ইসলামে আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মাহমুদ আহমদ
মাহমুদ আহমদ মাহমুদ আহমদ , ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:০২ এএম, ০৯ আগস্ট ২০২২

আজ আশুরা। পবিত্র মহররম মাসের ১০ তারিখ। এই দিনটি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ত্যাগের মহিমা মুসলিম উম্মাহর এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জুলুম-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং অসত্য ও অন্যায় প্রতিরোধে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর এ ভূমিকায় মানবজীবনের জন্য বিরাট একটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। ইসলামের ইতিহাসে যতগুলো ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস আছে তার মধ্যে আশুরা হচ্ছে একটি ব্যতিক্রমধর্মী এবং অতি স্মরণীয় ও বরণীয় দিবস।

এই দিনে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু অন্যায় ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে চক্রান্তকারী ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে কারবালার প্রান্তরে শাহাদতবরণ করেন। সেদিন প্রকৃত ইসলাম ও সত্যের জন্য হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে মাথানত না করে লড়াই করে শাহাদতবরণ করেছিলেন।

হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু সেদিন ন্যায় ও সত্যের জন্য চরম আত্মত্যাগের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা অনুকরণীয়। শিয়ারা বর্তমানে হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদতের শোকে যে মাতম করে তা আবেগতাড়িত এক বেদাত ছাড়া কিছুই নয়।

হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর ত্যাগের কথা স্মরণ করে তার আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করা। রাস্তাঘাট বন্ধ করে অপরকে কষ্ট দিয়ে শোক প্রকাশের কোনো শিক্ষা ইসলামে নেই। এছাড়া শহীদে কারবালা হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু বলে গেছেন, ‘আমি শহীদ হলে তোমরা আমার জন্য উহ্! আহ্! করো না, আঁচল ছিঁড়ো না, বরং ধৈর্য ধারণ করে থাকবে।’

হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু খিলাফতে রাশেদার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নিজ দেহের শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত দান করে গেছেন, যুগ যুগ ধরে তাঁর এই ত্যাগ মুসলিম উম্মাহকে খিলাফতে রাশেদার অনুরূপ আল্লাহ মনোনীত খলিফা ও ঐশী ইমামত-এর ছত্রচ্ছায়ায় জীবন অতিবাহিত করার অনুপ্রেরণা জোগাবে।

হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদতের ঘটনার জন্য প্রত্যেক মুসলমানই সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করে আর শিয়ারা প্রত্যেক বছর মহররম মাসে নিজস্ব রীতি অনুসারে সেই দুঃখ এবং বেদনায় হা-হুতাশ করে। যদিও আমাদের দৃষ্টিতে তারা এক্ষেত্রে খুবই বাড়াবাড়ি করে। কারবালায় হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু, তাঁর পরিবারের সদস্যবর্গ এবং কয়েকজন সাথী সঙ্গীকে বড় নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এ ঘটনা হজরত ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদতের ঘটনারই একটি ধারাবাহিকতা।

হজরত ইমাম হাসান ও হোসাইন সম্পর্কে মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, জান্নাতের যুবকদের সরদার তারা। তাদের উভয়ের জন্য রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে এই দোয়া করতেন যে, হে আল্লাহ! আমি তাদের ভালোবাসি, তুমিও তাদের ভালোবাস।

অতএব, যারা রাসুলুল্লাহর দোয়ার কল্যাণ এতটা লাভ করেছেন আর একই সাথে যারা শাহাদতের পদমর্যাদাও লাভ করেন এমন মানুষ অবশ্যই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি অনুসারে জান্নাতে মহান জীবিকা লাভ করবেন এবং তাদের হত্যাকারী অবশ্যই খোদার গজব এবং ক্রোধের শিকার হবে।

আজ থেকে চৌদ্দশ বছর আগে এই মহররম মাসের ১০ তারিখ নিষ্ঠুর পাষাণরা রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই প্রিয়কে শহীদ করে। যে শাহাদতের ঘটনা শুনে গা শিউরে ওঠে। এই পাষাণরা এক মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করল না যে কাকে আমরা খড়গাঘাত করতে যাচ্ছি।

মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে শিক্ষা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন তা কীভাবে পদদলিত হয়েছে হজরত হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদতের ঘটনার মাধ্যমে তা ফুটে উঠেছে। হজরত হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর সৈন্য বাহিনীর ওপর যখন শত্রু নিয়ন্ত্রণ পায় তখন তিনি ঘোড়াকে সমুদ্রমুখী করে অগ্রসর হওয়ার জন্য ইচ্ছা করেন তারপরও তাকে বাধা দেওয়া হয় এবং তার প্রতি তীর ছোড়া এবং সেই তীর হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর চিবুকের নিচে লাগে।

বর্ণনাকারী বলেন, আমি শাহাদতের পূর্বে তাকে এই কথাই বলতে শুনেছি, আল্লাহর কসম, আমার পর আল্লাহর এমন কোনো বান্দাকে তোমরা হত্যা করবে না যার হত্যার কারণে আল্লাহ তোমাদের প্রতি আরও বেশি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবেন।

