মশা মারতে কামান নাকি চিরুনি?

ড. মাহবুব হাসান
ড. মাহবুব হাসান ড. মাহবুব হাসান , কবি, সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:০৯ এএম, ১৮ মে ২০২২

মশা মারতে কামান দাগার ইতিহাস আমরা জানি। সেই ইতিহাসের সুতো ধরেই গুলিস্তানের কালে খাঁর কামান অপসারিত হয়েছে- সাধারণের এই ধারণা। মশা ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’, রবীন্দ্রনাথের দেওয়া ছোট গল্পের এই সংজ্ঞার মতো তারা এখন সাধারণ থেকে অসাধারণ এডিস মশায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই রূপান্তরিত এডিস মশার জন্ম বয়সও কম হয়নি। তাই সামরিক কায়দায় তাদের বিরুদ্ধে চিরুনি, যাকে বলে কম্বিং অপারেশন, সেই উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মহানগরের দক্ষিণ সিটির মেয়র ফজলে নূর তাপস।

তিনি জনপ্রতিনিধি। তার কাঁধে মশা নিধনের রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব ও চাপ। তিনি তা অনুভব করেন বলেই এডিস মশা মারার কৌশল হিসেবে চিরুনি অপারেশন আয়োজন শুরু করেছেন। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে মশা মারার সেই অপারেশন। তার এলাকার ছয়টি ওয়ার্ড এডিসপ্রবণ বলে চিহ্নিত করেছে সরকারের জনস্বাস্থ্য বিভাগ। মেয়র তাপস সেই সব এলাকায় মশা মারার ওষুধ ছিটিয়ে তাদের বংশবৃদ্ধি নির্বংশ করতে শুরু করেছেন।

প্রাক-মনসুন বলে যাকে মহানাগরিকরা জানেন, আমরা যাকে বলি বর্ষাকাল, সেই বর্ষার আগে নাগরিক পরিবেশ-প্রতিবেশে মশা জন্মানোর জায়গা কেমন, বাসাবাড়ির আনাচে-কানাচে জুড়ে মশার প্রজননক্ষেত্র কতোটা কার্যকর, সেই হিসেব করেই তো এবারও আগের মতোই প্রাক-সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দক্ষিণ সিটি মেয়র। তার এ সিদ্ধান্ত সাধুবাদ জানানোর মতো।

এই সময়ে উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম কি উদ্যোগ নিয়েছেন আমার জানা নেই। আশা করি তিনিও একই রকম সিদ্ধান্ত নেবেন। কারণ তার সিটি এলাকায়ও এডিসের চাষবাস বেশ ভালোই হয়। গত ঈদের দিন, হঠাৎ করেই মিলিয়ন মিলিয়ন মশার উৎপাত শুরু হওয়ায় ভেবেছিলাম এরা কি আমদানিকৃত কোনো উড়ন্ত জীব কি না। তারপর থেকে মশাদের সাম্রাজ্য বেশ সচল। মশারি ছাড়া ঢাকায় রাতে ঘুমানোর উপায় নেই।

আমার বাসা ঢাকার দুই সিটির জংশনে, মানে আমাদের বনশ্রীর পশ্চিমাংশ উত্তরে, পূর্বাংশ দক্ষিণ সিটির ভাগে পড়েছে। ফলে কোন সিটির মশারা আমাকে বা আমাদের নাগরিকদের রক্ত শুষে নিচ্ছে, তা বুঝতে পারছি না। ফজলে নূর তাপস বলতে পারেন, তার মশা যায়নি, আতিক সাহেবও সেই দাবি করতে পারেন। কিন্তু ভুক্তভোগী নাগরিকরা কি করবেন?

আমরা কি মশা মারতে কামান আমদানি করতে বলবো? নাকি চিরুনি অপারেশনের জন্য দরখাস্ত দেবো? ঢাকার মানুষেরা দাবি করে সিটিতে কোনো দরখাস্ত না দেওয়া পর্যন্ত সিটির কর্তাদের নাকি মনেই পড়ে না যে ঢাকায় মশা উৎপাদনের বিশাল বিশাল নালা-নর্দমা, খাল ও কচুরিপানাসমেত মজাপুকুর আছে। আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফুলের বাগানে, বারান্দার টবের পানিতে এডিস সৃজনের কারখানার কথা তারা নাগরিকদের বলেও শেখাতে পারেননি যে মহানগরে বাস করতে হলে কিছু সচেতনতা দরকার।

