অচলায়তন ভেঙে বাড়াতে হবে সহযোগিতার হাত

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৫৩ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২১

জিনান বিনতে জামান
৮ মার্চ- আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ১৯৭৫ সালে দিনটি জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেলেও এর প্রায় শতবর্ষাধিক কাল আগে ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্কের রাস্তায় কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রতিবাদে নারীদের সমাবেশে পুলিশি নির্যাতনের কারণে এ দিনটির জন্ম হয়, এ কথা মোটামুটি সকলেই জানেন। তবে শুধু কর্ম পরিবেশেই নয়, সারা পৃথিবীর বৈরী পরিবেশেই নারীর সম অধিকারের অঙ্গীকার নিয়ে দিনটি বর্তমানে পালন করা হচ্ছে। তাই নারী দিবসের ধারণাটির সাথে প্রসঙ্গিক কিছু ধারণা আমাদের মনে উঁকি দেয়, নারীর প্রতি নৃশংসতা, নারী সমানাধিকার, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি।

তবুও খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন জাগে- বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার দিবস থাকার পরেও কেন এই নারী দিবস? অনেকে আবার বিষয়টি নিয়ে নানা রসিকতাও করে থাকে। বিস্তারিত আলোচনায় দেখা যায় এর সবই আমাদের পিতৃতান্ত্রিক তথা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ফলাফল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা আমাদের চিন্তা জগতে সুদীর্ঘকাল থেকে প্রভাব বিস্তার করে আছে। যে কারণে প্রচলিতভাবে মনে করা হয় যে, পুরুষ হলো প্রকৃতির প্রধান সৃষ্টি আর নারী হচ্ছে সহায়ক সৃষ্টি। কিন্তু অযৌক্তিক এ মতের প্রবক্তা হিসেবে কোন দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং প্রকৃতির উদারতার দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে নারী বলে প্রকৃতি কোন অংশে নারীর প্রতি বৈষম্য করেনি; নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের প্রতি প্রকৃতি সমান আচরণ করে। তাই সহজেই বুঝা যায় নারীর প্রতি এ হীনমনোভাব মনুষ্যসৃষ্ট।

এছাড়া পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ভাবনায় বলা হয়, নারী দৈহিকভাবে দুর্বল বলে সে পুরুষের সমান মর্যাদার দাবি করতে পারেনা। একথাও যে অসার বাক্যমাত্র তাও বোঝা যায়, যখন আমরা দেখি নারী প্রায় দশ মাস নিজের দেহে একটি প্রাণকে ধারণ করে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাকে পৃথিবীর আলো দেখায়। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে সন্তান প্রসবকালে একজন নারীকে যে শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় তাকে পৃথিবীর অন্য কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যায় না।

তবে, সজ্ঞানে একজন সুস্থ মানুষের দেহের কয়েকটি হাড় এক আঘাতে ভেঙে ফেলার অনুভূতির সাথে তা কিছুটা তুলনীয়। একবার ভাবুনতো দশ মাস নিজের দেহে একটি প্রাণকে তিলতিল করে বড় করে তোলা দুর্বল শরীরে এত বড় যন্ত্রণা সহ্য করে কয়েক মুহূর্ত পর আবারও স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসার ক্ষমত রাখে যে নারী তাকে দৈহিক ভাবে দুর্বল ভাববার আদৌ কোন অবকাশ আছে কি?

অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর সমানাধিকার দেওয়ার বিরুদ্ধে কূটযুক্তিতে বলা হয়, নারী প্রকৃতিগতভাবে স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন বা কম মেধাবী। প্রকৃত বিচারে এরও কোন ভিত্তি নেই। কেননা, প্রতœতাত্তিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, কৃষির জন্ম হয়েছে নারীর হাত ধরে। যে কৃষি প্রাকৃতিক নির্ভরতার বদলে মানুষের অন্ন সংস্থানের বিকল্প প্রযুক্তি, তার আবিস্কারক হিসেবে নারীর মেধার প্রতি প্রশ্ন উত্থাপন নিতান্তই বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে নারীদের পশ্চাৎপদতার যে কাহিনী তুলে ধরা হয় তার পেছনেও কিন্তু পুরুষতান্ত্রিকতাই দায়ী। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন আমাদের দেশের মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটুকু নেওয়াও কঠিন ছিল। বেগম রোকেয়াকে কতটা কষ্ট করতে হয়েছে কেবল মুসলিম মেয়েদের অক্ষর জ্ঞান নিশ্চিত করার জন্য-তা বোধকরি আমরা ভুলে যাইনি।

