দাবায়ে রাখা যায় না

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১০:১১ এএম, ১২ ডিসেম্বর ২০২০

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর হতে চলল। পঞ্চাশ বছর দীর্ঘ সময়। অর্ধ শতাব্দী বললে আরেকটু বড় শোনায়। ৭ মার্চ, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছিলেন ‘সাত কোটি মানুষকে আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’। আজ ১৭ কোটি মানুষকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রমাণ করলেন, তাঁকে দাবিয়ে রাখা যায় না।

গত বৃহস্পতিবার পদ্মাসেতুর ৪১তম স্প্যানের জোড়া লাগানোর মাধ্যমে পদ্মার দুই পাড় যুক্ত হলো। সবশেষ স্প্যান বসানোর কাজ দেখতে অনেক মানুষ নৌকা, ট্রলার, স্পিডবোট ভাড়া করে কাছাকাছি ভিড় করেছিল। যারা যায়নি বা যেতে পারেনি, তারা টেলিভিশনে বা সামাজিক মাধ্যমে লাইভ দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছে। সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর মাধ্যমে আলোচিত পদ্মা সেতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বড় কাজের সমাপ্তি হলো। এরপর সড়ক ও রেলের স্ল্যাব বসানো সম্পূর্ণ হলে সেতু দিয়ে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৯ জেলার সঙ্গে সারা দেশের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে।

এই সেতু কেন এতো আলোচিত সেটা জানা দরকার। ক্যানাডার কোম্পানি এসএনসি- লাভালিনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ পাওয়ার চেষ্টার অভিযোগ করা হয়েছিল। আর এই দুর্নীতির অভিযোগ তুলেই বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে তাদের ঋণ বন্ধ করে দেয়। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই যে সেই অভিযোগ আনা হয়েছিল তা প্রমাণিত হয়েছে। ক্যানাডার আদালত সেই দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলা খারিজ হয়ে যায়। দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন আর তখনকার সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের পাশাপাশি তাঁকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তখন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, প্রকল্প বন্ধ হবে না, বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু করবে।

বঙ্গবন্ধুর ‘দাবায়ে রাখতে পারবা না’ থেকে শেখ হাসিনাকে দাবিয়ে রাখতে না পারার সময়টা কেমন তা নিয়ে প্রচুর কথা হবে। কিন্তু কথা আসলে একটাই। শেখ হসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রকৃত উত্তরাধিকার এবং কাজের উত্তরাধিকার। ছোট কাজ নয়, বড় কাজ। বঙ্গবন্ধু বড় রাজনীতি করতেন, তার ছিল বৃহতের সাধনা। তিনি স্বাধীন দেশের স্বপ্নকে মানুষের মনে বড় ও বাস্তব করে তুলেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই বৃহৎ ভাবনাই আজ শেখ হাসিনার পদ্মাসেতু। এই প্রকল্পের বিরোধী শক্তি প্রবল ছিল। তারা দেশের এবং দেশের বাইরের। কিন্তু সেই বিরোধিতা অতিক্রম করতে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠতার অভাব হয় নি। এখানেই সেই দাবায়ে রাখতে না পারার বড় প্রাসঙ্গিকতা।

পদ্মাসেতু তাই এই সময়ের বড় রাজনীতির প্রতীক। শাসনক্ষমতায় যিনি থাকেন, যদি মানুষের জন্য কিছু করতে চান, তখন রাজনীতি রূঢ় বাস্তব তাঁকে ঘিরে ফেলে চারদিক থেকে। এই সেতু যেন না হয় সে জন্য ষড়যন্ত্র হয়েছে, দুর্নীতির ভুয়া অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে সরে যেতে ইন্ধন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সব উড়িয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের সেতু এখন বাস্তবে দেখা দিল।

শেখ হাসিনা যেদিন বলেছিলেন নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মাসেতু হবে তখন অনেকেই সন্দিহান হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন এটা কোনদিনই হবে না। যারা এমনটা ভেবে সুখ পেয়েছিলেন তারা ভাবতে পারেন নি শেখ হাসিনাই আসলে ‘আসল রাজনীতি’ করেন। সে রাজনীতির চর্চায় কষ্ট বেশি, ঝুঁকি অনেক বেশি।

পদ্মাসেতুর বিরোধিতা যারা করেছেন তাদের এজেন্ডা পুরোনো। এদের বড় অংশটাই অরাজনৈতিক, কিন্তু তারা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা চেয়েছিলেন রাজনৈতিক দলের বাইরে একটা বিকল্প ব্যবস্থা। ১/১১ নামের সেই চেহারা মানুষ গ্রহণ করেনি। কিন্তু এর স্থপতিরা দমেও যায় নি। অরাজনৈতিক প্রেক্ষিত থেকে যেসব মানুষ রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন তারা ঠিক কোন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন সেটা আমরা জানি। কিন্তু তারা বুঝতে পারেন নি যে রাজনীতির মাধ্যমেই সরকার গঠিত হয় এবং রাজনীতিকরা দিন শেষে মানুষের স্বপ্ন পূরণ করেন।

রাজনীতি একটা আলাদা শিক্ষা দাবি করে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, যথার্থ রাজনৈতিক শিক্ষা। আমাদের নাগরিক সমাজের লোকজন সেই শিক্ষার মর্যাদা দেন না। রাজনীতির লোকজন ভুল-ত্রুটি করেন অজস্র, কিন্তু সেই ভুল-ত্রুটির মধ্য দিয়ে গিয়েই তাঁরা শিক্ষিত হতে থাকেন। শেখ হাসিনাও এদের দেখে দেখে শিখেছেন অনেক। অরাজনৈতিক নাগরিক সমাজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রেশার গ্রুপ রূপে কাজ করেন, কিন্তু তারা ভুলে যান যে, রাজনীতিটা রাজনীতিকদেরই কাজ।

কিন্তু সেটাও কতটা সবাই মনে রাখে সে এক প্রশ্ন। বড় দল হিসেবে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বারবার এই পদ্মাসেতু নিয় কটূক্তি করেছেন। কখনও বলেছেন এই সেতু হবেনা, কখনও বলেছেন জোড়াতালি দিয়ে সেতু করছেন শেখ হাসিনা আবার কখনও বলেছেন এই সেতুতে মানুষ উঠবে না। উন্নয়নের প্রশ্নে রাজনৈতিক রঙ দেখার অর্থ হলো ক্ষুদ্র রাজনীতি করা। সেই রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পদ্মাসেতু আজ বাস্তব।

তথাকথিত ‘ক্ষুদ্রই সুন্দর’ এই তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে শেখ হাসিনা তাঁর টানা তৃতীয়বারের শাসন ক্ষমতায় লড়াই করছেন অর্থনীতিকে বৃহতের সাধনায় নিয়ে আসতে। তাঁর ভাবনা বড় রাজনীতি এবং সেই পথ ধরে বড় বিনিয়োগ, বড় অবকাঠামো, বড় সম্ভাবনা।

এইচআর/এমএস

‘শেখ হাসিনা যেদিন বলেছিলেন নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মাসেতু হবে তখন অনেকেই সন্দিহান হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন এটা কোনদিনই হবে না। যারা এমনটা ভেবে সুখ পেয়েছিলেন তারা ভাবতে পারেন নি শেখ হাসিনাই আসলে ‘আসল রাজনীতি’ করেন। সে রাজনীতির চর্চায় কষ্ট বেশি, ঝুঁকি অনেক বেশি।’

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]