘটনা। তারও আগে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে পবিত্র কোরআন অবমাননা করে ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার অভিযোগ তুলে কক্সবাজারের রামুর ১২টি বৌদ্ধ মন্দিরে আগুন দেয়া হয়। হামলা করা হয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরেও। এ ঘটনায় ১৯টি মামলার কোনোটিরই এখনও মীমাংসা হয়নি। এই রকম ঘটনা সুযোগ পেলেই ঘটছে। গুজব ছড়িয়ে কখন কি ঘটে, তার কোনো ঠিক নেই।

বর্তমানে যেমনটা চলছে, তাতে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, বোঝা যাচ্ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে গুজব পরিস্থিতিও। সব মিলিয়ে আকাশে কালো মেঘ। ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো রাজনীতির ময়দানেও যে আগামীতে প্রভাব বিস্তার করবে না, তা কে বলতে পারে? ফলে সচেতন হতে হবে এখন থেকেই। তাদের সুবিধা দেয়া আর মন জুগিয়ে চলার দিন শেষ। বাংলাদেশকে তার কাঙ্খিত উন্নয়নের মহাসড়কে আমরা দেখতে চাই। এ দেশে গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হবে, শাসক ও বিরোধীদল দুটোই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে থাকবে এমনই প্রত্যাশা। সময় থাকতে এসব নিয়ে ভাবুন। মুক্তচিন্তার লাল সবুজকে তথা জাতির পতাকাকে খামচে ধরতে চায় আজ পুরোনো শকুন...।

লেখক : সাংবাদিক।

এইচআর/এমএস

‘বর্তমানে যেমনটা চলছে, তাতে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, বোঝা যাচ্ছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে গুজব পরিস্থিতিও। সব মিলিয়ে আকাশে কালো মেঘ। ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো রাজনীতির ময়দানেও যে আগামীতে প্রভাব বিস্তার করবে না, তা কে বলতে পারে? ফলে সচেতন হতে হবে এখন থেকেই। তাদের সুবিধা দেয়া আর মন জুগিয়ে চলার দিন শেষ। বাংলাদেশকে তার কাঙ্খিত উন্নয়নের মহাসড়কে আমরা দেখতে চাই।’

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]