রাজনীতি

বিএনপির অস্তিত্বে মিশে আছে ‘পেয়ারে পাকিস্তান’

তাপস হালদার
তাপস হালদার তাপস হালদার
প্রকাশিত: ০১:১২ পিএম, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২

গত ১৫ সেপ্টেম্বর বিএনপি মহাসচিব ঠাকুরগাঁওয়ে বলেছেন, ‘আমরা পাকিস্তান আমলে আর্থিক ও জীবনযাত্রার দিক থেকে এখনকার চেয়ে ভালো ছিলাম।’তার মুখে পাকিস্তান প্রেমের কথা শুনে অনেকে অনেক ধরনের মন্তব্য করছেন। কেউ বলছেন তিনি মুখ ফসকে বলেছেন। আমার ধারণা, তিনি মোটেও মুখ ফসকে বলেননি। অন্তর থেকেই বলেছেন। মির্জা ফখরুল রাজাকারের সন্তান হিসেবে পাকিস্তানের প্রশংসা করবেন, সেটিই তো স্বাভাবিক। তিনি বাংলাদেশের অস্তিত্ব সংকট নিয়ে প্রশ্ন করবেন,পাকিস্তানকে খুশি করবেন এইটা তো হওয়ার কথা।

মির্জা ফখরুল সাহেব তো মূর্খ নন যে তিনি পাকিস্তানের অবস্থা জানেন না, তিনি তো অন্ধ নন বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখেন না। তাহলে তিনি কেন এমন কথা বললেন? তিনি অন্তরজ্বালা থেকেই বলেছেন। বাংলাদেশের উন্নয়কে তারা আর সহ্য করতে পারছেন না। ভেবে ছিলেন বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে। কোলে করে তাদের কেউ ক্ষমতায় বসিয়ে দিবে। সে গুড়েও বালি। এখন হতাশায় ভুগছেন। পাকিস্তান আমলে তো মির্জা ফখরুল সাহেববা সুবিধাভোগী ছিলেন। মির্জা ফখরুল সাহেবের পিতা চখা মিয়া তো ’৭১ সালে কুখ্যাত রাজাকার ছিলেন। তারা তো পাকিস্তানে ভালোই ছিলেন, এটা তো মিথ্যা নয়।

পাকিস্তান অর্থনৈতিক ভাবে খাদের কিনারায় চলে গেছে। আর বাংলাদেশে উন্নয়ন সারা বিশ্বে প্রশংসিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে খোদ পাকিস্তানও প্রশংসা করছে। সেখানে বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানের সাথে তুলনা করা ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বিএনপি বাংলাদেশের একটি রেডিমেড দল। এক গাছের ছাল আরেক গাছের বাকল দিয়ে কিছু আদর্শচ্যুত বাংলাদেশ বিরোধী দলছুট ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিএনপি গঠিত হয়।পাকিস্তানের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই দলটি গঠিত হয়েছিল। এজন্যই পাকিস্তান প্রেম বিএনপির লুকানোর কোনো বিষয় নয়। বিএনপি যতবারই ক্ষমতায় এসেছে ততোবারই পাকিস্তানে বিজয়োৎসব হয়েছে। আর বিএনপিও তাদের প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেছে।

জিয়া ক্ষমতায় গিয়ে বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তান বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রথমেই রাষ্ট্রের জাতীয় চার মূলনীতির উপর আঘাত হানে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে পাকিস্তানি কায়দায় মৌলবাদী রাষ্ট্র তৈরি করতে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করে। যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে ভণ্ডামি শুরু করে। দালাল আইনে যারা গ্রেফতার হয়েছিলো সেই আজিজুর রহমান ও মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে মন্ত্রী করে।

এছাড়া জয়পুরহাটের কসাইখ্যাত আবদুল আলীম মন্ত্রী ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমানকে করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিএনপি দলটি হয়ে উঠে রাজাকার,আলবদর, আলশামসদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে পাকিস্তানকে খুশি করতেই ব্যস্ত হয়ে উঠে বিএনপি। মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’ ১৫ আগস্টই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। পাকিস্তানি কায়দায় বাংলাদেশ বেতার হয়ে যায় রেডিও বাংলাদেশ। জিয়ার মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াও একই ধারা অব্যাহত রাখে। নিজামী ও মুজাহিদদের গাড়িতে বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা দিয়ে ত্রিশ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনদের সম্ভ্রমহানিকে অপমান করেছে বিএনপি।

