‘ব’ তে বিনোদন ‘ব’ তে বিরক্ত


প্রকাশিত: ১০:১৪ এএম, ০৯ জানুয়ারি ২০১৭
‘ব’ তে বিনোদন ‘ব’ তে বিরক্ত

ছোট বেলাকার একটা বিজ্ঞাপন এখনো মাথায় গেঁথে আছে। আধ কেজি পানিতে এক মুঠো গুড় আর এক চিমটি লবণ। তারপর দেবেন ঘুটা..ঘুটা…। আমি জানি চট করে প্রায় সবারই এই বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়েছে। কারণ তখন এই বিজ্ঞাপন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল, যাকে বলে মার্কেট পাওয়া। এত বছর পর এই লাইন খুব মাথায় ঘোরে ইদানিং। কেন, সেই গল্প বলি।

দৃশ্যপট-১
কোনো চ্যানেল বাজারে আসার গুঞ্জন যখন শুরু হয় মিডিয়া পাড়ায় বিশেষ করে মিডিয়া কর্মীদের মধ্যে সাড়া পড়ে যায়। কে হচ্ছেন সেই চ্যানেলের মাথা, কে বা কারা হবে সেই টিমের অংশ আলোচনা, গল্প ডালপালা মেলে বিস্তর। দিন শেষে দেখা যায় অতি পরিচিত এক মাথার সাথে পরিচিত-অপরিচিত মিলিয়ে এক টিম। তবে এতেই থামে না আলোচনা, ডালপালাসহ সেই আলোচনা ছড়ায় অলিগলি থেকে এসি অফিস রুম পর্যন্ত। না জানি কি চমক নিয়ে আসছে সেই চ্যানেল। বাইরের চেয়ে ভেতরের উত্তেজনা তখন আরো কয়েকগুণ বেশি। এই করবো সেই করবো, সবার চেয়ে আলাদা। দর্শকের চোখ ট্যারা হয়ে যাবে দেখে। আমরা এক নম্বর। দারুণ দারুণ সব প্রত্যাশার খবর। কিন্তু একটা চ্যানেল যখন দেখতে পায় দর্শক। সেখানে আধা কেজি নিউজ, এক মুঠো টক শো আর এক চিমটি ভিন্ন কিছু অনুষ্ঠান তার পর ঘুটা ঘুটা।

দৃশ্যপট -২
আন্দোলনে আছেন অভিনয় শিল্পীরা। বিদেশি সিরিয়াল দেখানো যাবে না এই দেশে। এসব সিরিয়ালের কারণে দর্শক নিজেদের অনুষ্ঠান দেখা বন্ধ করেছে। খুবই যৌক্তিক কথা। লোকে এই দেশের টিভি দেখা প্রায় বন্ধ করেছে। কেবল কি বিদেশি অনুষ্ঠান প্রচার হয় বলে? এই দেশের ঘরে ঘরে নারীদের প্রায় সকলের মুখস্থ রিমোটের কয় নাম্বার বাটনে ভারতীয় কোন চ্যানেল চলে। কেমন করে সম্ভব সেটি?! কারণ সেই চ্যানেলগুলো প্রতিদিন যে কেবল দেখা হয় তাই-ই নয়, একই জিনিস এর রিপিটও দেখে তারা। ঘরে ঘরে সিরিয়ালের নাম কেবল না, তার নায়ক নায়িকার নাম তাদের পোশাক পর্যন্ত মুখস্থ। আর আমার দেশের চ্যানেলগুলোর অবস্থা? সবাই না হোক অন্তত ৬০% দর্শক দেখে এমন একটা নাটকের নাম বলতে পারবেন বা অনুষ্ঠান? আচ্ছা সবারটা বলতে হবে না, চট করে আপনি ভাবুন তো বাংলাদেশের চ্যানেলগুলোতে প্রচার হয় এমন একটা নাটকের নাম। আপনি মনে করতে থাকুন আমি একটু ঘুরে আসি।

