বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১০:২২ এএম, ১৯ ডিসেম্বর ২০২০

দুটি ছবি- বিজয় দিবসে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চলেছেন সবুজের মাঝে চারকোনা লাল রঙ পতাকা নিয়ে, আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে ব্যানার বহন করছেন তাতে ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ছবি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা, ট্রল ইত্যাদি।

বেশ কিছুদিন ধরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম আবদুস সোবহান সাহেবের কাণ্ডকারখানার নানা কথা যে বের হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা শিথিল করে নিজের কন্যা ও জামাতাসহ আরও অনেককে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাকে সেগুলো বাতিল করতে বলেছে।

এই উপাচার্য অবৈধভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দোতলা বাড়ি দখলে রেখে সরকারের পাঁচ লাখ ৬১ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি করেছেন। ১০ ও ১৩ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে তার কাছে ১২টি চিঠি পাঠানো হয়। আমাদের স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করছে গোপালগঞ্জের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কথা যাকে শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছিল রাতের আঁধারে।

সবগুলোই জনগণের অর্থে পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইদানীং নানা কারণে আলোচিত। সরকারি টাকায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নামের বেচারি ক্ষেত্রটিকে তারা কী যে বানিয়ে ফেলেছেন সেটা তারাই বলতে পারবেন। এসব শিক্ষক যার যার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বিষয়ে কোনো গভীর ভাবনা না করেও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার প্রসন্নতায় কত কী করছেন! উপাচার্য নামের সম্মানিত পদটিকে তারা হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। বেগম রোকেয়ার উপাচার্য বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পাসে যান না। এটা কী করে সম্ভব সেটা নিয়েই হয়তো একটা পিএইচডি কেউ করতে পারেন।

এই সরকার অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় করেছে। শিক্ষার প্রসারে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু ‌নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ই হতে পারল না, পুরোনোগুলোও যেন পথ হারাচ্ছে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, তাদের লাউঞ্জ, তাদের অফিস কক্ষ, বাসাবাড়ির চেহারা অনেক বদলেছে। বাইরের দিকে সংস্কার-চাকচিক্যের অভাব নেই। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্তরঙ্গের দৈন্য যে ক্রমবর্ধমান সে নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কোনো সন্দেহ নেই।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নমুখী মান নিয়ে কিছুদিন ধরেই দুর্ভাবনা ও সমালোচনা চলছে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বেড়েছে বহুগুণ। কিন্তু শিক্ষক নামের ভোটার নিয়োগে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়িয়েছে তার কিছুটা প্রমাণ মেলে বিজয় দিবসে দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাণ্ডে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠনপাঠন উপেক্ষিত। তার চেয়ে বেশি আলোচিত শিক্ষক রাজনীতি আর উপাচার্যদের নানা কাণ্ড।

শিক্ষকরা কতটুকু মানবেন জানি না। তবে বলতেই হবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মর্যাদা হারিয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে খোদ পড়াশোনাটাই আজ উপেক্ষিত। শিক্ষার পরিবেশের ভয়ানক দুর্দশা চলছে। আছে কেবল সরকারি দলের ছাত্র-সংগঠনের নানা কর্মকাণ্ড আর সরকারপন্থী শিক্ষকদের নানা গ্রুপিং।

রাজনীতিই বড় সমস্যা। রাজনীতির কারণে শিক্ষক নিয়োগে মান বজায় রাখা যাচ্ছে না। আমাদের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের কোনো র‍্যাংকিংয়ে আসে না। সরকারের তথা জনগণের টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে, শিক্ষক-অশিক্ষক সব কর্মী বেতন পান। অথচ স্বায়ত্তশাসন নামের এক বিধানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বড় বড় অন্যায় আর অপরাধ দেখেও ব্যবস্থা নিতে পারে না।

এখন লেকচারার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যন্ত সকলেই নিজেদের সরকারি চাকুরে ভাবেন। তাই তারা শিক্ষার মানের চেয়ে বেশি চান তাদের পদের মর্যাদা। আবার তারাই সুবিধা নেন স্বায়ত্তশাসনের। আর ব্যস্ত থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে-বাইরে নানা পদ-পদবির লড়াই নিয়ে। এতই যখন সরকারি চাকুরের মতো আচরণ, তাহলে বাকি সব সরকারি কর্মীর মতো অধ্যাপকদেরও সরকার বদলি করতে পারে কিনা ভাবা দরকার।

উন্নতবিশ্বের উন্নতমানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর খ্যাতির মূলে রয়েছে সেখানকার শিক্ষক-অধ্যাপক। তাদের মূল কাজ গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানরা ভালো শিক্ষক-গবেষকদের টেনে আনেন এবং ধরে রাখেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পেছনে অর্থ বরাদ্দ কম। সেটা নিয়ে বড় কোনো চিৎকার শোনা যায় না শিক্ষকদের কাছে থেকে।

উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার থেকে অধ্যাপক সবাইকেই গবেষণা ও ক্লাসে পড়ানো ছাড়াও আর একটা কাজ করতে হয়। অ্যা়ডমিনিস্ট্রেশন বা প্রশাসন পরিচালনা। স্বল্পমাত্রায় সবাই মিলে কাজটা করেন বলেই বিশ্ববিদ্যালয় স্বশাসিত ও সুশাসিত হয়। আমাদের উপাচার্যরা আর তাদের দোসররা যত স্বশাসন চান, ততটা সুশাসন চান না।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পঠনপাঠনের মান ভালো না হলে জাতির ক্ষতি হয়। ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ায় পিছিয়ে যায় যা প্রকারান্তরে দেশকে পিছিয়ে দেয়। একটা কথা মনে রাখা দরকার শিক্ষার সমস্ত স্তরেই শিক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরাই শিক্ষার্থীদের মনের গতি বোঝে তাদের পথের সন্ধান দেন। সেই শিক্ষকদের মান যদি এমন হয় শিক্ষার্থীরা যাবে কোথায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি থাকবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি শিক্ষার পরিসরে দলীয় আনুগত্যের অনুশীলনে বেশি ব্যস্ত থাকেন তাহলে শিক্ষার মান কমে, দুর্নীতি বাড়ে। আনুগত্য-উৎকর্ষকে বিনাশ করে, অথবা বিতাড়ন করে। আনুগত্য মধ্যমেধাকে লালন করে এবং তার দ্বারা লালিত হয়। মধ্যমেধা স্বভাবতভাবেই চতুর এবং সুযোগসন্ধানী। আমরা জানি এখনও অনেক ভালো শিক্ষক আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই মানুষগুলোর ভূমিকাকে প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা হোক কিছুটা হলেও।

লেখক : সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]