কিশোর অপরাধ

ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদকারীকে কেন জীবন দিতে হলো?

লীনা পারভীন
লীনা পারভীন লীনা পারভীন , কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ এএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

সমাজ থাকলে সেখানে মানুষ থাকবে। মানুষ থাকলে অপরাধও থাকবে। কিন্তু সেই অপরাধকে দমানোর জন্যই প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতে গঠন করা হয় আইন-কানুন, নিয়ম, শৃঙ্খলা আর বিভিন্ন ধরনের প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক বাহিনী। এই যে পুলিশ, র‌্যাব সেনাবাহিনী প্রতিটি বাহিনীরই কর্মপ্রণালি নির্দিষ্ট করা আছে। সে অনুযায়ী তারা তাদের ভূমিকা রাখে। কিন্তু বাস্তবে কেবল আইন, কানুন বা পুলিশ দিয়েই অপরাধ ঠেকানো যায়?

যেকোনো অপরাধ নিরাময়ে দুই ধরনের প্রক্রিয়া ধরে আগাতে হয়। প্রতিরোধমূলক আর প্রতিকারমূলক। পুলিশ বা আইন আসলে এই দুই কাজই করে; তবে প্রতিকারমূলক কাজই বেশি করে অর্থাৎ সমস্যা হলে সেটিকে ধরে কাজ করে বেশি। আসলে আমার আজকের এই লেখা কোন বাহিনী কোন কাজ করে সেটি নিয়ে নয়। সমাজে দিন দিন কিশোর অপরাধ বেড়েই চলেছে।

আগেরকালে কিশোর অপরাধের ধরন বা চিত্র ছিল একরকম আবার এখন এই ডিজিটাল কালে এই অপরাধের নাম হয়েছে গ্যাং কালচার। এই ‘গ্যাং কালচার’ শব্দের আবিষ্কারের আড়ালে ‘অপরাধ’র যে অর্থ সেটিকে চাপা দেওয়া হয়েছে। ‘কিশোর অপরাধ’ শুনলেই মনোজগতে কাজ করে এর শাস্তি প্রাপ্য কারণ ‘অপরাধ’ শব্দটি আমাদের কাছে নেতিবাচক হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু ‘কালচার’ শব্দের মধ্যে এক ধরনের আশ্রয় প্রশ্রয় কাজ করে, যা নেতিবাচক নয়।

পত্রিকায় দুদিন পরপর কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধমূলক কার্যক্রমের সংবাদ আসে। এই তো দুদিন আগেই টাঙ্গাইলের সখীপুরে ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় এক কলেজছাত্রকে পিটিয়েছে তারই বয়সী কিছু কিশোর। পরে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সেই ছাত্রটি মারা গেলো। এর কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে উত্তরার একটি এলাকায় একই কারণে পিটিয়েছিল কিছু কিশোর। এর আগেও এমন অনেক নৃশংস ঘটনার বিবরণ পড়েছি আমরা পত্রিকায়।

বগুড়ার নয়ন বন্ডের গ্যাংয়ের খবর আমাদের আলোচনায় নিশ্চয়ই এখনও তাজা আছে। একটি ঘটনায় কতগুলো তাজা প্রাণ নষ্ট হয়ে গেলো। এমন হিসাব দিলে কিন্তু তালিকা অনেক লম্বাই হবে। ঘটনা ঘটছে, আমরা জানতে পারছি যে এলাকায় এমন ছোটবড় অনেক কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে যার বিস্তৃতি এখন আর শহর অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। ছড়িয়েছে গ্রামগঞ্জেও। আগে আমরা জানতাম এলাকায় এলাকায় মাস্তান জন্ম নেয়, যারা এলাকার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ করতো। আর এই আধুনিক কালে এসে জানছি আমাদের বাচ্চা বাচ্চা সন্তানরা জড়িয়ে পড়ছে অপরাধের সাথে।

কেন জানি না আমরা এই মারাত্মক বিষয়টি নিয়ে সচেতন হচ্ছি না। টিভি বা অন্য কোনো মিডিয়ায়ও এই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও তেমন কর্মকাণ্ড নজরে আসেনি। তাহলে কি আমরা এটিকে সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য তেমন বড় বা ভয়ঙ্কর কিছু মনে করছি না?

