জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিল নিয়ে বিতর্কের শেষ কোথায়?

বিভুরঞ্জন সরকার
বিভুরঞ্জন সরকার বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত: ১০:২০ এএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

গত ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)-এর ৭২তম সভায় জিয়াউর রহমানসহ পাঁচজনের রাষ্ট্রীয় খেতাব বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বঙ্গবন্ধুর চার আত্মস্বীকৃত খুনির খেতাব বাতিলের বিষয়টি সভায় উত্থাপিত হলে জামুকার সদস্য এবং এমপি ও সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খান জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সপক্ষে তার যুক্তি তুলে ধরেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীরউত্তম’ খেতাব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জিয়া একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। এখন স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে তার সেই খেতাব বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে জিয়ার বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ উত্থাপন করে। মোটাদাগে অভিযোগগুলো হলো – সংবিধান লঙ্ঘন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের সহায়তা এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অবশ্য আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বরাবরই করা হয়।

জামুকার পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত চার খুনি শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী এবং মোসলেহ উদ্দিনের রাষ্ট্রীয় খেতাব বাতিলেরও যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কোনো কথা না বললেও জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলে প্রস্তাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা এবং বিতর্ক শুরু হয়েছে। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপি পক্ষ থেকে এ নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হচ্ছে, যেটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। কারণ বিএনপির রাজনীতির মূল পুঁজি জিয়া। কাজেই জিয়ার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখা বিএনপির একটি পবিত্র কর্তব্য। প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি সক্ষম হবে জিয়ার খেতাব সরকার বাতিল করতে চাইলে তা ঠেকানো? বিএনপির কোনো কোনো নেতা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলছেন, জিয়ার খেতাবে হাত দিলে নাকি জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। বিএনপি কিছু প্রতিবাদ-বিক্ষোভও করছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপের কথাও ভাবছে দলটি।

সরকার প্রকৃতই জিয়ার খেতাব বাতিল চায় কিনা, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে কি চান তা এখনও পরিষ্কার বা স্পষ্ট নয়। জিয়ার খেতাব বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপনকারী শাহজাহান খান বলেছেন, এ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্দেশনা পাননি। তিনি নিজের গরজেই এই প্রস্তাব করেছেন। কারণ তিনি মনে করেন, ‘যারা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মদদ দিয়েছে, তারা স্বাভাবিকভাবেই অপরাধী। এই অপরাধীরা কোনো সম্মানজনক পদ, পুরস্কার বা খেতাব পেতে পারে না'। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, খেতাব বাতিলের সুপারিশের ব্যাপারে দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্ট থাকা ছাড়াও সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দখল, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনসহ মুক্তিযুদ্ধের সব মহান অর্জনগুলো জিয়ার আমলেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আওয়ামী লীগ মনে করে। জিয়া মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পরবর্তী সময়ে যেসব অন্যায় করেছেন তার জন্য মার্জনা পেতে পারে কিনা সে প্রশ্নও অনেকে তুলছেন। আবার এমন কথাও বলা হচ্ছে যে, বঙ্গবন্ধুর দেওয়া খেতাব এখন বাতিল করা হলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিই কি অসম্মান দেখানো হয় না?

জামুকার প্রস্তাব সরকার গ্রহণ করবে কিনা আমরা জানি না। তবে জিয়ার খেতাব বাতিল করা হলে সরকার বড় ধরনের চাপে পড়বে বলে যারা ভাবছেন, তাদের সঙ্গে সহজে একমত হওয়া যাবে না। জিয়ার প্রতি অনেকের হয়তো আবেগ আছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও তো অনেকেই আছেন। জিয়ার খেতাব থাকা না-থাকার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো স্বার্থ নেই। এর সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত আছে। তাই বিএনপি তার রাজনৈতিক স্বার্থে খেতাব নিয়ে হৈচৈ করলে তাতে সাধারণ মানুষ কতটুকু সাড়া দেবে তা বলা মুস্কিল। খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে বের করে আবেগ ও ভালোবাসার কারণে মানুষ প্রবল আন্দোলন গড়ে তুলবে বলে বিএনপি আশা করেছিল। কিন্তু বাড়ি ছাড়া হয়ে খালেদা জিয়া চোখের জল ফেললেও মানুষ কিন্তু রাস্তায় নামেনি। মানুষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় না হলে মানুষ কোনো আন্দোলনে নামে বলে কি কেনো উদাহরণ আমাদের সামনে আছে? রাজনীতিতে অনেক সময় ঝুঁকি নিতে হয়। শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঝুঁকি নিতে অভ্যস্ত। তিনি এর আগে এরকম কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সফল হয়েছেন, সুফল পেয়েছেন। জিয়ার বীরউত্তম খেতাব থাকা না-থাকা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে কোনো বড় বিষয় বলে মনে হয় না।

তবে জিয়াউর রহমানের বীরউত্তম খেতাব বাতিল হলে বিএনপির ক্ষতি হবে। কিন্তু তাতে আওয়ামী লীগের কি বিশেষ কোনো লাভ হবে? বিএনপির ক্ষতি হলে আওয়ামী লীগ তো তাতে পরোক্ষভাবে হলেও লাভবান হবেই। আসলে দুই পক্ষই হয়তো এখন এই লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে। কেউ কেউ মনে করছেন জিয়ার খেতাব নিয়ে টানাটানির চেয়েও সরকারের সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যু আছে। টানা ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কিছু সংকট তৈরি হয়েছে , যেগুলোর সমাধান না করলে বারবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। নিজের ঘর মেরামত না করে অন্যের নড়বড়ে ঘরে ঠেলাধাক্কা দিয়ে অহেতুক প্রশ্নের মুখে পড়া কেন?