দৃশ্যপট-৩
তো চ্যানেলগুলোর এমন ঘুটা ঘুটা অবস্থা নিয়ে প্রতিনিয়ত হতাশ দর্শক। প্রতি চ্যানেলে একই টক শো। কেবল একই টক শো যে তাই-ই নয়। একই অতিথি এবং একই উপস্থাপক। বছরের পর বছর। না এই দেশে কোনো নতুন জ্ঞানী তৈরি হয়, না নতুন কোনো উপস্থাপক। এক জিনিস কত দেখতে পারবেন আপনি? কত দেখতে পারবে দর্শক? প্রতি রাতে টক শো’র মেলা। একটা টক শো শেষ করে অন্য চ্যানেলে যাবেন দেখবেন একই অতিথি সেই চ্যানেলেও। মাঝে মাঝে দেখা যায় দু’টো চ্যানেলে একজনই কথা বলছে। চোখে ভুল দেখছি ভেবে আবার আগের চ্যানেলে গিয়ে দেখি একটি লাইভ, আরেকটি আগে রেকর্ড করা। কই যাই।

এই যে টক শো করতেই হবে এটা কোথায় লেখা আছে? এটা তো বেদ বাক্য না যে পরিবর্তন সম্ভব না। আর সব চ্যানেলে কেন টক শোই চলতে হবে কে জানে সেই উত্তর? প্রোগ্রাম চ্যানেলে গান, নাচ, ম্যাগাজিন, কত শত জিনিস আছে দেখানোর। তারা কেন টক শো দেখাবে? কেন তাদের প্রতি ঘণ্টায় নিউজ দেখাতে হয়? ইনফ্যাক্ট কেন নিউজই তাদের দেখাতে হয় কে বলবে? তাহলে নিউজ চ্যানেল গুলোতে কি চলবে? কেউ কি ভাবেন আসলেই একটা নীতি দরকার কে কি চালাবে তার? শুনি আরো চ্যানেল আসবে। আতঙ্ক লাগে আবারো সেই ঘুটা সিস্টেম চলবে। একটা দেশে যে স্পোর্টস চ্যানেল হতে পারে, বাচ্চাদের চ্যানেল চলতে পারে, প্রকৃতি দেখা যেতে পারে, এডুকেশন চ্যানেল চলতে পারে কেউ কি মাথায় আনবে? একটু মুক্তি দেবেন দর্শককে স্যালাইনের এক ঘেরাটোপ থেকে?

দৃশ্যপট-৪
আবারো ফিরি আন্দোলন নিয়ে। ভারতের সকল চ্যানেল এই দেশে দেখা যায়। আমাদের ২৬ টা চ্যানেল হয়তো দেশের সব জায়গায় দেখতে পাবেন না। কিন্তু ভারতীয় চ্যানেল সব জায়গায় ঝকঝকা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ সরূপের সাথে আলোচনার সুযোগ হয়েছিলো। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম আমাদের চ্যানেল এইখানে দেখা যায় না কেনো? ভারতীয় সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার কারণ কি? তিনি জানেনই না বাংলাদেশে তাদের সব চ্যানেল দেখা যায় এবং আমাদের কোনো চ্যানেল ভারতে দেখা যায় না। তিনি স্পষ্টতই জানালেন, এই বিষযে ভারত সরকারের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। সেখানকার কেবল অপারেটররাই বাংলাদেশের চ্যানেল ডাউনলিংক করেন না। আতিরিক্ত ফি তো বটেই। তারা তাদেরই চ্যানেল দেখাতে চায় জনগণকে। বিজ্ঞাপনের বাজার রাখতে চায় নিজেদেরই দখলে। ৪ শ রও বেশি চ্যানেল সেই দেশে। কেবল লাভজনকই যে তাই নয় কিন্তু, ব্যবসা করে অনেক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান খুলছে একেকটি চ্যানেল। আর আমাদের দেশে ২৬ টা চ্যানেল ব্যবসা করতে পারছে না। কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না। অদ্ভুত অবস্থা।

