একটু অন্যভাবে কি ভাবতে পারি না?

শাহানা হুদা রঞ্জনা
শাহানা হুদা রঞ্জনা শাহানা হুদা রঞ্জনা
প্রকাশিত: ০১:৩০ পিএম, ১৭ জুলাই ২০২১

সিদ্দিক যে কাপড়ের দোকানে কাজ করেন, সেই দোকানের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে। মাঝে মধ্যে যেটুকু বিক্রি হয়, তাতে মালিক পারছেন না দুটি দোকানের ছয়জন কর্মচারীর বেতন দিতে। তাই ঈদের আগেই বলে দিয়েছেন এ ব্যবসা তিনি আর চালাতে পারছেন না। সিদ্দিক আমার পরিচিত। ফোন করে সরাসরি বলল, আপা আপনি এবং আপনার পরিচিত মানুষরা কোরবানির জন্য যে টাকা রাখছেন, তার থেকে অর্ধেক টাকা আমাদের দু-চারজনকে দেন। কয়েক দিন পরিবার নিয়ে খেয়ে বাঁচি। তারপর লকডাউন খুললে বাড়ি চলে যাবো। আমাদের কোরবানির মাংস দিয়েন না, টাকা দেন ভাত খাওয়ার।

এত মন খারাপ হলো সিদ্দিকের কথা শুনে। আমি জানি মানুষের পক্ষে হঠাৎ করে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন হবে। কোরবানির একটা হিসাব-নিকেশ থাকে, সওয়াব অর্জনের একটা ব্যাপার থাকে। কাজেই এর থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে অন্য মানুষকে দান করার পথটা সবাই গ্রহণ করতে পারবে না। সিদ্দিকই বলল, তাদের একজন সহকর্মী আব্বাস ইতোমধ্যে পথে নেমে সাহায্য চাইছেন। কারণ তার হাত একদম খালি। ছেলেকে খেতে দিতে পারছেন না।

বিভিন্ন জায়গায় বলেও খুব একটা আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেল না। আমি ব্যর্থ হলাম ওদের জন্য টাকার জোগাড় করতে। নিজের অংশটুকু ছাড়া তেমন কোনো সহায়তা পেলাম না। জানি না লকডাউন শিথিল হওয়ার পর সিদ্দিকরা কোন উপায় খুঁজে পেল কিনা। ওকে ফোন করলাম না ইচ্ছা করেই।

দেশের যে মানুষগুলো দারিদ্র্যসীমার একটু উপরে বাস করেন, এই সিদ্দিকের মতো, তাদের সবসময় খুব ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হয়, কারণ যেকোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে এই শ্রেণির মানুষগুলোরই পা ফসকে যায়। এরাই যেকোনো ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারেন, তখন তাদের নাম হয় নতুন দরিদ্র। আমি স্পষ্ট চোখে দেখতে পারছি সিদ্দিকসহ ওই দোকানের ছয়জন কর্মচারীই নয়া দরিদ্রের খাতায় নাম লিখিয়েছেন।

গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহরে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। জরিপে দেখা গেছে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত যেখানে শহরাঞ্চলে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৫৯ শতাংশ, সেখানে গ্রামাঞ্চলে তা ৪৪ শতাংশ। কারণ শহরে অসংখ্য শিকড়হীন মানুষ কাজ করতে আসেন। এনারা ছোটখাটো স্কুল-কলেজে শিক্ষকতা, চাকরি, ব্যবসা, ড্রাইভার বা গার্ড, দোকানি হিসেবে ভিড় করেন শহরে।

করোনা এসে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশের বড় একটা অংশ কতটা অসহায়, কতটা দুর্বল তাদের অবস্থান। শুধু এ কোভিডের কারণে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এই নতুন দরিদ্র শ্রেণির সংখ্যা, জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে। সূত্র: পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি)

একদিকে দেশে দরিদ্র বাড়ছে, তাদের জীবন হয়ে পড়েছে অরক্ষিত, বস্তিবাসীদের আয় দিন দিন কমছে, বেড়েছে খাদ্য ছাড়াও অন্যান্য ব্যয়, বাড়িভাড়া দেয়ার ক্ষমতা হারিয়েছেন, বেড়েছে ব্যক্তিগত ঋণ গ্রহণের পরিমাণ। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের খরচ, খাওয়া-দাওয়া, হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি, ওষুধ এবং অন্যান্য অসুখ বিসুখ মিলে মানুষের অবস্থা প্রাণান্তকর। একমাত্র কৃষক খেয়েপরে কোনোভাবে বেঁচে আছে বলে শহরের নয়া দরিদ্র ও দরিদ্র লোকেরা দলবেঁধে গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