এমনকি পাশ্চাত্যের উন্নত জ্ঞানের পসরা সাজানো দেশগুলোতেও নারী শিক্ষা ছিল উপেক্ষিত। কিন্তু এর পরের দৃশ্যটিই কিন্তু আমাদের জন্য আশা জাগানিয়া, শত বাধার আকর ভেঙে কিছু নারী এগিয়ে এসেছেন শিক্ষার পথে, অর্জন করেছেন বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক ধারণা, যার ফলশ্রæতিতে আমরা পেয়েছি মাদাম কুরীর মতো নোবেল জয়ী বা লেডি আডা বায়রনের মতো কম্পিউটার গবেষক। তেমনি আমাদের উপমহাদেশে আমরা পেয়েছি শকুন্তলা দেবীর মতো ‘জীবন্ত গণনা যন্ত্র”, ফজিলাতুন নেসার মতো শিক্ষাবিদ বা জোহরা কাজীর মতো প্রথিতযশা চিকিৎসককে। তাই, সহজেই অনুমেয় পুরুষের সমান সহায়তা পেলে নারীরাও সমান তালে কীর্তির স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম।

এবার তবে আসি নারীর সমানাধিকারের প্রসঙ্গে। অনেকেই নারীকে সমানাধিকারের প্রশ্নে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে আক্ষেপ বা অভিযোগ করেন। যেমন- চাকরিতে নারী কোটা সংরক্ষণ বা গণ পরিবহনে নারীর জন্য পৃথক আসন বরাদ্দ রাখাকে সমানাধিকারের নামে অগ্রাধিকার বলে অভিহিত করেন। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতেও জানি, অনেক সময় গণ পরিবহনে নারীর সংরক্ষিত আসনে পুরুষরা দখল করে থাকেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে আসন না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নারীদের বসতে না দিয়ে সমান অধিকারের সমালোচনা করেন। আবার অনেক সময় শুধু সংরক্ষিত আসনই নারীদের জন্য বরাদ্দ বলে ঘোষণা দিয়ে অন্য আসনে তাদের বসার বিরোধিতা করেন। এসব ঘটনাই অজ্ঞতা প্রসূত। কারণ, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সমানাধিকার নিশ্চিতের পদ্ধতিটি এদের অজানা।

একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ধরা যাক তিনজন ভিন্ন উচ্চতার মানুষকে আমি এমনভাবে দেখতে চাইলাম যেন তাদের সমান দেখায়। তখন আমার করনীয় কি? তখন তাদের জন্য ভিন্ন উচ্চতার আসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন, যার উচ্চতা কম তাকে অপেক্ষাকৃত উঁচু আসন দিতে হবে আর যার উচ্চতা বেশি তাকে অপেক্ষাকৃত কম উঁচু আসন দিতে হবে। তাহলেই এদের সকলকে সমান করা সম্ভব হবে। নারীর সমানাধিকারের বিষয়টিও তেমনই। যেহেতু পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোতে নারীরা আগে থেকেই পিছিয়ে আর পুরুষেরা এগিয়ে আছে, তাই উভয়ের মাঝে সমতা আনয়নে পিছিয়ে থাকা নারী সমাজকে স্বাভাবিক সুবিধাগুলোর পাশাপাশি কিছু বাড়তি সুবিধা দিতে হবে, তাহলেই অগ্রসরমান পুরুষরা স্বাভাবিক সুবিধা পেলেও তাদের সমতা রক্ষা হবে।