দৃশ্যপট-৫
কেবল চ্যানেল বন্ধ করলেই দর্শক আমাদের চ্যানেল দেখবে তা কি আসলেই ঠিক? গুরু বলেন- কেউ যখন তোমাকে ছেড়ে চলে যায় তুমি বুঝবে ঘাটতি তোমার মধ্যে, অন্যর চেহারা এসিডে ঝলসে বা অন্যকে অত্যাচার করে নিঃশেষ করে দিলেই সে তোমার কাছে ফিরবে না। নিজেকে বদলাও, সেটাই ভালোবাসা ফিরে পাওয়ার উপায়। কিন্তু নিজেকে বদলাতে হলে তো অন্তত নিজের দিকে তাকাতে হয়। এই দেশে কোনো অভিনয় শিল্পী কি তার সহকর্মীদের কাজ দেখেন? মনে হয় না। আমার ধারণা নিজের কাজও দেখেন না। ঈদের সময় শুনি গরুর হাটের মতো নাটকের হাট। কোনো কোনো শিল্পী ঈদ উপলক্ষ্যে নাকি ২০টা নাটকও করেন। কয়টা নাটক তিনি দেখবেন? যে নাটক নিজে দেখতে পারেন না তা দর্শক দেখবে, কেমন করে ভাবেন তারা কে জানে?

কোনো মডেল দেখতে সুন্দর বলেই তাকে নাটকে দাঁড় করিয়ে দিলেন সে না পারে কথা বলতে না পারে অভিনয়। কিন্তু দর্শক বাধ্য হয় তাকে দেখতে। কারণ সকল চ্যানেল আর সকল প্রযোজকের তাকে নিয়ে টানাটানি। গায়ক, খেলোয়াড় যাকে পান তাকে দিয়েই নাটক করাবেন আর দর্শক দেখবে ,কেন বলেন তো? একজন কোনো ভাবে হিট হয়ে গেলো তো তাকে দিয়ে নাটক তো নাটক ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, গানের অনুষ্ঠান এমনকি রান্নার অনুষ্ঠান পর্যন্ত করতে হয়। দেখতে দেখতে সব তিতা। আর নাটকের কাহিনী? সে কথা কি বাদ দেয়ার মতো? কোথাও কি কোনো নাটক প্রচারিত হয় যেটি আপনি পরিবার নিয়ে দেখতে পারবেন?  ভারতের সিরিয়াল অসম্ভব জনপ্রিয় কারণ প্রতিটি সিরিয়াল গড়ে উঠে পারিবারিক কাহিনী থেকে। এই দেশের নাটক আজ রবিবার, সংশপ্তক, বহুব্রীহি বা কোথাও কেউ নেই দারুণ সব পারিবারিক গল্প। এইসব পারিবারিক কাহিনী থেকে যখন আমরা বিশ্ববিদ্যালয আর গাছ তলায় নায়ক নায়িকার প্রেম এ নেমে এসেছি তখন কয়জন দেখবে তা?

কেবল মিডিয়া কর্মী হিসেবে নয় দর্শক হিসেবেই জানি তাকানো যায় না আমাদের চ্যানেল গুলোর দিকে। বিবিসি, সিএনএন সহ প্রায় প্রতিটি আন্তর্জাতিক চ্যানেল বছর শেষে জরিপ করে কি দেখতে চায় দর্শক সেই জরিপের ফল দেখে তারা নতুন বছরে নতুন করে সাজায় তার চ্যানেলটি। আর আমরা? আমরা কি জানতে চাই দর্শকের কাছে কি চান তারা? এখনো সময় আছে পরিবর্তনের। এখনো শক্ত একটা ইন্ড্রাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়ানোর সময় বয়ে যায়নি।একে অন্যের নকল না করে একটু ভাবলেই ভালো কিছু তৈরি হয়,  হয় নতুন কিছু। পাঁচ বছর আগে একাত্তর টেলিভিশন এসেছিল সবকিছু লাইভ সম্প্রচারের ধারণা নিয়ে। একুশে টিভির পর সেটি একটি চমক ছিল। আবার একটা চমকের প্রয়োজন। আমরা কেবল ভারতীয় নয়, অনেকের চেয়েই মেধাবী। চাইলেই আমরা পারি। আমরা পারি তা দেখানোর সময় এখনই।দর্শকের সারিতে বসে আমি অপেক্ষায় আছি। আমি জানি আমার সাথে আছে কোটি মানুষ।

লেখক : সাংবাদিক, টিভি-উপস্থাপক।

এইচআর/এমএস