ইরমা এবং আমরা

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
প্রকাশিত: ১২:১৬ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭
ইরমা এবং আমরা

“তোমাকে কষ্ট করে এ দুঃসময়ে হাসপাতালে আসতে হলো। তোমার এবং তোমার পরিবারের এ অবদান আমরা কখনোই ভুলবো না।” হাসপাতালে ঢোকার মুখেই বড়কর্তা জেফ একথা বলে আমাদের ধন্যবাদ জানালো। আমার সাথে আমার পুরো পরিবার। অভ্যর্থনা জানাতে ছুটে এলো হাসপাতালের নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি জানালেন আমাদের পরিবারকে থাকবার জন্য একটি কামরা দেয়া হয়েছে। হ্যারিকেন “ইরমা” ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। আসলে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের এ চরম বিপদের দিনে এখানকার স্বাস্থ্য বিভাগ সকল জরুরি সেবাদানকারী চিকিৎসকদের হাসপাতালে থাকবার জন্য একটি নির্বাহী আদেশ দিয়েছে। আমাদের না এসে উপায় নেই। তারপরও জেফের কাজ জেফ করছে। এসব সৌজন্যের জন্য পয়সা লাগে না। হ্যারিকেনের পুরো সময়টাই এখানে থাকতে হবে।

আমার বাড়ি ছেড়ে আসতে কষ্ট হচ্ছিলো। আমার তের বছরের ছেলে বাসা থেকে বের হবার আগে পিয়ানোতে বসে খানিকটা সুর তুলল। আমার মনটা আরো ভারী হয়ে গেলো। অথচ হাসপাতালে ঢোকার পর মনটা ভাল হয়ে গেলো। আমার পরিচিত আরো অনেক সহকর্মী চিকিৎসক তাদের পরিবার নিয়ে এসেছেন এখানে। খানিকটা উৎসব উৎসব ভাব। পেছনে সবার উৎকণ্ঠা। তবে সবাই এ সময়টা ভালোভাবে কাটাতে চান। আমাদের সব সহকর্মীদের কাজ শেষ করে ঘরে ফেরার রাশ থাকে প্রতিদিন। আমরা কেবল সৌজন্য বিতরণ করি প্রতিদিন। আজ আমাদের কাজের পর ঘরে ফেরার রেশ নেই। ঘর এখানেই। হাসপাতালের সবার জন্য “অসিওলা ক্যাফে” পুরো সময় খোলা থাকছে। খাবার দাবার, চা- কফিসহ সব ধরনের খাবারের ছড়াছড়ি। আমাদের জন্য আড্ডা দেবার ও বিস্তর জায়গা আছে। শিশু কিশোরদের জন্য বিনোদনের আলাদা এলাকা।

সন্ধ্যের পর পরই ঝড়ের বেগ বাড়তে থাকলো। সাথে তুমুল বৃষ্টি। সাইরেন বেজে উঠলো টর্নেডো আসছে বলে। উদ্বেগ, সংশয় আর উৎসুক মন নিয়ে জানালার বাইরে তাকাচ্ছি সবাই। আড্ডা চলছে। পাশাপাশি রুগীর সেবা প্রদানও চলছে। হাসপাতাল ভবনটি এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এটি সবচাইতে শক্তিশালী হ্যারিকেনেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। মাঝ রাতে হ্যারিকেনের জোর বাড়তে লাগলো। আমরা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমাদের কামরাতে ঢুকেই দেখি মেঝে পানিতে একাকার। হ্যারিকেনের প্রবল বাতাস আর পানির ঝাপটা জয় করে নিয়েছে মানুষের তৈরি এ ‘শক্তিশালী’ ভবন। আমাদের কামরাটা ছেড়ে দিতে হলো। আমরা হাসপাতালের এক কোনায় আমার পুরো পরিবারের সাথে বসে আছি। অপেক্ষা করছি অন্য একটি কামরাতে যাবার জন্য।

হ্যারিকেনের গর্জন শুনছি আমরা। সবাই নিরব। আমার সহধর্মিণী নিরবতা ভেঙে বলল, “ দেখ, জীবন কখন কোথায় কেমন করে আমাদের নিয়ে যায়। আমরা কেবল খেলার পুতুল।” দেশ বিদেশ থেকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন অবিরাম খবর নিচ্ছেন। তারা ক্যাবল চ্যানেল দেখছেন আর আতঙ্কিত হয়ে আমদের জন্য প্রার্থনা করছেন। আমরা ভাগ্যবান। আধো জাগা-আধো ঘুমে রাত কাটল। হ্যারিকেনের তেজ কমেছে এরই মধ্যে।

