Jago News logo
Banglalink
ঢাকা, শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৭ | ১৬ বৈশাখ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

আগুন, আগুন!


শান্তা মারিয়া

প্রকাশিত: ১০:১২ এএম, ০৮ জানুয়ারি ২০১৭, রোববার
আগুন, আগুন!

এই লেখাটি পড়ার আগেই একটু রান্না ঘরের দিকে যান প্লিজ। রান্নাঘরটি হতে পারে বাড়ির বা অফিসের। গিয়ে দেখুন আপনার গ্যাসের চুলা অকারণে জ্বলছে কি না। যদি অকারণে জ্বলে থাকে তাহলে সেটি নিভিয়ে দিয়ে তারপর বসুন। আপনি অফিসের বড়কর্তা হলে এ পর্যায়ে আমার উপর বিরক্ত হয়ে বলতে পারেন, ‘কি, আমি অফিসের উচ্চ পদস্থ মানুষ। আমি কি পিওন যে রান্নাঘরে যাবো?’ বিরক্ত হোন আর না হোন, অকারণে গ্যাস পুড়ে যে ক্ষতি হচ্ছে তার দায়ভার কিন্তু আপনার উপরেও পড়বে।

আমরা এমন এক জাতি যে নিজেদের সম্পদ নিজেরা রক্ষা করতে পারি না। আমরা মহাস্থানগড়ের ইট খুলে নিয়ে যাই গোয়ালঘর তৈরির কাজে ব্যবহার করার জন্য। আমরা জাতীয় সম্পদ গ্যাস পুড়িয়ে অকারণে চুলা জ্বালিয়ে রাখি একটা ম্যাচের কাঠির খরচ বাঁচানোর জন্য। শীতকাল আসলেই চারিদিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। পুড়ে যায় শত শত কোটি টাকার সম্পদ। শীতে অনেক জায়গাতেই সারা দিনরাত চুলা জ্বালিয়ে রাখা হয় ঘর গরম করার জন্য। আবার অনেক সময় চুলার উপর ভেজা কাপড় টাঙিয়ে রাখা হয় শুকানোর জন্য। সবগুলো কাজই অতি বিপদজনক।সেইসঙ্গে গ্যাসের মতো মূল্যবান সম্পদ পোড়ানোর অমার্জনীয় অপরাধও সংঘটিত হয়। শহরে নতুন প্রজন্মের মানুষ কেরোসিনের চুলা দেখেনি। তাই তারা ভাবতে পারবে না গ্যাস ছাড়া চলা কি কষ্টকর।

আমি খুব ছোটবেলায় কেরোসিনের স্টোভ দেখেছি। তখন দেখেছি কেরোসিনের দাম বাড়ানোয় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। দেখেছি কেরোসিনের মজুত করে বাজার থেকে সেটা আউট করে দেওয়ার চক্রান্ত। ব্লাক মার্কেটে কেরোসিন চড়াদামে বিক্রির খেলাও দেখেছি। গ্রামে আরও দেখেছি লাকড়ির চুলায় রান্নার ঝামেলা। ধোঁয়ায় চোখ মুখ লাল হযে যায়। গ্যাস আসায় অসংখ্য মানুষ সেই দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পায়। কিন্তু সেই মহাসম্পদকে রক্ষার বেলায় গত চল্লিশ বছরে আমরা বড় উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছি। গ্যাসের বিল যেহেতু নির্ধারিত তাই গ্যাস যতই পুড়ুক আমাদের কারও কিছু তাতে আসে যায়নি। ম্যাচের কাঠি বাঁচানোর জন্য গ্যাসের আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এমনও অনেক বাড়ি রয়েছে যেখানে দিনে রাতে চব্বিশ ঘণ্টায় চুলা নেভানো হয়নি। অবৈধ সংযোগ নেয়া হয়েছে। এক সংযোগ দেখিয়ে দশটা পয়েন্টে গ্যাস নেয়া হয়েছে।

সামান্য টাকা বাঁচানোর জন্য আমরা অনেক বড় ক্ষতির রাস্তা খুঁড়েছি। গ্যাসের অবৈধ সংযোগ, গ্যাসের অপচয়, নিন্মমানের পাইপ ব্যবহার সবকিছু মিলে বিপদকে বলতে গেলে ডেকেই এনেছি। একদিকে অমূল্য জাতীয় সম্পদ নষ্ট হয়েছে অন্যদিকে বেড়েছে আগুন লাগার ঝুঁকি। গ্যাসপাইপ বিস্ফোরণে ঝরে গেছে অনেক অমূল্য প্রাণ। শুধু গ্যাস থেকে নয়, শীতকালে আরও অনেক রকম অসাবধানতায় লাগছে আগুন। মশার কয়েল জ্বালিয়ে রেখে ঘুমানো একটি বিপদজনক কাজ। আর মশারির ভিতরে সিগারেট হাতে নিয়ে যে ধূমপায়ীরা শুয়ে থাকেন তাদের উদ্দেশ্যে শুধু একটি কথাই বলা যায়, ‘এত বেয়াক্কেল মানুষ হয় কিভাবে?’

