প্রাণের মূল্য

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা , প্রধান সম্পাদক, জিটিভি
প্রকাশিত: ১০:০২ এএম, ২৭ নভেম্বর ২০২১

আগের দিন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি একজন কলেজ ছাত্রকে চাপা দিয়ে মেরেছে। পরদিন উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি পিষিয়ে মেরেছে মোটরসাইকেল আরোহী একজন সংবাদকর্মীকে। দুই সিটি করপোরেশন প্রমাণ করল – কেউ কারে না হারে সমানে সমান।

গত বুধবার গুলিস্তানে সড়ক পার হওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি ময়লাবোঝাই গাড়ি নাঈম হাসানকে চাপা দিলে সে মারা যায়। নাঈম হাসানের মৃত্যুর পরপরই তার সতীর্থরা রাস্তায় নেমে আসে। গত বৃহস্পতিবার আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। কয়েকটি স্থানে তাদের যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতেও দেখা গেছে। এরই মধ্যে বিকেলে পান্থপথে উত্তর সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ি মোটরসাইকেলে থাকা দৈনিক সংবাদের গ্রাফিক্স বিভাগের কর্মী এহসান কবির খানকে চাপা দিয়ে চলে যায়।

ধরে নিতে পারি আমাদের সাধারণ মানুষের জীবন ময়লারই নিচে। কিন্তু প্রশ্নও নিশ্চয়ই করতে পারি একটা রাজধানীতে ময়লার গাড়ি কেন দিনেরবেলা চলাচল করবে? দক্ষিণ সিটি করপোরেশন বলেছে, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন হারুন অর রশিদ নামের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। বাহ্, কি দারুণ এই সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্ম সংস্কৃতি!

আমাদের পড়ুয়ারা ডিজেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে হাফ ভাড়ার আন্দোলন করছে। এর মধ্যে তাদের একজন সতীর্থকে জীবন দিতে হলো সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির নিচে। এ ঘটনা মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১৮ সালের ঘটনা যে বছর বিমানবন্দর সড়কে দুই কলেজশিক্ষার্থী বাসচাপা পড়েছিল। সে সময় ঢাকাসহ সারাদেশে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে। শিক্ষার্থীরা একপর্যায়ে সড়কে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়েছিল। সড়ক আইন অমান্য করার কারণে অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তির গাড়িও তারা আটকে দিয়ে শাসিয়েছিল। শিক্ষার্থীদের অব্যাহত আন্দোলনের মুখে সরকার সড়ক পরিবহন আইন পাস করলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পেশিশক্তি প্রদর্শনের কারণে।

নিরাপদ সড়কের আন্দোলন করেছিল ছাত্রছাত্রীরা। কিন্তু এ দাবি সবার। এই নগরীতে উন্নয়নকাজ চলায় এখন রাস্তা বলতে কিছু নেই। অথচ এমন সড়কে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে বাস ও ট্রাক। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ মোড়েও যান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেই। সকাল-সন্ধ্যা-রাত সবসময় বাস আর নানা কিসিমের গণপরিবহনের গতিতে আমাদের বুক কেঁপে উঠে। প্রাণ যায় কত, কিন্তু কোথাও ব্যবস্থাপনা নেই।

সম্ভবত বিশ্বে একমাত্র দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের গণপরিবহন যে ব্যবসায় মালিক-শ্রমিক এক ভয়ংকর ঐক্য আছে নিকৃষ্ট সব নৈরাজ্যের পক্ষে। এই পরিবহন শ্রমিকরা মানুষকে মানুষ জ্ঞানই করছে না। যদি তাদের ভেতর সামান্যতম মানবিক বা নাগরিক বোধ থাকতো তাহলে নিশ্চয়ই ভাড়া নিয়ে কথাকাটাকাটির জন্য কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দিতে পারতো না। বেপরোয়া গাড়ি চালানো নিয়ে মাঝে মাঝে কিছু সতর্ক বার্তা দিতে চেষ্টা করেন সেতুমন্ত্রী। কিন্তু চালকেরা তা মানছেন না।

