চীন যেভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হতে চলেছে

আলিমুল হক
আলিমুল হক আলিমুল হক
প্রকাশিত: ০৯:১২ এএম, ২৬ নভেম্বর ২০২০

আধুনিক চীনে সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল তেং সিয়াওফিংয়ের হাত ধরে, ১৯৭৮ সালে। তখন থেকে চীন বাইরের দুনিয়ার সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করতেও শুরু করে একটু একটু করে। উন্মুক্ত হবার এই প্রক্রিয়াকে কেতাবি ঢঙে ডাকা হয় ‘উন্মুক্তকরণ’ বা ওপেননেস। সমাজতান্ত্রিক চীনে তখন থেকেই বাজার অর্থনীতির যাত্রাও শুরু। সমাজতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির মিশেলে চীনে বিস্তারলাভ করে এক বিশেষ ধরনের সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। চীনারা একে ডাকেন ‘চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র’ বলে।

ধ্রুপদি সমাজতন্ত্রে বাজার অর্থনীতির বা পুঁজিবাদের কোনো স্থান নেই। চীনেও শুরুতে ধ্রুপদি সমাজতান্ত্রিক রীতিনীতিই অনুসরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এতে চীনে বিপুল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি সাধিত হতে পারেনি। তেং সিয়াওপিংয়ের আমলে তাই অনেক চিন্তা-গবেষণা করে বাজার অর্থনীতি গ্রহণ করা হয়। সমাজতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতি হাতে হাত রেখে যাত্রা শুরু করে তখন থেকেই। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন সমাজতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির এই মিশেল কোনো কাজে আসবে না। কিন্তু তাদের ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে চীন। বিগত ৪২ বছর ধরে এই ব্যবস্থা চীনে সফলভাবে এগিয়েছে। ফলাফল: চীনের ১৪০ কোটি মানুষ আজ সম্পূর্ণভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হতে চলেছে; চীনে গড়ে উঠেছে ৪০ কোটি মধ্যবিত্তের একটি শক্তিশালী জনগোষ্ঠী; চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।

চীনে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণের পথিকৃত তেং সিয়াওফিং একবার বলেছিলেন: ‘বিড়াল সাদা বা কালো যা-ই হোক না কেন, ইঁদুর ধরতে পারলেই সে ভালো বিড়াল’। চীনের এই সাবেক শীর্ষনেতার এই দর্শন কাজে লেগেছে বিগত ৪২ বছরের সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ প্রক্রিয়ায়। এই দর্শনের আওতায়-ই বলতে গেলে চীনে বিগত চার দশকে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে। যে-এলাকার মানুষকে যে-পদ্ধতি প্রয়োগ করলে দারিদ্র্যমুক্ত করা যাবে, সে-এলাকায় সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে আসছে চীনে। ফলে আমরা দেখেছি ও দেখছি, চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন দারিদ্র্যবিমোচন পদ্ধতির ব্যবহার।

বস্তুত, বিশাল চীনজুড়ে একসময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল হাজার হাজার দরিদ্র গ্রাম। দক্ষিণে ট্রপিক্যাল হাইনান প্রদেশ থেকে শুরু করে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার উত্তরাঞ্চল, পূর্বাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ এলাকা থেকে শুরু করে পশ্চিমের উচ্চ মালভূমি অঞ্চল—সর্বত্রই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল এসব দরিদ্র গ্রাম ও অঞ্চল (‘ছিল’ বলছি, কারণ এখন আর অধিকাংশ গ্রামই দরিদ্র নেই)। বৈচিত্র্যময় চীনে তাই দারিদ্র্যবিমোচনের কোনো একক পদ্ধতি কার্যকর ছিল না। চীনা নেতৃবৃন্দ এটা বুঝেছিলেন। তাই তারা যেখানে যে-পদ্ধতি কার্যকর, সেখানে সে-পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন।

jagonews24

শহরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য যখন শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছিল, তখন হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাদারকে পাঠানো হচ্ছিল গ্রামাঞ্চলে। তাঁরা গ্রামের দরিদ্র মানুষের আয় বাড়াতে সচেষ্ট হন। আর এ কাজে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি ছিল সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর সদস্যদের অন্তত একজনের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

