নতুন বছর নতুন আশা নতুন স্বপ্ন ভালোবাসা

মোকাম্মেল হোসেন
মোকাম্মেল হোসেন মোকাম্মেল হোসেন , সাংবাদিক, রম্যলেখক
প্রকাশিত: ০৯:৫০ এএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২২

দু’চোখে দুনিয়ার ঘুম। ঘুম বলছে, ঘুমাও ঘুমাও। ঘুমের আদেশ মান্য করতে পারছি না। চোখের পাতা বন্ধ করলেই পাশ থেকে লবণ বেগম বলে উঠছে, তাকও তাকাও। একবার, দুইবার, তিনবার। বারবার। এতে খুব একটা কাজ হলো না। লবণ বেগমের আবেদন খারিজ করে দিয়ে চোখজোড়া বন্ধ হয়ে গেল। ঝাঁকি পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমাকে ঘুমরাজ্য থেকে ফিরিয়ে আনার পর ধমকের সুরে লবণ বেগম বলল-
: তাসিনের আব্বা...
চোখের পাতা না খুলেই উত্তর দিলাম-
: আরে; ঘুমাই না।
: সাপুইড়ারে সাপ ধরা শিখাইতে আসবা না। না ঘুমাইলে চোখ বন্ধ হইছে কী জন্য?
পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে লবণ বেগমের উদ্দেশে বললাম-
: চোখ বন্ধ করছি কি ঘুমানোর জন্য?
: তাইলে কী জন্য বন্ধ করছো?
: চিন্তা করার জন্য।
: চোখ খোলা রাইখা চিন্তা করা যায় না?
: শোন, কোনো কঠিন বিষয়ে চিন্তা শুরু করার আগে চোখ বন্ধ কইরা মনোসংযোগ স্থাপন করতে হয়। এতে ভালো রেজাল্ট পাওয়া যায়।
: তাই নাকি? রেজাল্ট পাওয়া গেল?
: না, এখনও পাই নাই।
: রেজাল্ট না পাইয়াই বাঁশি বাজানো শুরু কইরা দিছো?
: এইটা আর্টিফিশিয়াল।
: বুঝলাম না!
: নাকডাকার অভিনয় কইরা পরীক্ষা করতে চাইতেছিলাম, ঢাকা শহরের শব্দদূষণের শিকার হইয়া তোমার কানের পর্দা কতটা ফাটছে?
: তাসিনের আব্বা, সীমা অতিক্রম করবা না...
: সীমার মধ্যেই আছি। সীমার খালাতো বোন রীমার কাছে এখনও যাই নাই।
: ফাজুকি আলাপের বেলায় তো ওস্তাদ!
: ওস্তাদ না হইলে চলব ক্যামনে? ব্যবসা তো একটাই।
: সবুর করো, তোমার ব্যবসা যাতে অচিরেই লোডা লয়, সেই ব্যবস্থা করতেছি। চুকুর-চাকুর চা গেলা আর ভুসুর-ভাসুর ঘুমের এলসি বাতিল করলে ফাজুকি ব্যবসা বাষ্প হইয়া উইড়া যাব।
: উড়াইয়া দিয়া লাভ নাই!
: মানে?
: বাষ্প হইয়া উইড়া যাওয়ার পর সেইগুলা আবার বৃষ্টি হইয়া ফিইরা আসবে। এইটাই নিয়ম। এইটাই বাষ্পের ধর্ম। এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটানোর উপায় নাই।
: বাষ্পের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে তো জ্ঞানের নাড়ি টনটনা। উদাসীন কেবল সংসারের নিয়ম-কানুন পালনের বেলায়!

সংসারের নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে আমি উদাসীন, কথাটা ঠিক নয়। জীবিকা নির্বাহের জন্য পরিশ্রম করছি। প্রয়োজন অনুসারে বাজার, দাম্পত্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে ডিউটি পালন করছি। বাউলের বেশ ধরে একতারা হাতে রাস্তায় নামিনি। সাধু-সন্তু সেজে বনেও যাইনি। মোট কথা, সমাজের আর দশজন মানুষ যেভাবে সংসারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা ইত্যাদি নিয়ে জীবন অতিবাহিত করে, আমিও তাই করছি। এসব কথা বলব কাকে? বলতে গেলেই বাঙ্গি পচা। কথায় কথা বাড়ে, ভোজনে বাড়ে পেট। কাজেই কথা যত কম বলা যায়, ততই ভালো। নীরবতা অবলম্বনের নিয়ত করে পাশ ফিরে শোয়ার উদ্যোগ নিয়েছি, লবণ বেগম রৈ রৈ করে উঠল। বলল-
: তুমি বিছানা ছাইড়া ওঠ তো!
: দুঃখিত। উঠতে পারব না।
: ঘাওরামি করবা না। তোমারে...
: বলো?
: যা বলার নববর্ষের দিন বলবো।
: এখন বললে সমস্যা কী?
: সমস্যা আছে।
: কী সমস্যা? তুমি কি পোপ হইছো, পোপের মতো নববর্ষে বাণী প্রদান করবা?
: বাণী দিবো, না চোবানি দিবো; সেইটা সময় হইলেই জানতে পারবা।
আমাকে এখন অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। অনুগত প্রজার মতো অবনত মস্তকে জো-হুকুম রানী সাহেবা বলে লবণ বেগমের সব কথা মেনে নিতে হবে। এটাই সংসার-রণাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রথম পাঠ। মুখের জবান চলমান রেখে ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বড় কঠিন। মনে মনে নিজেকে বোবা ঘোষণা করে দিলাম।