অনেক কিছুতে পিছিয়ে থাকলেও এবং মৃত্যুর নিরিখে বাংলাদেশের স্থান অনেক উপরে। ২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন দেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। দেশে ১ লাখে ১৫ জনের মৃত্যু হয় শুধু সড়ক দুর্ঘটনায়।

এত বেশি সড়ক দুর্ঘটনার কারণআমরা জানি - আইন না মানার প্রবণতা, গাড়ি চালকের অসুস্থ প্রতিযোগিতা, ফিটনেসবিহীন গাড়ির আধিক্য, ভালোমতো প্রশিক্ষণ না নিয়ে তড়িঘড়ি করে লাইসেন্স পাওয়ার প্রবণতা, সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে দুর্নীতির প্রাধান্য, সড়ক ও মহাসড়কের বেহাল অবস্থা। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা ঠিকমতো বিচার না পাওয়ায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু একটি বিষয় আলোচনায়ই আসছে বলে মনে হয় না আর তা হলো সড়ক পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিক নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এদের কাছে মানুষের জীবনের সামান্য দাম নেই। এই দুই গ্রুপ মিলে একদিকে অতি সাধারণ ঘর থেকে আসা পরিবহন শ্রমিকদের যেমন একটা ভালো পরিবেশে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছেন না, তেমনি মানুষের জন্যও চলাচল নিরাপদ রাখছেন না। স্বার্থের দ্বন্দ্বও ভয়ানকভাবে দৃশ্যমান এখানে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতা এমপি, মন্ত্রী তথা আইন প্রণেতা। ফলে দিন শেষে দায় মানুষের, দায়ী সাধারণ শ্রমিক আর লাভের খাতা পুরোটাই তাদের।

ঘরের মানুষটা বাড়ি থেকে বাইরে বের হওয়ার কথা বললেই স্বজনের আতঙ্ক। পথে কতই না বিপদ ওঁৎ পেতে থাকে। সবচেয়ে বড় মূর্তিমান বিপদ সড়ক দুর্ঘটনা। বলেকয়ে যা আসে না। কিন্তু কত পরিবারকে পথে বসিয়ে দেয় একেকটা দুর্ঘটনা। দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলছে। হাজার কর্মসূচি, হাজার প্রতিশ্রতিতেও রাশ টানা যাচ্ছে না দুর্ঘটনায়।

সব পরিসংখ্যানই বলছে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে গাড়িচালকদের দোষ বেশি। তরতাজা প্রাণগুলো অসময়ে দুর্ঘটনার বলি হচ্ছে শুধু কিছু শ্রমিকের গতির নেশায় বা নিয়মভঙ্গের কারণে। একরাশ শূন্যতা রেখে যাচ্ছে নিহতদের পরিবারে। কত পরিবার স্বজনকে অসময়ে হারিয়ে দিশাহারা। বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখলে মানবসম্পদের এ ক্ষয় সমাজের এক বিশাল ক্ষতি। কিন্তু কোনো ভাবনা নেই কোথাও। শাসনব্যবস্থায় মানুষের ভাবনা যে নেই সেটা বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থায়ই প্রমাণিত। সংশ্লিষ্টরা একটু আমাদের জানাবেন- সত্যি কি চান আপনারা যে সড়কে শৃঙ্খলা আসুক? মানুষ জানতে চায় আপনারা সত্যি কি প্রাণের মূল্য বোঝেন?

লেখক : প্রধান সম্পাদক, জিটিভি।

এইচআর/জেআইএম

কত পরিবার স্বজনকে অসময়ে হারিয়ে দিশাহারা। বৃহত্তর দৃষ্টিতে দেখলে মানবসম্পদের এই ক্ষয় সমাজের এক বিশাল ক্ষতি। কিন্তু কোন ভাবনা নেই কোথাও। শাসন ব্যবস্থায় মানুষের ভাবনা যে নেই সেটা বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থাতেই প্রমাণিত। সংশ্লিষ্টরা একটু আমাদের জানাবেন- সত্যি কি চান আপনারা যে সড়কে শৃঙ্খলা আসুক? মানুষ জানতে চায় আপনারা সত্যি কি প্রাণের মূল্য বোঝেন?

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]