গ্রামের মানুষের আয় বাড়ানো সহজকাজ ছিল না বটেই। ২০১৯ সালের শেষনাগাদ চীনে গ্রামীণ মানুষের সংখ্যা ছিল ৫৫ কোটির উপরে। কিন্তু চীনে চাষযোগ্য জমি সীমিত। ফলে প্রতিটি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত কৃষিজমি সরবরাহ করাও সম্ভব নয়। গড়ে আধা হেক্টর জমি একেকটি পরিবারের ভরসা। বলা বাহুল্য, এতো অল্প জমিতে সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে একটি পরিবার দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে না। তাহলে কী করা? পরিবারে অন্তত একজন সদস্য যদি কৃষিকাজের বাইরে কোনো কাজ পায়, তবে সমস্যার সমাধান হতে পারে। সেই চেষ্টাই চালানো হলো। ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো।

বর্তমানে চীনের প্রায় ২৯ কোটি গ্রামীণ মানুষ দেশজুড়ে বিভিন্ন কলকারখানায় ও সেবা খাতে কাজ করছে। তাদের গড় মাসিক আয় মাসে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ইউয়ান (বাংলাদেশি টাকায় ৪০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা)। তাদের অধিকাংশই আবার ফ্রি বাসস্থান ও খাবার পেয়ে থাকেন। এ ধরনের একজন কর্মী বর্তমানে বছরে কমপক্ষে ৩০ হাজার ইউয়ান সাশ্রয় করতে পারে। এ আয় দিয়ে ৭ সদস্যের একটি দরিদ্র পরিবার দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারে।

বলছিলাম যেখানে যে-পদ্ধতি কার্যকর, সেখানে সে-পদ্ধতি গ্রহণের কথা। চীনে দারিদ্র্যবিমোচনের লক্ষ্যে এ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে বলতে গেলে সর্বত্র। আরেকটি উদাহরণস্বরূপ পারিবারিক পর্যটনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আমি চীনের বিভিন্ন স্থানে এমন পারিবারিক পর্যটন দেখেছি, বিশেষ করে সংখ্যালঘু জাতিঅধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। স্থানীয় সরকার সংখ্যালঘু জাতির সদস্যদের সাহায্য করেছে নিজেদের বাড়িকে পারিবারিক হোটেলে রূপান্তর করতে। এতে তাদের জীবনযাত্রার মান বেড়েছে, বেড়েছে আয়। তারা দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন, কেউ কেউ হয়েছেন সচ্ছল।

আবার কোনো কোনো এলাকায়, বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের জনসাধারণকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অন্যত্র; সরকারি ব্যবস্থাপনায় তৈরি করে দেওয়া হয়েছে সমস্ত সুযোগ-সুবিধাসহ বাসস্থান, সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের জন্য কর্মসংস্থানের। তাদের বাচ্চাদের শিক্ষাদিক্ষার কথাও চিন্তা করা হয়েছে, গড়ে তোলা হয়েছে নতুন বসতি এলাকার আশেপাশে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দারিদ্র্যবিমোচনের নতুন পদ্ধতি হিসেবে চীনে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ভূমি হস্তান্তর’-কে। চীনে কৃষিজমির মালিকানা হয় সম্মিলিতভাবে। প্রতিটি দরিদ্র পরিবার এক খণ্ড জমির মালিক হন। কিন্তু এই জমি পরিবারটি বিক্রি করতে পারে না। এদিকে, দারিদ্র্যবিমোচন কার্যক্রমের ফলে দেখা গেল, বহু কৃষক শহরে ভালো বেতনে চাকরি করছে এবং তাদের গ্রামের বাড়ির কৃষিজমি বছরের পর বছর ধরে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে।

China-3

এই বাস্তবতায় সরকার ‘ভূমি হস্তান্তর’ মডেল গ্রহণ করে। এই মডেলের আওতায় একজন কৃষক তার জমি কোনো বিনিয়োগকারীর কাছে ভাড়া দিতে পারেন। বিনিয়োগকারী সাধারণত অনেকের জমি ভাড়া নিয়ে বড় আকারের খামার গড়ে তোলেন। এতে কৃষকের দু’দিক দিয়ে লাভ হয়। একদিকে তিনি বছরে প্রতিহেক্টর জমির ভাড়াবাবদ পান প্রায় ৬ হাজার ইউয়ান এবং অন্যদিকে, তার জমিতে গড়ে ওঠা খামার বা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাবার ক্ষেত্রে পান অগ্রাধিকার।

এ ব্যবস্থায় কৃষকের কোনো রিস্ক থাকে না। চায়না ডেইলির সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক খাং পিং একবার চিয়াংসি প্রদেশের কাংচৌ নামক দরিদ্র একটি গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখেন গ্রামটি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে; ধ্বংস হয়ে গেছে মিষ্টিকুমড়া চাষ হয় এমন কয়েক ডজন গ্রিনহাউস। তিনি সেখানে একজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলেন। কৃষক জানায়, বছর খানেক আগে তিনি তার জমি একজন বিনিয়োগকারীর কাছে ভাড়া দেন। যদি তিনি সেটা না-করতেন, তবে আজ তাকে পথে বসতে হতো। এখন তিনি শুধু তার জমির ভাড়াই পাচ্ছেন না, বরং গ্রিনহাউস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ করে প্রতিদিন গড়ে ১০০ ইউয়ান আয়ও করছেন!