নাগরিক জীবনের কায়দা-কৌশল, এটিকেট শিখতে হয়, সেভাবে নিজেদের গড়ে তুলতে হয়। নাগরিকদের মনে রাখা জরুরি যে এখন যেমন তারা রান্নাঘরের বর্জ্য বারান্দা বা জানালা দিয়ে ছুড়ে মারার অভ্যাস ত্যাগ করতে পেরেছেন, গার্বেজ ক্যানে ফেলে নিচে গেটের সামনে রাখতে শিখেছেন, তেমনি বাসাবাড়ির চারপাশটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ছাদ ও বারান্দা বাগানের টবের পানিও নিয়মিতভাবে ফেলে দিতে শিখতে হবে।

নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিমিত জীবনের ছায়ায় নিয়ে আসতে পারলে এডিসের বাপ-দাদার বংশ নির্বংশ হতে বাধ্য। মশার ওষুধের সঙ্গে জল মিশিয়ে নির্মলভাবে ছিটানোর উৎসবও কমে যাবে। আমরা মশাবিহীন ঢাকায় বাস করতে পারবো। আমরাও লিখবো না আর— ‘রাতে মশা/দিনে মাছি...এই নিয়ে ঢাকায় আছি।’

যখনই ফুটপাত ধরে হাঁটতে যাই, সেটা মহানগরের যে কোনো আবাসিক বা বাণিজ্যিক এলাকারই হোক না কেন, ফুটপাত বেদখল দেখতে পাই। শাক-সবজিঅলা, ফলমূলঅলা, ঠেলাঅলাদের ভিড় লেগেই আছে। তাদের কানকো ঘেঁষে কোনো মতে বেরিয়ে গিয়ে আবার পড়তে হয় ফুটপাতে দোকানিদের পসরার সামনে। দোকানি তার পসরা দোকানের সামনের ফুটপাতেও সাজিয়ে বসে আছেন। তাকে এটা অবৈধ বললে চোখ রাঙিয়ে বলে ওঠে যারা তোলা ওঠায় সাহস থাকলে তাদের বলেন। আমরা নিয়মিত টাকা [চাঁদা] দিই।

মাসোহারা। তখন গো-হারা পথচারী আমি। মাথা নিচু করে চলে আসি বা নেমে যাই ফুটপাতে ছেড়ে সড়কে, যেখানে হাজার হাজার যানবাহন। সেই যানবাহন হাতে ঠেলা দু-চাকার ঠেলা, তিন চাকার ভ্যান— এই রকম অযান্ত্রিক যানবাহনের পাশে তিন চাকার সিএনজিচালিত বেবি ট্যাক্সি, মোটরকার, বাস-মিনিবাস, মালবাহী কাভার্ডভ্যান ও খোলা ট্রাকে নির্মাণ সামগ্রীসহ আরও নানাজাতের শকট। হায়! এই হচ্ছে আমাদের ডিজিটাল ঢাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনার নিত্যদিনের দৃশ্যপট।

গত পরশু (৮ মে) একটি টিভির নিউজে দেখতে পেলাম গুলিস্তানের মতো যোগাযোগ কেন্দ্রের একটি সড়ক ফুটপাতের দোকানিরা বা তাদেরই রাজনৈতিক আত্মীয়রা দখল করে নিয়েছে। দখলটা শুরু হয়েছিল রোজার মাসে, [এটা প্রতি বছরই ঘটে থাকে] ঈদের কাপড়-চোপড় বিক্রির জন্য, তখন পুলিশ বা রাজনৈতিক তোলাবাজরা বেশ মজা করেই দখলকে নিজেদের আয়ের বাড়তি উৎস করে তোলে। ঈদের পর তাদের হটিয়ে রাস্তা সচল করতে চেয়ে বেকায়দায় পড়ে পুলিশ। সদরঘাটগামী বজরা-মার্কা বাস-মিনিবাসগুলোর যাতায়াত স্থবির হয়ে পড়ে। আর সেই কারণে টিভির চোখেও পড়ে তারা।

রিপোর্ট বলেছে, ছোটবড় ওই সব দোকান থেকে তোলা হয় ১০০ ও ২০০ করে ঢাকা প্রতিদিন। গোটা গুলিস্তান এলাকায়, ফুলবাড়িয়াসমেত বলা হচ্ছে ২ লাখ ভাসমান ব্যবসায়ী/ হকার ব্যবসা করছে। তাদের জীবন-সংসার চলছে ওই ভাসমান ব্যবসা থেকেই। এরা মূলত রাজনৈতিক তোলাবাজের রাজনৈতিক সহোদর, যারা ক্ষমতার ভাগ হিসেবে অলিখিত ইজারা দেয় ফুটপাত ও ফুটপাত সন্বিহিত রাস্তা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের চাঁদাবাজদের এ ব্যবসা চলতেই থাকে। সরকার পরিবর্তন হয়, নতুন সরকার আসে, তোলাবাজদের রাজনৈতিক পরিচয়ও পরিবর্তিত হয়।