শীতকালে আগুন তাপানো, মাটির মালশায় আগুনকে নিভুনিভু করে রাখা, কাগজ ও খড়কুটো জড়ো করে আগুন জ্বালানো-অসাবধানতায় সবকিছু থেকেই ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ‘না নেভানো’ বিড়ি সিগারেটও অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ। শুকনো মৌসুমে আমাদের দেশে তো বটেই, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বনে জঙ্গলে দাবানল সৃষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ ‘না নেভানো’ সিগারেট বা চুরুট। আগুন যেন না লাগে সেদিকে সচেতনতার পরিচয় দিলে নিজের এবং অনেক মানুষের জীবন বাঁচে। দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় বহুমূল্যবান সম্পদ। আর আগুন লাগলে সেটা যেন দ্রুত নিভিয়ে ফেলা যায় সেই ব্যবস্থা প্রয়োজন মতো আছে কি না সেটাও তো দেখা দরকার।

এবার গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীরা ফায়ার ব্রিগেডের অবহেলার অভিযোগ করেছেন। অন্যদিকে ফায়ার ব্রিগেড বলেছে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নগরীতে পানির উৎসের অপ্রতুলতা। এর আগে কাওরান বাজারের অগ্নিকাণ্ড, তাজরিনের অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি ফায়ার ব্রিগেড দ্রুত আগুন নেভাতে মোটেই সক্ষম নয়। ডিএনসিসি মার্কেটেও আগুন নেভাতে তাদের অনেক বেশি সময় লেগেছে। দ্রুত আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার ব্রিগেডের সামর্থ্য বাড়ানো দরকার। দরকার ফায়ার ব্রিগেডকে আধুনিক করে গড়ে তোলা। সেইসঙ্গে কর্মীদেরও দরকার উন্নততর প্রশিক্ষণ। বিদেশ থেকে আরও উন্নত সরঞ্জাম আনতে হবে যাতে দ্রুত আগুন নেভানো যায়। সেইসঙ্গে প্রতিটি বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক কেন্দ্র, হাসপাতাল সহ সব জায়গায় অগ্নি নির্বাপক সরঞ্জাম থাকতে হবে।

আর ফায়ার ব্রিগেড যে সমস্যার কথা জানিয়েছে, সেটাও ভেবে দেখার মতো। আজ থেকে ত্রিশ, চল্লিশ বছর আগে প্রতিটি পাড়ায় মহল্লায় বড় পুকুর বা দীঘি ছিল। ছিল খাল বিলও। কিন্তু জমি দখলের হুজুগে আমরা কবেই সেসব জলাশয়ের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছি। আর জলাশয়ের মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর সাথে সাথে আমরা সর্বনাশ ডেকে এনেছি নিজেদেরই। বিশেষ করে এ সমস্যাটা হয়েছে ঢাকায়। ঢাকার কোনো পুকুর দীঘি তো মনে হয় আমরা ভরাট করে বাড়ি তুলতে বাকি রাখিনি। যেগুলো এখনও টিকে আছে সেগুলোরও মুমূর্ষু অবস্থা। আগুন লাগলে প্রচুর পরিমাণে পানি  খুঁজে পাওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। শহরের প্রতিটি পাড়ায় মহল্লায় পাবলিক জলাশয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার। যেগুলো আছে সেগুলোর সংস্কার করতে হবে। প্রয়োজনে নতুন জলাশয় সৃষ্টি করতে হবে। এই বিশাল কাজ তো ব্যক্তি উদ্যোগে হবে না। সেজন্য সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ দরকার। আর পুরান ঢাকায় অবৈধ জুতার কারখানা এবং অন্যান্য কারখানা যেখানে দাহ্য পদার্থের ব্যবহার হয় সেগুলো উচ্ছেদ করা দরকার দ্রুত। পুরানো ঢাকায় সরু গলির ভিতর এসব কারখানা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। নিমতলীর আগুনের কথা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি।

আগুন থেকে বাঁচতে হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এদিকটায় সরকারের মনোযোগ এবং প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা জরুরি। অতি জরুরি।  

লেখক : কবি, সাংবাদিক।
shantamariavalia@gmail.com

এইচআর/এমএস

আপনার মন্তব্য লিখুন...