গণতন্ত্রের অবস্থা সংকটাপন্ন?

বিভুরঞ্জন সরকার
বিভুরঞ্জন সরকার বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত: ০৯:৪৬ এএম, ১৩ অক্টোবর ২০২১

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার গত ১০ অক্টোবর সাংবাদিকদের সামনে একটি লিখিত বক্তব্য পড়ে শুনিয়েছেন। তাতে তিনি কিছু কথা বলেছেন, যেগুলো ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য অস্বস্তিকর হলেও বিরোধী দলের জন্য প্রেরণামূলক। এ রকম ভিন্নধর্মী বক্তব্য তিনি প্রায়ই দিয়ে থাকেন। একটি সাংবিধানিক পদে থেকে ভিন্নমত প্রকাশ কতটুকু বাঞ্ছিত সে প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে না। অতীতে এমন নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবশ্য আগে হয়নি বলে এখন বা কখনও হবে না সেটা কোনো যুক্তির কথা হতে পারে না।

মা. তা. সাহেবকে অনেকেই নির্বাচন কমিশনে ‘বিরোধী দলীয়’ সদস্য বলে মনে করেন। নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিএনপির তালিকায় ছিল মাহবুব তালুকদারের নাম। সম্ভবত সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই মাহবুব তালুকদার নির্বাচন কমিশনে বিরোধী ভূমিকা পালন করে আসছেন। কমিশনের সিদ্ধান্তে তার মতামত গৃহীত হয় না বলেই হয়তো তিনি তার বক্তব্য সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরে নিজের মতভিন্নতা সবার কাছে স্পষ্ট করেন। কিন্তু এতে কী কোনো লাভ হয়? সরকার যেমন বিরোধী দলের কোনো কথা বা দাবির প্রতি কান দেয় না, ভিন্নমত আমলে নেয় না, তেমনি নির্বাচন কমিশনার মা. তা.র বক্তব্যও কিছু মানুষের মনে কিছু আশা জাগালেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সেসব উপেক্ষিত থাকে। মাহবুব তালুকদারের বক্তব্য না নির্বাচন কমিশন, না সরকার কাউকেই বিবেচনায় নিতে দেখা যায় না।

তিনি যা বলেন তাতে সত্যতা থাকে না তা নয়। তার মতামত শুনলে সরকারের বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যাবে তা-ও হয়তো নয়। তবু কেন তার মতামত বাতাসে মিলিয়ে যায়? এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য আমার জানা নেই। ভূমিকা না বাড়িয়ে ‘চলমান স্থানীয় নির্বাচন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ : আমার কথা' শীর্ষক লিখিত বক্তব্যে তিনি কি বলেছেন তা জেনে নেওয়া যাক। বলে রাখা ভালো আমি তার পুরো বক্তব্য শুনিনি, সংবাদপত্রে যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে ততটুকুর মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে। মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন, নির্বাচনপ্রক্রিয়া ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে দেশব্যাপী অরাজকতা ও প্রাণহানির আশঙ্কা আছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়'।

তিনি কোনো অমূলক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তা নয়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে তিনি যে ‘রাজনৈতিক সমঝোতা'র কথা বলেছেন, তার বাস্তব পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে কিনা? দেশে দীর্ঘদিন থেকেই রাজনীতিতে সমঝোতার পরিবেশ নেই। বিরোধ এবং বিভেদ এখন রাজনীতির মুখ্য উপাদান হয়েছে। রাজনীতিতে এখন পক্ষ বিপক্ষ নয়, আছে পক্ষ আর প্রতিপক্ষ। গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো একদল নয়, বহু দলের মতামত প্রকাশের মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। আমাদের দেশের রাজনীতিতে বহু দলের উপস্থিতি আছে। কিন্তু জনসমর্থনের পাল্লা ভারি হাতে গোনা কয়েকটি দলের। এর মধ্যে আবার প্রধান দল দুটি। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। ইসলামপন্থি দল বা সংগঠনেরও জনসমর্থন আছে। এক সময় বাম রাজনৈতিক দলগুলোরও কিছু জনসমর্থন ছিল। তারমধ্যে আশির দশক জুড়ে সিপিবির জমায়েত শক্তি অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছিল। এরশাদের জাতীয় পার্টিরও কিছু সাংগঠনিক শক্তি ছিল। এখন আর সেসব নেই। এখন রাজনীতি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, আরেক ভাগের সামনে বিএনপি। অন্যরা কোনো না কোনোভাবে এই দুই দলের রাজনীতির বৃত্তের মধ্যেই ঘোরাঘুরি করে। জোট, মহাজোট, বৃহত্তর ঐক্য ইত্যাদি নানা নামে।

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা কার্যত প্রায়-অসম্ভব একটি ব্যাপার বলেই মনে হয়। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় এই দুই দল যুগপৎ সংগ্রামের ধারায় কিছুটা কাছাকাছি এলেও পরে নানা ঘটনায় গত তিন দশকে এই দুই দলের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্বই কেবল বাড়েনি, বরং পরস্পর শত্রুতামূলক একটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। এই অবস্থার জন্য দায় কোন দলের বেশি তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক করা যেতে পারে কিন্তু সমাধানসূত্র বের করতে তা সহায়ক হবে না।