নতুন বছরের নতুন সূর্য উদয় হয়েছে প্রায় দুই সপ্তাহ হতে চলল। তাতে কী! মরাকে চিৎ করে শোয়ালেও যা, কাত করে শোয়ালেও তাই। মরা মরাই। আমি গত বছর কামলা ছিলাম। এ বছরও নিশ্চয়ই কামলাগিরি করে কাটাতে হবে। আমি রাজনীতিক নই, সরকারি চাকরিজীবীও নই। ২০২১ সালের একজন কামলা ২০২২ কোনো এক জাদুমন্ত্রবলে সম্রাট জাহাঙ্গীর হয়ে যাবে, এমন সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। সারা বছর উদয়াস্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করে যে শ্রমিক, নতুন বছর উপলক্ষে সে মোমবাতি জ্বালালেই কী; আর আগরবাতি জ্বালালেই কী! সব ঝুটা। ফক্কা।

ফক্কার মধ্যেই লবণ বেগম ছক্কা হাঁকাতে চাচ্ছে। আলুভর্তার মধ্যে এক চিমটি শুকনা মরিচের গুঁড়া ছড়িয়ে দিয়ে লবণ বেগমের উদ্দেশে বললাম-
: এইবার বলো।
পাশ থেকে জাহিন বলল-
: আব্বু, আমি বলি?
চোখ পিটপিট করে আট বছরের ছেলের দিকে তাকিয়ে বললাম-
: তুমি বলবা মানে? তোমার আম্মা কি তোমারে উকিল নিয়োগ দিছে?
: না, তবে আম্মুকে আমি একটা কথা কাগজে লিখতে দেখেছি।
: কী কথা?
: নতুন বছর নতুন আশা; নতুন স্বপ্ন ভালোবাসা।
বিরতি না দিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে জাহিন জানতে চাইল-
: আব্বু ভালোবাসা কী?

ছেলের মুখের দিকে তাকালাম। ভালোবাসা কী, তা কি এককথায় প্রকাশ করা সম্ভব? ভালোবাসা মানে সম্প্রীতি। ভালোবাসা মানে অহিংসা। ভালোবাসা মানে একসঙ্গে পথচলা। শীতের সূর্য বস্ত্রহীন শিশুর গায়ে যখন উত্তাপ দেয়, সেখানে ভালোবাসা থাকে। নদীর জল যখন তৃষ্ণার্ত পথিকের দু’হাতের তালু জলে ভরে দেয়, সেখানে ভালোবাসা থাকে। গ্রীষ্মের দুপুরে ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের শরীরে যখন বাতাস পরশ বুলায়, সেখানে ভালোবাসা থাকে। ভালোবাসা থাকে ফুলের ঘ্রাণে, পাখির কাকলিতে, সমুদ্রের ঢেউয়ে। ভালোবাসা থাকে মানুষের হৃদয়ে। জগতের সৃষ্টি হয়েছে ভালোবাসা দ্বারা। যতদিন ভালোবাসা থাকবে, ততদিন পৃথিবী ধ্বংস হবে না। জাহিনের উদ্দেশে বললাম-

: বাবা, এই যে আমরা একসঙ্গে আছি, আমাদের দুঃখ-বেদনা আর আনন্দগুলো একসঙ্গে ভাগাভাগি করে নিচ্ছি, এটাই ভালোবাসা।
আমার কথার তুমুল প্রতিবাদ জানিয়ে লবণ বেগম বলল-
: আমি এই ধরনের ভালোবাসার কথা বলি নাই। আমার ভালোবাসার মধ্যে একটা ‘হাইফেন’ আছে।
নিরীহ ভঙ্গিতে লবণ বেগমের উদ্দেশে বললাম-
: ভালোবাসার মধ্যে কোনো ফাঁক থাকা উচিত নয়। তাইলে জীবনের সবকিছু ফাঁকিতে পরিণত হয়।
চোখ বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে লবণ বেগম বলল-
: তোমার কাছ থেইকা ‘ফাঁকবিহীন’ ভালোবাসা যথেষ্ট পরিমাণে পাইছি। এই ভালোবাসার আর দরকার নাই। এখন তোমার দায়িত্ব হইল, আমাদের মাথা গোঁজার জন্য একটা ভালো-বাসার বন্দোবস্ত করা। ২০২২ সাল হইল তোমার জন্য সর্বশেষ বছর। এই এক বছরের মধ্যে তুমি যদি ঢাকা শহরে নিজের বাসায় থাকার ব্যবস্থা করতে না পারো, তাইলে...

তাহলে কী হবে, সে ভাবনায় যেতে চাচ্ছি না। কারণ, ভবিষ্যৎ ভাবনায় অন্যদের সুখ থাকতে পারে, আমার মতো একজন কামলার কোনো সুখ নেই।

লেখক : সাংবাদিক, রম্যলেখক ।
[email protected]

এইচআর/ফারুক/জিকেএস

ভালোবাসা কী, তা কি এককথায় প্রকাশ করা সম্ভব? ভালোবাসা মানে সম্প্রীতি। ভালোবাসা মানে অহিংসা। ভালোবাসা মানে একসঙ্গে পথচলা। শীতের সূর্য বস্ত্রহীন শিশুর গায়ে যখন উত্তাপ দেয়, সেখানে ভালোবাসা থাকে। নদীর জল যখন তৃষ্ণার্ত পথিকের দু’হাতের তালু জলে ভরে দেয়, সেখানে ভালোবাসা থাকে। গ্রীষ্মের দুপুরে ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষের শরীরে যখন বাতাস পরশ বুলায়, সেখানে ভালোবাসা থাকে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]