ঠিক এরকমই একটা সময়ে ঈদ এসেছে আমাদের জীবনে। করোনাকালীন আমরা তিনটি ঈদ পেয়েছি। কোরবানির ঈদে কোরবানি দেয়াটা মুসলমানদের একটি অবশ্য পালনকারী নিয়মের মধ্যে পড়ে। আমরা কি এই মহামারির সময়ে কোরবানির জন্য বরাদ্দকৃত কিছু টাকা দরিদ্র মানুষের মধ্যে ভাগ করে দিতে পারি না? যেমন আমরা যদি মনে করি ২০ হাজার বা ২ লাখ টাকার কোরবানি দেব, তাহলে এর অর্ধেক টাকা দিয়ে গরু বা ছাগল কোরবানি দিয়ে বাকি টাকাটা আমাদের দরিদ্র আত্মীয়, প্রতিবেশী, পরিচিত অসহায় মানুষের হাতে তুলে দিতে পারি। এতে অনেক মানুষ নানাভাবে উপকৃত হবেন।

আমাদের সবারই পরিচিতজনদের মধ্যে এমন মানুষ আছে, যারা একবেলা না খেয়ে থাকলেও কারও কাছে চেয়ে খেতে পারবেন না। হয়তো বলতেও পারবেন না ওষুধ কেনার টাকা নাই। তাদের মাঝে কিছু টাকা দান করে দিতে পারলে, দানের আনন্দ অনেক বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে কিছু টাকা মানুষের প্রয়োজনে দান করা হলো, আর অন্যদিকে বাকি টাকাটা দিয়ে কোরবানিও দেয়া হলো। আল্লাহ মানুষের সব দানকেই সমানভাবে গ্রহণ করেন। যে যেভাবেই দান করুন না কেন, আল্লাহর কাছে দানের কথাটা ঠিকই পৌঁছে যাবে। সেই সাথে আমাদের কাছে ঈদের আনন্দ তখনই ভালো লাগবে, যখন আমার চারপাশের মানুষ সেই আনন্দে কিছুটা হলেও অংশ নিতে পারবে।

বাংলাদেশের শহরগুলোতে বস্তিতে থাকা দরিদ্র মানুষের মধ্যে শতকরা ৬৩ ভাগ মানুষ হচ্ছে দিনমজুর, রিকশাওয়ালা, বাসায় সাহায্যকারী, ছোট হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, রাজমিস্ত্রি, ছোট দোকানদার। আমরা কি জানি দেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত বহু পরিবার প্রায় আধপেটা এখন খেয়ে বেঁচে আছেন। তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, বাচ্চার দুধ কেনার পয়সা নেই। আমরা যদি নিজ নিজ পরিবার ও আশপাশের মানুষের দিকে দৃষ্টি দেই, দেখবো এদের অনেকেই খুব কষ্টের মধ্যে আছেন কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেন না।

সরকারের মুখ চেয়ে থাকলে চলবে না। একে মোকাবিলা করার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি এগিয়ে আসতে পারি আমরাও, যারা এখনো খেয়েপরে ঈদের কেনাকাটা করার সামর্থ্য রাখি। শুধু ঈদ নয়, আমরা যারা মধ্যবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত তারা চাইলেই কোনো একটা জায়গা থেকে খরচ কিছুটা কমিয়ে অল্পবিস্তর টাকা মানুষের হাতে তুলে দিতে পারি। উচ্চবিত্তরা তো পারেনই তাদের ব্যয়, বিলাসব্যসন কমিয়ে দরিদ্র মানুষের দায়িত্ব গ্রহণ করতে।

কিন্তু সবাই তো সেভাবে ভাবেন না বা ভাবতে চান না। যেমন পরিচিত একজন ব্যবসায়ীকে দেখলাম ঈদে তার সন্তানকে ২৫ লাখ টাকা দিয়ে গাড়ি কিনে দিতে। কারণ তার ১৬ বছর বয়সী ছেলে পরীক্ষায় ভালো করেছে। দুটি বিষয়ের উপহার একসাথে বলে তিনি ছেলের জন্য একটা গাড়িই কিনে ফেললেন। কাজেই উনি কীভাবে বুঝবেন যে কাজ হারিয়ে সন্তানের জন্য ভাত জোগাড় করার জন্য, একসময়ের দোকানদার আব্বাসকে কতটা দুঃখ ও লজ্জা নিয়ে পথে নামতে হয়েছিল। আপনার, আমার মতো পলায়নপর মধ্যবিত্ত মানুষতো চট করে নিয়মের বাইরে গিয়ে বিপ্লব ঘটাতে পারি না, তাই সিদ্দিক কেমন আছে তা জানতে ভয়ে ফোনও দেই না। কিন্তু এরপরও মনে হচ্ছে আমরা কি একটু অন্যভাবে ভাবতে পারি?
১৭ জুলাই, ২০২১

লেখক : সিনিয়র কোঅর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

এইচআর/এমএস

এমন মানুষ আছে, যারা একবেলা না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে চেয়ে খেতে পারবেন না। হয়তো বলতেও পারবেন না ওষুধ কেনার টাকা নাই। তাদের মাঝে কিছু টাকা দান করে দিতে পারলে, দানের আনন্দ অনেক বেড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে কিছু টাকা মানুষের প্রয়োজনে দান করা হলো, আর অন্যদিকে বাকি টাকাটা দিয়ে কোরবানিও দেয়া হলো। আল্লাহ মানুষের সব দানকেই সমানভাবে গ্রহণ করেন।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]