মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সুপারশপে রাখার নয়

তুষার আবদুল্লাহ তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১০:২৬ এএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০২০

বুদ্ধিজীবী দিবস ছিল সোমবার। কাল বিজয় দিবস। মাঝের দিনটিতে লিখতে বসেছি। বুদ্ধিজীবী দিবসে কিছু লিখিনি। অবয়বপত্রকেও জানাইনি আমার মনে কী চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সারাদিন পাঁয়চারি করেছি স্মৃতির সড়কে। সড়কের একপ্রান্ত ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর সামনে চলে এলো। ১৪ ও ১৬ ডিসেম্বরকে সামনে রেখে সাজানো হয়েছিল ভোরের কাগজের ফিচার পাতা ‘মেলা’কে।

সংখ্যাটি ছিল মূলত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, মুক্তির গান, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যদের বক্তব্যের অনুলিখন ও সাক্ষাৎকারভিত্তিক। সংখ্যাটিতে শহীদদের জায়া, জননী ও সন্তানদের অংশগ্রহণও ছিল। প্রায় সবার মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। মূলত সংখ্যাটি আমার এবং মেহেদী মাসুদের হাতেই তৈরি ছিল।

বিএনপি-জামায়াত সরকার ক্ষমতায় থাকায়, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়ে অনেক আক্ষেপের কথা তখন তাদের মুখে শুনেছি। শোনা ইতিহাস বা মনগড়া ইতিহাসের আড়ালের অনেক লুকায়িত সত্য শুনেছি তাদের মুখে। যুদ্ধাপরাধীদের বীভৎসতার কথা যতটা জানা ছিল, জেনেছি তার চেয়েও ভয়ঙ্কর সত্য। একইভাবে সেই সময়ই কিছু কিছু নাম শুনেছি, যারা একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী রূপ পাল্টে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মুখোশ নিয়ে নিয়েছে। সংখ্যায় তখন তারা নগন্য হলেও দিন যত গড়িয়েছে, জ্যামিতিক হারে বেড়েছে তাদের প্রজনন।

দেখতে দেখতে এমন অনেকের রূপ পাল্টে যেতে দেখেছি ১৯৯৬-২০০১ সময়ে। ২০০১ পরবর্তী সময়ে আবার নিজেদের হালনাগাদ করে নেয়া, রঙ মিলিয়ে নেয়া চলতি সময়ের সঙ্গে। ৭ মার্চ, ২৫, ২৬ মার্চ, ১৫ আগস্ট, ১৪, ১৬ ডিসেম্বর নিয়ে তাদের ফতোয়ার বদল হয়েছে। এরা অনেকটাই চেনা মুখছিল। সকলে তৈরিই থাকতো তাদের বদলে যাওয়া রূপ দেখতে। খুব বড় একটা ধাক্কা খেতে হতো না বিভিন্ন পেশাজীবী ও সংস্কৃতিজীবীদের ওই ভোল পাল্টানো দেখে। ওই মুখগুলোও বিস্মৃত হয়নি, যারা স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতাপ-প্রতিপত্তির মধ্যেও বলিষ্ঠভাবে একাত্তরের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠধারী ছিলেন।

২০০৮ থেকে এ অবধি আসতে আসতে কেবল চমকে উঠেছি। ১৪ ডিসেম্বর দিনমান শুধু হিসাব কষেছি। সময় সংলাপ নামের একটি অনুষ্ঠান করেছি একনাগারে ১৩৬০ পর্ব। দুই-এক পর্ব কম-বেশি হতে পারে। এর বাইরে সম্পাদকীয়, বিশেষ সম্পাদকীয়সহ আরও শ‘খানেক সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এর মধ্যে বিজয়ের মাস, স্বাধীনতা ও শোকের মাসজুড়ে কথা হয়েছে নানা পেশাজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সঙ্গে।

এদের কেউ স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা করেন না, ছিলেন না এমন মানুষও। তাদের কাছে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই। কারণ তারা ৭ মার্চের প্রণোদনায় যুদ্ধে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। একাত্তরপরবর্তী সময়ে দেশ গড়ার কাজে ব্রত হয়েছেন। এদের কেউ কেউ একাধিক দিন আমার সঙ্গে বসেছেন।

ক্যামেরার সামনে, পেছনে বলেছেন তাদের অস্বস্তির কথা, নিজেদের গুটিয়ে যাওয়ার কথা। তারা সইতে পারছিলেন না, পারছেন না, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগে জমতে থাকা শ্যাওলাদের। যাদের বঙ্গবন্ধুপ্রীতি, মুক্তিযুদ্ধপ্রীতি বাণিজ্যিক। জাল সনদধারীদের মতোই ক্ষমতার পায়েস খাওয়ার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তারা স্বার্থের মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করে যাচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধে শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন যাদের পূর্বপুরুষ, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ঢোল বাজাচ্ছেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির দিকে আঙুল তুলে বলছেন, জামায়াত-শিবির। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিতরা সহমতের জিকির তুলতে জানে না। অবয়বপত্রে অহেতুক সেলফি বা স্লোগানের ঝড় তোলে না। তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বাস্তবায়ন করেন কাজের মাধ্যমে।

বিজয়ের এই ৪৯ বছরে এসে নিজেকে, নিজেদের সেই মওসুমি বা মুখোশধারীদের সঙ্গে মেলাতে রাজি নই আমরা। কারণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সুপারশপে নয়, রেখেছি আপন মনোজগতে। খোলস খসে পড়বে মুখোশধারীদের। যুদ্ধপরাধীদের মতো খসে পড়বে তাদের বিষদাঁত। আমরা পূর্বদিগন্তে ওঠা সূর্যতে নিত্য আলোকিত হবোই। শুভ বিজয়।

লেখক : বার্তাপ্রধান, সময় টিভি।

এইচআর/বিএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]