দাম নিয়ে ধুন্ধুমার

বিভুরঞ্জন সরকার
বিভুরঞ্জন সরকার বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত: ১০:০৫ এএম, ০৯ আগস্ট ২০২২

বিএনপি বছরের পর বছর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সরকাকে যতটা না চাপে ফেলতে পেরেছে, এবার আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বাড়িয়ে মনে হয় তারচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে। মন্ত্রীরা নানা রকম যুক্তি দিচ্ছেন বটে কিন্তু সেগুলো মানুষের কাছে খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। মন্ত্রী বলছেন, নিরুপায় হয়েই মূল্য ‘সমন্বয়’ করতে হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, সাধারণ মানুষ তাদের আয়-ব্যয়ের সমন্বয় করবে কীভাবে? জ্বালানি তেলের দাম বাড়া মানে আরও অনেক কিছুর দায় বাড়া। ব্যক্তি মানুষের যাতায়াত ব্যয় যেমন বাড়বে, তেমনি পরিবহন খরচ বাড়বে বলে অন্য সব জিনিসেরও দাম বাড়বে। বাংলাদেশে এমনিতেই দাম বাড়ার কোনো যুক্তি বা উপযুক্ত কারণ লাগে না।

বন্যার অজুহাতে দাম বাড়ে, খরার অজুহাতে দাম বাড়ে, আবার আকাশে মেঘ জমলেও দাম বাড়ে। বাজার যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের ক্ষমতা অসীম। তারা শুধু বাজার নয়, রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করেন, সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন একাধিক কারবারি। তারা এখন মানুষের ভাগ্য জীবন জীবিকা সবকিছু নিয়েই কারবার করছেন।

বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে কয়েক মাস আগে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম এক লাফে বাড়ানো হয়েছিল লিটারপ্রতি ১৫ টাকা। ৬৫ টাকা থেকে হয়েছে ৮০ টাকা। শতকরা ২৩ শতাংশ। সরকার তখনো এক বুধবার রাতে এক নির্বাহী আদেশে এই দাম বাড়ানোর কথা জানিয়েছিল। এবারও গত শুক্রবার রাতে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে মধ্য রাতেই তা কার্যকর করা হয়েছে। এবার ডিজেল ৮০ টাকা থেকে হয়েছে ১১৪ টাকা লিটার। পেট্রল ৮৬ টাকা থেকে ১৩০ টাকা এবং অকটেন ৮৯ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা।

দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি হলো বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ক্রমেই বাড়ছে। তাছাড়া ২০১৬ সালের পর আর জ্বালানির দাম আমাদের দেশে সেভাবে বাড়েনি। তো, এবারও অজুহাত সেই বিশ্ববাজারের। তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যখন কমতে শুরু করেছে, তখন এই মূল্যবৃদ্ধি মেনে নেওয়া যায় না।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সরকারকে তেলের দাম সমন্বয় করতেই হতো। তবে দাম সমন্বয়ের এটা সঠিক সময় ছিল না। দামও বেড়েছে অনেক বেশি। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বেড়ে গেল। তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দেবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেছেন, সরকারের উচিত ছিল জ্বালানির দামটা সহনীয় রাখা। তা না করে, যে হারে দাম বাড়ানো হয়েছে তা অসহনীয় ও সাংঘাতিক রকমের বেশি। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ–ডিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট রিজওয়ান রাহমানের মতে, একলাফে জ্বালানির দাম এত বাড়ানোর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তিনি বলেন, এর ফলে কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। এটা হতে পারে না। দরকার হলে প্রতি মাসে দাম পুনর্নির্ধারণ করা যেত।

নিট পোশাকের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান মাইক্রো ফাইবার গ্রুপের পরিচালক ড. কামরুজ্জামান কায়সার বলেছেন, বিদ্যুতের রেশনিংয়ে এমনিতে উৎপাদন অন্তত ২০ শতাংশ কমে গেছে। এর মধ্যে নতুন করে এত বেশি হারে জ্বালানির দাম বাড়ানো রপ্তানি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে। আমরা বুঝতে পারছি না যে, সামনে কী হবে। ক্রেতারা ইতিমধ্যে তাদের অর্ডারও কমিয়ে দিয়েছে। মন্দার কারণে দামও বেশি দিতে চাচ্ছে না।

বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করা নিশ্চয়ই কোনো ব্যবসার নিয়ম নয়। ব্যবসা তো লাভের আশায়ই। তবে সরকার তো আর ব্যবসায়ী নয়। সরকারেরও আয়-ব্যয়ের বাৎসরিক পরিকল্পনা থাকে। সরকারকে কখনো কখনো ভর্তুকি দিয়েও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে হয়।

তাই বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে আমাদের দেশে না বাড়িয়ে উপায় থাকে না। তবে এবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে বিশ্ববাজারের কথা বলা হলেও আসল কারণ সম্ভবত সরকারের রিজার্ভে টান। সরকার ঘাটতির কথা বিবেচনা করেই হয়তো আইএমএফসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নীকারক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণসুবিধা চেয়েছে। অনেকে মনে করছেন, আইএমএফের পরামর্শেই জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে এতটা বাড়ানো হয়েছে।