নারীর সমানাধিকারের অনুসিদ্ধান্ত হিসেবেই আরও একটি বিষয় প্রাসঙ্গিক, তা হলো ‘নারীর স্বাধীনতা”। নারীর স্বাধীনতা বলতে মূলত চিন্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ আর ইচ্ছা প্রকাশের স্বাধীনতাকে বুঝানো হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হলো নারী স্বাধীনতার এ সংজ্ঞাও যেন আজকের অনেক তথাকথিত আধুনিক নারীদের কাছেও স্পষ্ট নয়। তারা স্বেচ্ছাচারিতাকেই যেন স্বাধীনতার সমার্থক বলে মনে করছে। স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই করা নয়। সামাজিক মানুষ হিসেবে সামাজিক কাঠামোতে থেকেই প্রচলিত কু-প্রথার বিরুদ্ধে নিজের মত আর ইচ্ছাকে প্রকাশ করার মাঝেই স্বাধীনতার বীজমন্ত্র নিহিত। একটু গভীর ভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিককালে নারীরা স্বাধীনতার নামে যে ভুল ধারণা তথা স্বেচ্ছাচারিতার পোষণ করেন তাও প্রকারান্তরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজেরই ফসল।

বাণিজ্যিকীকরণের এই অস্থির প্রতিযোগিতার যুগে যখন একজন নারীকে দৈহিক সৌন্দর্যের মাপ কাঠিতে ক্ষমতাবান আখ্যা দেওয়া হয়, কিংবা সৌন্দর্য বর্ধক প্রসাধনের বিজ্ঞাপনে যখন একজন নারীকে আত্মবিশ্বাসী করতে সেই প্রসাধন ব্যবহারের প্রতি আকর্ষন করা হয় তখন নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নের ধারা থেকে সরিয়ে এক ভ্রান্ত ধারণাই তার মাঝে গেঁথে দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীকে পন্য করে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিল করাই মূল লক্ষ্যে পরিনত হয়।

অনেক সময় আবার ধর্মকে নারীর স্বাধীনতার অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করার একটি চেষ্টা দেখা যায়। কিন্তু একটু সাদা চোখে দেখলে বুঝা যায়, মানুষের জন্যই ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। ধর্মের যূপকাষ্ঠে নারীর স্বাধীনতাকে বলি দেওয়ার কোন যুক্তিই তাই গ্রহণ যোগ্য নয়। প্রচলিত ধর্মগুলোর ইতিহাস ঘাটলেই দেখা যায়, আরবের তৎকালীন সমাজে যখন মেয়েদের ওপর অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল তখন ইসলাম মেয়েদের মর্যাদা নিশ্চিত করতে দিয়েছিল সম্পত্তির অধিকার, মানবিক সম্মান।

একইভাবে, সনাতন ধর্মের উপকথা অনুসারে সারামর্ত্যলোক যখন অসুর তথা অপশক্তির করাল গ্রাসে পতিত তখনই এর বিরুদ্ধে মাতৃ শক্তি রূপে দেবী দুর্গার আগমন যেন নারীর চিরায়ত সৎ শক্তিকেই প্রতিফলিত করে। যদি খৃষ্ট ধর্মের দিকে তাকাই তবে দেখি কুমারী মাতা মেরীকে পিতা বিহীন যীশুর জন্মদাত্রীর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এজন্য সহজেই অনুমেয়, ধর্মের নামে নারীকে নিপীড়ন কেবল ধর্মের পুরুষতান্ত্রিক অপব্যাখ্যার কুফল ছাড়া আর কিছু নয়।

মূলকথা নারীর স্বাধীনতা কোন পোশাকী বিষয় নয়। মনে, মননে, চিন্তার গভীরতায় নারী যখন নিজের শক্তি আর সত্তাকে উপলব্ধি করতে পারবে তখনই তার প্রকৃত মুক্তি ঘটবে। তবে একথাও অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অচলায়তন ভেঙে নারীর প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত করতে পুরুষের সহযোগিতার কোন বিকল্প নেই। যে দিন নারীর সাথে সাথে পুরুষের কণ্ঠেও নারীর মর্যাদার কথা উচ্চারিত হবে সে দিনই পূর্ণতা পাবে নারীর স্বাধীনতা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা কলেজ।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন আমাদের দেশের মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটুকু নেওয়াও কঠিন ছিল। বেগম রোকেয়াকে কতটা কষ্ট করতে হয়েছে কেবল মুসলিম মেয়েদের অক্ষর জ্ঞান নিশ্চিত করার জন্য-তা বোধকরি আমরা ভুলে যাইনি।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]