আওয়ামী দরদি কারো কারো কাছেও মনে হচ্ছে, জিয়ার খেতাব বাতিল করে সরকার অহেতুক একটি চাপ নিতে যাচ্ছে। এটা সরকারের জন্য স্বস্তির কারণ হবে না। আবার পাল্টা এমন প্রশ্নও আছে, জিয়ার খেতাব বহাল থাকলে কি সরকারকে বিএনপি স্বস্তিতে থাকতে দেবে? দেশের রাজনীতি এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কোনো বিষয়েই জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ বা সম্ভাবনা একেবাবেই ক্ষীণ হয়ে এসেছে। বিএনপি বঙ্গবন্ধুর অবদানের প্রতি সম্মান দেখায়? বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে কি বঙ্গবন্ধুর প্রাপ্য মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছিল? নাকি ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলতে সচেষ্ট ছিল?

জিয়া স্বেচ্ছায় না বাধ্য হয়ে, নাকি বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন কিংবা তিনি আসলে যুদ্ধ করেছেন কিনা সেসব বিতর্কে না গিয়ে বরং এটা বলা যায় যে, জিয়া ছিলেন সুযোগের সদ্ব্যবহারে অনেক পারদর্শী। এখন তার বিরুদ্ধ-পক্ষ যদি সুযোগের সদ্ব্যবহার করেই জিয়াকে ঘায়েল করতে পারে তাহলে সেটা খুব দোষের হবে কেন? বিএনপি সরকারকে চাপে রাখার যেকোনো কৌশল যদি নিতে পারে, তাহলে আওয়ামী লীগ বা আওয়ামী লীগ সরকার কেন বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল নিতে পারবে না? কেউ কেউ বলছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যায় জিয়া জড়িত থাকলে হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি কেন? বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা যখন হয়, তখন তো জিয়া জীবিত ছিলেন না। মৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তো মামলা করা যায় না।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের যে সরকার সেই সরকারই জিয়উর রহমানকে বীর উত্তম খেতাব দিয়েছিল। এখন সরকারের সেই খেতাব বাতিলের উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কলঙ্ক লেপন করা হলো’। জিয়াউর রহমান কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক? তার সাফল্য যেমন সব মুক্তিযোদ্ধার সাফল্য নয়, তেমনি তার একক গ্লানিও সব মুক্তিযোদ্ধার গ্লানি হতে পারে না।

গোলাম আজমকে ভাষাসংগ্রামীর মর্যাদা দেওয়া হয় না তার পরবর্তী রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য। জিয়া মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশকে মিনি পাকিস্তান বানিয়ে কি নির্দোষ থাকতে পারেন? জিয়ার ক্ষমতার রাজনীতি কি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের পরিচয়বাহী? আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক কীভাবে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে– আগে সেই প্রশ্নের ফয়সালা হোক’। জিয়ার খেতাব বাতিলের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আওয়ামী লীগের ক্ষতি হবে বলে যারা মনে করেন, তাদের উদ্দেশে মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, ‘লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ কোনো সত্য থেকে সরে যাবে, আওয়ামী লীগের এরকম কোনো ইতিহাস নেই'।

বঙ্গবন্ধু জিয়াকে খেতাব দিয়েছিলেন, কাজেই তা আর বাতিল করা যাবে না – এটা যদি সঠিক যুক্তি হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধু যে বাকশাল করেছিলেন, সেটা মেনে নেওয়ায় আপত্তি কেন? জিয়াকে খেতাব দেওয়া নির্ভুল ছিল, আর বাকশাল গঠন ভুল ছিল? না, বাকশালের পক্ষে ওকালতি নয়, ভুল ও ঠিক বিচারের আমাদের মাপকাঠি প্রসঙ্গেই এটা বলা হলো।

জিয়ার খেতাব বাতিলের প্রস্তাবটিকে যারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন বা বলছেন, তাদের কি বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বিস্তারের পটভূমি সম্পর্কে জানা আছে? বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে প্রতিহিংসাপরায়ণতার শুরু তা আওয়ামী লীগের একক চেষ্টায় বন্ধ হবে না। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল । এটা কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয়। আওয়ামী লীগকে তার প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়েই জায়গা করে নিতে হয়। আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শুদ্ধতা যারা প্রত্যাশা করেন, তাদের প্রত্যাশা ততদিন পূরণ হবে না, যতদিন তার প্রতিপক্ষের রাজনীতি শুদ্ধ না হয়। বিএনপি আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্যাদা স্বীকার করুক, তারপর জিয়ার স্বীকৃতির বিষয়টি নিয়ে খুব বিতর্ক থাকবে বলে মনে হয় না।

২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি শ্রোতা জরিপ চালিয়েছিল। তখম বাংলাদেশে শাসন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে – এই ছিল জরিপের প্রশ্ন। ৩০ দিনের ওই জরিপে এক নম্বরে অবস্থান ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আর জিয়াউর রহমানের অবস্থান ছিল ১৯ নম্বরে। এক নম্বরের প্রতি ক্রমাগত উপেক্ষা দেখিয়ে ১৯ নম্বর নিয়ে মাতামাতি করতে চাইলে মানুষ মাতবে কি?

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

এইচআর/জেআইএম

২০০৪ সালে বিবিসি বাংলা একটি শ্রোতা জরিপ চালিয়েছিল। তখম বাংলাদেশে শাসন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি কে – এই ছিল জরিপের প্রশ্ন। ৩০ দিনের ওই জরিপে এক নম্বরে অবস্থান ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আর জিয়াউর রহমানের অবস্থান ছিল ১৯ নম্বরে। এক নম্বরের প্রতি ক্রমাগত উপেক্ষা দেখিয়ে ১৯ নম্বর নিয়ে মাতামাতি করতে চাইলে মানুষ মাতবে কি?

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]