বিএনপির সাথে পাকিস্তান যোগ সর্বজনবিদিত। যখনই বিএনপি ক্ষমতায় থাকে তখনই পাকিস্তানের আনাগোনা বেড়েছে। বিএনপির আমলে প্রতিটি রাজনৈতিক ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে সহযোগিতা রয়েছে। দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায়ও পাকিস্তানের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। যে গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে সেটাও পাকিস্তান থেকে এসেছে।

তদন্তে দেখা গেছে,যে আর্সেস গ্রেনেড ব্যবহার হয়েছে সেটি যুদ্ধ ক্ষেত্রে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যবহার করে। বিএনপি সময়ে উলফাসহ ভারতের বিছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী গুলোকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগ উঠেছিল সেখানেও পাকিস্তানের মদদ ছিল। ২০০৪ সালে বাংলাদেশে যে ১০ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র ধরা পড়ে সেখানেও পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।

২০১৫ সালে পাকিস্তানের গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল আসাদ দুরআনি সুপ্রিম কোর্টকে বলেছিলেন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশের নির্বাচনে বিএনপিকে টাকা দিয়েছিল। এটি এখন প্রমাণিত সত্য বিএনপি পাকিস্তানের অর্থে পরিচালিত হয়। ১৯৯৩ সালে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান আসিফ নেওয়াজ জানজুয়া মৃত্যুবরণ করলে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল ভেঙ্গে শোক বার্তা পাঠিয়েছিলেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে পাঠানো বার্তায় জানজুয়ার আকস্মিক মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। অথচ ২০০৫ সালের ৩ মে মৃত্যুবরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের মিত্রবাহিনীর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা মারা যান। তখনও খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কিন্তু তিনি তখন কোন শোকবার্তা পাঠাননি।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী বীর সেনানী বন্ধুকে শোক জানাননি অথচ পরাজিত সৈনিকের জন্য শোক জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে কি প্রমাণিত হয়? জগজিৎ সিং অরোরা পাকিস্তানকে পরাজয়ে বাধ্য করেছিলেন বলেই হয়তো খালেদা জিয়া রুষ্ট ছিলেন। খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেছে। যা এতোদিন একমাত্র পাকিস্তানিরাই করেছে। খালেদা জিয়া তাদের দাবিকেই মান্যতা দিয়েছে।

বিএনপির প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান তিন প্রজন্মের নেতার আদর্শ ও উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন। বিএনপি জন্মের মূলেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাদ দিয়ে পাকিস্তান আদর্শকে ধারণ ও লালন করা। এখান থেকে বের হয়ে আসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে তাদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যাবে।মনে রাখতে হবে, যারা বাংলাদেশকে চায়নি,বাংলাদেশের অস্ত্বিত্বকে অস্বীকার করে, মৌলবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে চায় তাদেরই প্রতিনিধিত্ব করে বিএনপি।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানব উন্নয়ন, মাথাপিছু সহ প্রতিটি সূচকে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে পাকিস্তানেরও সাবেক ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরা বাংলাদেশের প্রশংসা করছে। পাকিস্তানের পার্লামেন্টেও বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে উচ্ছ্বসিত আলোচনা হয়েছে। গণমাধ্যম গুলো নিবন্ধ প্রকাশ করেছে।সেখানে পাকিস্তানের তুলনা বেমানান। বাংলাদেশের অগ্রগতি, সাফল্য,উন্নয়ন ও অর্জন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত, সেখানে ফখরুল সাহেবের বক্তব্য অন্তরজ্বালা ছাড়া কিছুই নয়।

প্রকৃতপক্ষে বিএনপি মহাসচিব তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও নেতা তারেক রহমানের কথাই বলেছেন। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে না। হৃদয়ে পাকিস্তানের আদর্শকেই লালন করে। সেজন্যই মনের কথাটাই বলে ফেলেছেন। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বিএনপি বাংলাদেশকে ধারণ করতে পারেনি। তাদের অন্তরে এখনো রয়েছে পেয়ারে পাকিস্তান। মির্জা ফখরুল সাহেবের বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য,সম্প্রীতি বাংলাদেশ।
[email protected]

এইচআর/এমএস

পাকিস্তান অর্থনৈতিক ভাবে খাদের কিনারায় চলে গেছে। আর বাংলাদেশে উন্নয়ন সারা বিশ্বে প্রশংসিত। শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে খোদ পাকিস্তানও প্রশংসা করছে। সেখানে বাংলাদেশে বসে পাকিস্তানের সাথে তুলনা করা ধৃষ্টতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।