বিএনপি ক্ষমতায় থেকে এবং ক্ষমতার বাইরে থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সহযোগিতার চেষ্টার বদলে উল্টো দলটিকে যেকোনো উপায়ে নিশ্চিহ্ন করার নীতি নিয়েই এগিয়েছে। আওয়ামী লীগের তরফ থেকে দুএকবার নমনীয়তা দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিএনপি একবারও কঠোরতা পরিহারের মনোভাব দেখায়নি।

তাই এটা কিছুটা জোর দিয়েই বলা যায় যে, রাজনৈতিক সমঝোতা বিষয়টি আমাদের রাজনীতিতে আশু ফিরে আসার কোনো লক্ষণ নেই। নির্বাচন কমিশন গঠন থেকে অন্য যে সব সিদ্ধান্ত সামনে নেওয়া হবে তা সরকার সরকারের মতো করেই করবে। বিএনপির পরামর্শ নিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন না করলে দেশে মারাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করার ক্ষমতা এখনই বিএনপির নেই। আগামী নির্বাচন আসতে আসতে পরিস্থিতি বিএনপি কতটুকু তাতিয়ে তুলতে পারবে, দেখার বিষয় সেটাই।

মাহবুব তালুকদার বলেছেন, নির্বাচন এখন কতিপয় জটিল অসুখে আক্রান্ত। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় গণতন্ত্রের অবস্থা সংকটাপন্ন। একক ডাক্তারের পক্ষে তাকে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মেডিকেল বোর্ড গঠনের কোনো বিকল্প নেই। মৃত্যুপথযাত্রী গণতন্ত্রকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো একান্ত অপরিহার্য। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা গণতন্ত্রহীন নির্বাচন চাই কি না।

কথাগুলো শুনতে খারাপ লাগবে না কারোই। কিন্তু এই যে তিনি ‘আমরা' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, এই আমরা আসলে কারা? আওয়ামী লীগের আমরা এবং বিএনপির আমরাদের চাওয়া যে এক নয় সেটা তো বিভিন্ন ঘটনা থেকেই পরিষ্কার হয়েছে। গণতন্ত্র তো আকস্মিকভাবে সংকটে পড়েনি। এই অবস্থা একদিনে এককভাবেও কেউ করেনি। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় আছে বলে তার প্রতি দোষারোপের তীর নিক্ষেপের আগে অন্য সময় যারা ক্ষমতায় ছিল তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা ভালো।

একমত হয়ে সংকট নিরাময়ের পথে হাঁটার মতো সৎ চিন্তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগ যে ডাক্তার পছন্দ করবে, বিএনপি তাকে অপছন্দ করবে। দুই পক্ষের সম্মতিতে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা সম্ভব হবে বলে কোনো আলামত কি কেউ কোথাও দেখতে পাচ্ছেন?

মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পূর্বশর্ত ছিল গণতন্ত্র’। শুধুই গণতন্ত্র? স্বাধীনতার তো আরও কিছু পূর্বশর্ত ছিল। অসাম্প্রদায়িকতা, ন্যায্যতা ইত্যাদি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো হয় তা তো এইসব পূর্বশর্তকেও বধ করেছে আর তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন জিয়াউর রহমান, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। এখনকার বিএনপিও তো সেই ধারারই অনুসারী? তাহলে স্বাধীনতার পূর্বশর্ত হত্যাকারী বিএনপিকে রাজনৈতিক সমঝোতার পথের কাঁটা সরাতে হলে আগে তো নিজেদের অবস্থান সবার কাছে স্বচ্ছ করতে হবে। সেটা কি বিএনপি করবে? বিএনপি কি নিজেদের ভুলের দিকে চোখ ফেরানোর সাহস দেখাতে পারবে?

শেষ করি মাহবুব তালুকদারেরই একটি বক্তব্য দিয়ে। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও আমরা যদি অন্ধকার ঘরে একটি কালো বিড়ালের মতো গণতন্ত্রকে খুঁজে ফিরি, এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে? সত্যি তো, কোন ব্যবস্থায় নির্বাচন হলে সবার কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে সেটাই আমরা ঠিক করতে পারছি না। দেশ শাসন করবে রাজনৈতিক সরকার আর সেই সরকার নির্বাচনে রেফারির ভূমিকা পালন করবে কয়েকজন অরাজনৈতিক মানুষ! বাতিল করা সে ব্যবস্থায় কি আর ফিরে সম্ভব হবে? আমাদের নিরপেক্ষতাও যে কখনও কখনও চরম পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে তা অস্বীকার করা যাবে না। আওয়ামী লীগের সুবিধা হলে সেটা পক্ষপাত আর বিএনপির অনুকূলে বাতাস দিলে তা নিরপেক্ষ – এই অদ্ভূত নিরপেক্ষতা আওয়ামী লীগ মানবে কেন?

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। সহকারী সম্পাদক, আজকের পত্রিকা।

এইচআর/এমএস

‘স্বাধীনতার পূর্বশর্ত ছিল গণতন্ত্র’। শুধুই গণতন্ত্র? স্বাধীনতার তো আরও কিছু পূর্বশর্ত ছিল। অসাম্প্রদায়িকতা, ন্যায্যতা ইত্যাদি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানো হয় তা তো এইসব পূর্বশর্তকেও বধ করেছে আর তাতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন জিয়াউর রহমান, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। এখনকার বিএনপিও তো সেই ধারারই অনুসারী? তাহলে স্বাধীনতার পূর্বশর্ত হত্যাকারী বিএনপিকে রাজনৈতিক সমঝোতার পথের কাঁটা সরাতে হলে আগে তো নিজেদের অবস্থান সবার কাছে স্বচ্ছ করতে হবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]