আমি কিন্তু একজন অভিভাবক হিসেবে অত্যন্ত ভয়ের মধ্যে আছি কারণ আমাদের সন্তানরা কেমন করে, কোথায়, কাদের প্ররোচনায় মাদক থেকে শুরু করে ইভটিজিংকে কেন্দ্র করে এমন খুন খারাবির মতো কাজের সাথে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে সেটি এখনও পরিষ্কার নয়।

আমাদের পরিবারগুলো কি যথেষ্ট সচেতন এই বিষয়ে? এই সচেতনতা তৈরির কাজটি কারা করবে? এখানে আমি মনে করি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় ভূমিকা আছে। তাদের কাছে অবশ্যই এলাকাভিত্তিক তালিকা থাকার কথা কোথায় কারা অপরাধের সাথে যুক্ত হচ্ছে। কোন ধরনের অপরাধ সেগুলো? কারা আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছে? এগুলো নিয়ে এলাভিত্তিক সচেতনতা তৈরির কাজটি পরিচালনা করতে হবে। মিডিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনাটাও জরুরি।

অপরাধ ঘটলে কেবল গ্রেফতার বা বিচার করলেই কিন্তু এই সামাজিক সমস্যার সমাধান আসবে না। ১২-১৩ বা ১৭-১৮ বছরের একজন কিশোর বা যুবক সবসময় অ্যাডভেঞ্চারে থাকতে পছন্দ করে। এই সময়টাতে তারা বহির্মুখী হয় অনেক বেশি। পরিবারের সঙ্গ থেকে বন্ধুদের সঙ্গকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় তাদের। অনেক সময়ই পরিবারেরও কিছু করার থাকে না কারণ তারা সন্তানের ওপর সবসময় নজরদারি করতে পারেন না।

এখন তাহলে এই সমস্যাকে আটকানো যাবে কেমন করে? আমার মনে হয়, প্রথমেই আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে যে সমাজে কিশোর অপরাধ বেড়ে চলছে অনেক বেশি। গ্যাং কালচার নয়, কিশোর অপরাধ হিসেবেই বুঝতে হবে আমাদের। এই সমস্যাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেই আগাতে হবে। সামাজিক সংগঠনগুলোকে সচল করে তাদের নিয়ে কাজ শুরু করা উচিত।

গ্রামগঞ্জে এ সমস্যা মহামারি আকারে ছড়ানোর আশঙ্কা শহরের চেয়ে অনেক বেশি কারণ গ্রামের অভিভাবকরা শহরের চেয়ে কম সচেতন এবং তাদের সন্তানরা অবাধ্য হয় বেশি। বর্তমান এই ডিজিটাল যুগে গ্রামের ছেলেমেয়েরাও অনেক বেশি এগিয়ে আছে। পিতামাতার তুলনায় সন্তানরা ডিজিটাল মাধ্যমে অনেক বেশি আধুনিক। তাদের হাতের মুঠোয় সবকিছু। গোপন গ্রুপ গড়ে তুলে তারা ইচ্ছামতো কার্যক্রম চালাতে পারে অনায়াসেই যেখানে পরিবারের হস্তক্ষেপ নেই বললেই চলে।

আগামীর বাংলাদেশ নির্ভর করছে এসব কিশোর/যুবকদের ওপর। তারাই টেনে নিয়ে যাবে সব উন্নয়নের চাকা। অথচ এই উন্নয়নের হাতিয়ারকে ব্যবহার করে যদি তারা অপরাধের সাথে যুক্ত হয় তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি এই দেশের, এই সমাজের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যুবকরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তাই এই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে হলে দ্রুত আমাদের কিশোর অপরাধের মতো বিষয়টি জরুরি বিষয় হিসেবে গণ্য করে প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক: অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, কলামিস্ট।

এইচআর/ফারুক/এএসএম

কেন জানি না আমরা এই মারাত্মক বিষয়টি নিয়ে সচেতন হচ্ছি না। টিভি বা অন্য কোনো মিডিয়ায়ও এই কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ নিয়ে তেমন আলোচনা হচ্ছে না। সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও তেমন কর্মকাণ্ড নজরে আসেনি। তাহলে কি আমরা এটিকে সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য তেমন বড় বা ভয়ঙ্কর কিছু মনে করছি না?

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।