বস্তুত, গোটা চীনজুড়ে দারিদ্র্যবিমোচনে এই গ্রিনহাউসগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। চীনের গ্রামাঞ্চলের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এসব গ্রিনহাউস। আমি যতবার বেইজিংয়ের বাইরে দ্রুতগতির ট্রেনে গিয়েছি, রাস্তার দু’পাশে দেখেছি অসংখ্য গ্রিনহাউস। এই গ্রিনহাউসগুলোর অধিকাংশই গড়ে উঠেছে বিনিয়োগকারীদের অর্থে। তারা কৃষকদের জমি ভাড়া নিয়ে এসব গ্রিনহাউসে বিভিন্ন ফলমূল, শাক-সবজি উৎপন্ন করেন। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকরা সেই গ্রিনহাউসে কাজ করে অতিরিক্ত দু’টি পয়সা আয় করেন।

এ অর্থ তাদের জীবনমান উন্নয়নে রাখছে ভূমিকা। জমি ভাড়া দিতে কিন্তু কৃষক বাধ্য নয়! যে কৃষক নিজের জমি চাষ করতে চান, অন্যকে ভাড়া দিতে চান না, তার জন্য আছে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা। সাধারণভাবে একটি প্রমাণ সাইজের গ্রিনহাউস গড়ে তুলতে প্রায় ২০ হাজার ইউয়ান খরচ হয়। সরকার এই অর্থ সহজ শর্তে ঋণ দেয়। শুধু ঋণ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে না সরকার, সংশ্লিষ্ট কৃষককে গ্রিনহাউসে ফলমূল, শাক-সবজি চাষ করার কলা-কৌশল শেখাতে পেশাদার টেকিনিশিয়ানও পাঠায়। পাশাপাশি, মানসম্পন্ন বীজও সরবরাহ করে থাকে স্থানীয় সরকার। প্রতিটি প্রমাণ সাইজের গ্রিনহাউস থেকে একটি কৃষক-পরিবার আয় করতে পারে বছরে গড়ে ২০ হাজার ইউয়ান (প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি টাকা)। তাই চীনে কোনো পরিবারের একটি গ্রিনহাউস আছে মানে সেই পরিবারটি দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছে।

১৯৭৮ সালে সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ কার্যক্রম শুরুর পর থেকে বিগত চার দশকে চীনে প্রায় ৮০ কোটি হতদরিদ্র দারিদ্র্যমুক্ত হয়েছেন। চীনের লক্ষ্য চলতি বছরের মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে দারিদ্র্যমুক্ত হওয়া। লক্ষ্য পূরণ হলে ১৪০ কোটি মানুষের চীনে কোনো হতদরিদ্র থাকবে না। দারিদ্র্যবিমোচনে ইতোমধ্যেই যে সাফল্য চীন অর্জন করেছে, তা বিস্ময়কর। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারিদ্র্যবিমোচনের প্রসঙ্গ আসলে অকাতরে উচ্চারিত হয় চীনের সাফল্যের কথা।

চলতি বছর শেষ হতে এখনও বেশ কয়েকটি দিন বাকি আছে। চীনের সরকার এ সময়ের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণ দারিদ্র্যমুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। বছরের শুরুতে যদি কোভিড-১৯ আঘাত না-হানতো, তবে হয়তো অনেক আগেই এই লক্ষ্য পূরণ হয়ে যেতো। কিন্তু মহামারি সহজ কাজটিকে কঠিন করে দিয়েছে। এই কঠিন কাজটি করে যাচ্ছে চীনের সরকার, চীনের মানুষ। আশা করি, চলতি বছর শেষ হবার আগেই সম্পূর্ণভাবে দারিদ্র্যমুক্ত চীন দেখতে পাবে বিশ্ব।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)।
[email protected]

এইচআর/পিআর

শহরাঞ্চলের দরিদ্র মানুষের জন্য যখন শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটানো হচ্ছিল, তখন হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাদারকে পাঠানো হচ্ছিল গ্রামাঞ্চলে। তাঁরা গ্রামের দরিদ্র মানুষের আয় বাড়াতে সচেষ্ট হন। আর এ কাজে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি ছিল সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর সদস্যদের অন্তত একজনের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]