আমি আশা করি আল্লাহ তাআলা তোমাদের লাঞ্ছিত করবেন আর আমাকে সম্মানিত করবেন। এরপর আমার হত্যার প্রতিশোধ এমন ভাবে নেবেন যে, যা তোমরা ভাবতেও পারবে না। আল্লাহর কসম, আমাকে যদি তোমরা হত্যা কর তাহলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাঝে যুদ্ধ সৃষ্টি করবেন এবং তোমাদের রক্ত ঝরবে। যতক্ষণ পর্যন্ত বেদনাদায়ক শাস্তিকে আল্লাহ বহুগুণে বৃদ্ধি না করেন তিনি বিরত হবেন না।

তাকে শহীদ করার পর কুফাবাসিরা তার পবিত্র লাশের সাথে কি ব্যবহার করেছে দেখুন, আমর বিন সাদ আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা দেয়, কে কে হজরত ইমাম হোসেনের মৃতদেহের ওপর ঘোড়া দৌড়ানোর জন্য প্রস্তুত। এই কথা শুনে দশজন ঘোড়সোয়ার বের হয়, যারা নিজেদের ঘোড়া নিয়ে তাঁর পবিত্র দেহের ওপর ঘোড়া দৌড়ায় এবং পিষ্ট করে আর তাঁর বক্ষ ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়। এই যুদ্ধে হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর দেহ ৩৫টি তীরে আঘাত বিদ্ধ হয়।

তিনি এজিদের প্রতিনিধিদের একথাও বলেছিলেন যে, আমি যুদ্ধ চাই না, আমাকে যেতে দাও, আমি গিয়ে আল্লাহর ইবাদত করতে চাই বা কোন সীমান্তে আমাকে পাঠিয়ে দাও যেন ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে করতে আমি শাহাদতবরণ করতে পারি বা আমাকে এজিদের কাছে নিয়ে যাও যাতে আমি তাকে বুঝাতে পারি যে, আসল ব্যাপার কি। কিন্তু তার প্রতিনিধিরা কোনো কথা শুনে নাই। অবশেষে যুদ্ধ যখন চাপানো হয় তখন বীরপুরুষের মতো মোকাবিলা করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। এই স্বল্পসংখ্যক মুসলমান যাদের সংখ্যা ৭০-৭২ হবে তাদের মোকাবিলায় ছিল এক বিশাল সৈন্যবাহিনী।

এদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করা কোনো ভাবেই সম্ভব ছিল না। একে একে তারা সবাই শাহাদতবরণ করেন। আল্লাহ তাআলার প্রতিশোধ নেওয়ার নিজস্ব রীতি আছে যেভাবে হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেই বলেছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা আমার হত্যার প্রতিশোধ নেবেন আর আল্লাহ তাআলা প্রতিশোধ নিয়েছেনও।

হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের একটি উদ্দেশ্য ছিল। তিনি কখনো রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের লোভ রাখতেন না, তিনি সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি ন্যায়ের জন্য দণ্ডায়মান হয়েছিলেন। হজরত ইমাম হোসাইনের ত্যাগ, কোরবানি আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রেখে গেছে।

নিজের অধিকার নিজের জীবন বাজি রেখে পৃথিবীতে সত্যের প্রসার করেছেন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি সত্য প্রচারের যে আদর্শ রেখে গেছেন তা সব সময় আমাদের আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে। আর এর ওপর যদি আমরা প্রতিষ্ঠিত থাকি তাহলে সেই বিজয়ের অংশ হবে, যা ইসলামের জন্য অবধারিত। কারবালা প্রান্তরে তাঁর শাহাদতবরণ ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।

সত্য, ন্যায় এবং নবুওয়াতের পদ্ধতিতে আল্লাহর জমিনে সত্যিকারের ইসলামি খেলাফত পুনঃপ্রবর্তনের লক্ষ্যে হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ও তাঁর সঙ্গী-সাথীরা যে ত্যাগ ও কোরবানি স্বীকার করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত তা আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

জীবনের চেয়ে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার বিশ্বনবির দৌহিত্রের অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ জগতের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। তিনি নিজের অধিকার নিজের জীবন বাজি রেখে পৃথিবীতে সত্যের প্রসার করেছেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কারবালার শোকাবহ ঘটনায় চিরন্তন সত্যের মহাবিজয় হয়েছিল এবং বাতিলের পরাজয় ঘটেছিল। সুতরাং আশুরার এ মহিমান্বিত দিনে শুধু শোক বা মাতম নয়, প্রতিবাদের সংগ্রামী চেতনা নিয়ে হোক চির সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন লড়াই।

আসুন, হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদতের এ দিনে তাঁর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে নিজ ও সমাজের সর্বস্তরে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করি।

এইচআর/ফারুক/জেআইএম

আসুন, হজরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদতের এ দিনে তাঁর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে নিজ ও সমাজের সর্বস্তরে ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করি।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।