বাজারে দাম কমা-বাড়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যেমন বাড়ে, তেমনি কমেও। আমাদের দেশে বাড়ার কথা শুনে দাম বাড়ানো হয়, কমার সময় দাম কমানোর কোনো দৃষ্টান্ত কি আমাদের সামনে আছে? কথা আরও আছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রতিক্রিয়া জনজীবনে নানাভাবে পড়ে।

পরিবহন ব্যয় বাড়বে। সেই সঙ্গে বাড়বে জিনিসপত্রের দাম। সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে আছে সেই করোনার শুরু থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায়। মানুষের আয় বাড়ছে না। কিন্তু ব্যয় বাড়ছেই। জ্বালানির দাম বাড়ায় মানুষের নাভিশ্বাস উঠবে। জনস্বার্থের কথা সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় থাকলে হুট করে ডিজেল-পেট্রল-অকটেনের দাম এতটা বাড়ানো হতো না।

বলা হচ্ছে, ভারতে জ্বালানি তেলের দাম বাংলাদেশের থেকে অনেক বেশি। তাই জ্বালানি তেলের চোরাচালান ঠেকাতেও আমাদের দেশে দাম বাড়ানো যুক্তিসঙ্গত। এ তো মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো যুক্তি! চোরাচালান বন্ধ করতে অক্ষম, তাই দাম বাড়িয়ে সক্ষমতা দেখানো।

এখন আবার এই যুক্তিও হাজির করা হতে পারে যে, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তো আড়াই হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। এই গড় হিসাবে সব সময় গোলমেলে। আয় যাদের বেড়েছে, তাদের বেড়েছে হয়তো হাজার বা লাখের হিসেবে। সেটা কত শতাংশ মানুষের? বেশিরভাগ মানুষেরই তো আয় না বেড়ে ব্যয় বেড়েছে। মানুষের গড় ব্যয় কত বেড়েছে সে হিসাব একসঙ্গে পাওয়া না গেলে গড় মাথাপিছু আয় বাড়ার সংবাদে কারও মন খুশিতে নেচে উঠবে বলে মনে হয় না।

গড় হিসাবের একটি গল্প মনে পড়ছে। এক ব্যক্তির শরীরের একাংশ একটি ঠান্ডা জায়গায় এবং অন্য অংশ গরম জায়গায় রেখে গড় পরিমাপ করা হলো – নাতিশীতোষ্ণ! আমাদের গড় মাথাপিছু আয়ের হিসাব তো এমনই।

লেখাটা শেষ করছি সাংবাদিক ও শিক্ষক আনিস আলমগীরের ফেসবুক পেজের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে। তিনি লিখেছেন : ‘জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করে সরকার মানুষের ঘাড়ে তুলে দিয়েছে দ্রব্যমূল্যের বিরাট এক বোঝা। বামদলগুলোসহ ছোটখাটো কিছু দল সীমিত আকারে এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছে, কিন্তু বিএনপির মতো দল বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব সারা।

মা ও ছেলের মামলা এবং জেল ইস্যুতেই বিএনপির কাটিয়ে দিল ১২টি বছর। ওরা জনগণের কথা বলে না। জনগণ ওদের ভবিষ্যৎ শাসন পরিকল্পনার কথা জানে না। সেদিন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে হারিকেন নিয়ে একটা সভা করলো কিন্তু নিজেরা ক্ষমতায় আসলে বিদ্যুতের কি হাল হবে সেটা বললো না। খাম্বাকালের দুঃসহ লোডশেডিংয়ের স্মৃতি মানুষ কি ভুলে গেছে?

আসলে যে দলটি একটি বিকল্প বাজেট দিতে পারে না, সেই ব্যর্থতা ঢাকতে গিয়ে মহাসচিব বলেন অবৈধ সরকারের বাজেট নিয়ে আমরা কোনো মন্তব্য করব না, মানুষের কোন ঠেকা পড়েছে রাস্তায় নেমে এদেরকে ক্ষমতায় আনার? এরা দন্ডিত, পলাতক, গ্রেনেড হামলার মাস্টার মাইন্ডকে নিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে চায়, শেখ হাসিনাকে হটাতে চায় কিন্তু জনগণ কি চায় সেই খবর রাখে না। জনগণের মন পেতে চাইলে খাওয়ার বিপরীতে আবারো ‘হাওয়া’ নিয়ে আসলে লাভ হবে না। আগে ‘হাওয়া’কে সরান।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/ফারুক/জেআইএম

বাজারে দাম কমা-বাড়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম যেমন বাড়ে, তেমনি কমেও। আমাদের দেশে বাড়ার কথা শুনে দাম বাড়ানো হয়, কমার সময় দাম কমানোর কোনো দৃষ্টান্ত কি আমাদের সামনে আছে? কথা আরও আছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তার প্রতিক্রিয়া জনজীবনে নানাভাবে পড়ে।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।