এরাই সবচেয়ে হতভাগ্য ব্যবসায়ী, যাদের কোনো লাইসেন্স-পারমিট নেই। তোলাবাজ রাজনৈতিক সহোদরই তাদের চিহ্নিত লাইসেন্স। এদের খবর কিন্তু সরকারের সব তরফের কাছেই আছে। পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা, প্রশাসনের টপ টু বটম, সবাই জানেন এদের খবর। কিন্তু এদের জন্য কোনো স্থায়ী ভাবনা কারও নেই। রাজনৈতিক সরকারের এই ফুটপাতের তোলাবাজদের লালন পালনের জন্যই সরকারের সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের মুখ চাপা পড়ে থাকে। সড়কে মহা যানজট পড়লেও ফুটপাত দখলমুক্ত করার কোনো সিদ্ধান্ত হবে না।

মুখে বলবে, ওই গরিব মানুষরা তাহলে কি করে খাবে, সংসার চালাবে? কিন্তু একবারও বলবে না যে তারা চাঁদাবাজদের লালনের জন্যই এটা করছেন। টিভির ওই রিপোর্ট বলেছে মাত্র ৪ কোটি টাকা তোলা বা চাঁদা তোলা হয় মাসে। মাত্র কয়েকজন রাজনৈতিক চাঁদাবাজ, চার কোটি টাকা ভোগ করে ওই গরিব-গোবরোদের আয় থেকে নিয়ে।

চাঁদা তোলার এই পদ্ধতিটা বেশ ভালো রাজনৈতিক তৃণমূলের নেতাকর্মীদের লালন-পালনের জন্য। না হলে ওই টাকা তো কর্মীদের দিতে হতো দলের তহবিল থেকে বা নেতাদের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে। বড় নেতাদের প্রকাশ্য আয় থেকে তারা সেটা বহন করতে চাইবেন না। অপ্রকাশ আয় থেকে তার ঘনিষ্ঠ সার্কেলের লোকদেরও তো পালন করতে হয়। এ-এক ক্ষান্তিহীন রাজনৈতিক চক্র।

এই রাজনৈতিক চক্রই আমাদের রাজনীতির চরিত্রে কালিমা লেপন করেছে, আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পের বৃহদাংশ গিলে ফেলছে। আমরা সেগুলো মাটি চাপা দেওয়ার জন্য প্রকল্পের টাইম এক্সটেনশন ও ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়ে সেগুলোকে মেগা করে তুলেছি।

আমি জানি সরকার ইচ্ছা করলেই পারে, কিন্তু তার স্টেকহোল্ডাররা [কর্মীবাহিনী যারা নিয়ন্ত্রণ করেন] তা হতে দেবে না। সরকারের রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডার হলো তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাদের অখুশি করার অর্থ হচ্ছে পরবর্তী নির্বাচনে তারা আর তাদের পক্ষে ভোটের কারসাজিতে হাত লাগাবে না। তাই পরামর্শ দিয়ে কোনো লাভ নেই।

তারপরও বলবো, সিটি করপোরেশন ইচ্ছে করলে ওই ফুটপাত ব্যবসায়ীদের জন্য পরিকল্পিত সিটি মার্কেট সৃষ্টি করতে পারে নিবন্ধনের মাধ্যমে। সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার আর কোনো বিকল্প পথ নেই। আরেকটা পরামর্শ হচ্ছে, গরিব মানুষ যাতে ঢাকায় ছুটে না আসে তার জন্য জেলা ও উপজেলায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অতি জরুরি কাজ।

গ্রামে গ্রামে হাঁস-মুরগি/ছাগল-ভেড়া-গরুর খামার করে দেওয়ার মাধ্যমেও গরিবদের শহরমুখী হওয়া থামাতে পারে। আর অর্থনীতিকে গ্রামনির্ভর করার আয়োজন ইতিবাচক ফল দেবে। কৃষির সম্প্রসারণসহ সব ধরনের উদ্যোগকে সহজ ও স্বাভাবিক করে তেলার কোনো বিকল্প নেই।

পরামর্শ নেওয়ার মতো প্রজ্ঞাবান মানুষ সরকারের ভেতরে আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তটি আসতে হবে ওপর থেকে, তা নাহলে কোনো কিছুই হবে না।

০৫-০৯-২২
লেখক: কবি, সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/ফারুক/এমএস

পরামর্শ নেওয়ার মতো প্রজ্ঞাবান মানুষ সরকারের ভেতরে আছে, কিন্তু সিদ্ধান্তটি আসতে হবে ওপর থেকে, তা নাহলে কোনো কিছুই হবে না।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]