ভোরের আলো ফুটবার আগেই প্রার্থনা ঘরে হাজির হলাম। আমাদের শল্য চিকিৎসক জাইদ নামাজ পড়ছে সেখানে। নামাজ শেষে ক্যাফেতে বসে চা খেতে খেতে নতুন এক মানুষকে জানলাম আজ। জাইদ জন্মেছিলো ইরাকে। তাঁর বাবার জন্ম প্যালেস্টাইনে। বাবাও ছিলেন একজন চিকিৎসক। প্যালেস্টাইনে থেকে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে এসেছিলেন ইরাকে। সেখানে তাঁর মার সাথে পরিচয়। মা ছিলেন একজন কুর্দি মুসলমান। বাবা ভাগ্যক্রমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে এদেশে চলে আসেন। নতুবা সাদ্দাম হোসেনের ‘বাথ পার্টির’ হাতে তাঁকে হয়তো জীবন দিতে হতো। জাইদ সারা জীবন দেখেছে তাঁর বাবা কিভাবে প্রাণ হাতে করে এ দেশ থেকে ও দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ওর বাবার মতো তার জীবনও প্রবাহমান পাহাড়ি নদীর মতন। নেভাদার ছোট এক শহরে বড় হয়েছে সে। তারপর বোস্টন, নিউ ইয়র্ক হয়ে ফ্লোরিডাতে।

আমি নীরবে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম। জাইদ মনে করে আমাদের কোন দেশ নেই। নেই কোন ভবিৎষত। আমরা কেবল চলছি। কেবল মুসাফিরের মতো। এসব হ্যারিকেন কেবল একটা ছোট্ট অধ্যায়। একটি উপলক্ষ। সব রোগী দেখা শেষ করে বিকেল নাগাদ হাসপাতাল থেকে বেরিয়েছি। সারা অরলান্ডোতে কার্ফু চলছে। পথে দুবার পুলিশের গাড়ি আটকে দিলো আমাকে। আমার পরিচয়পত্র দেখে ধন্যবাদ দিয়ে ছেড়ে দিলো আমাদের।

irma

আমার চেনা শহর অচেনা মনে হচ্ছে। রাস্তার ওপর পড়ে আছে বড় বড় গাছের গুঁড়ি। ছোট খাট বন্যা রাস্তা জুড়ে। ট্রাফিক লাইটগুলো নিভে গেছে। একটি যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গেছে এ সুন্দর শহরটি। আমি আমার পরিচিত রাস্তা চিনতে পারছি না। আমাদের বাসার মাইলখানেক দূরে রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ। বিশাল গাছের গুঁড়ি। কোত্থেকে কজন দেবদূতের মতো মানুষ এসে নিমিষেই গাছটা কেটে কুটে সরিয়ে ফেলল। আমরা কেবল ধন্যবাদ বলে বিদায় নিলাম। আমাদের বাসার সামনে বন্যা। দীঘির পানি উপচে পড়ছে। আমাদের সাজানো বাগানের অনেক গাছই উপড়ে গিয়েছে। আম, কাঁঠাল, জামরুল, কলা, সবেদা সব গাছ। দীঘির জলে পদ্মার প্লাবন এসেছে। সে প্লাবনে ভেসে গিয়েছে আমার ঘাট আর ঘাটে বাঁধা নৌকো।

আমরা বিষণ্ণ হয়ে ঘরে ঢুকলাম। আমার তের বছর বয়সের ছেলে বলে উঠলো, “ আমাদের ঘরটার কোন ক্ষতিই হয়নি।” এই বলেই সে পিয়ানো বাজানো শুরু করলো। পিয়ানোর সুরের মূর্ছনাতে আমার সব ক্লান্তি, দুঃখ মুছে গেলো। জানালা দিয়ে দীঘির অশান্ত জলে কাল মেঘের মাঝে সূর্যের আলোর দেখা পেলাম। আমার মনটা আনন্দে ভরে গেলো। “ I will hold beauty as a shield against despair, When my heart faints I will remember sights like these… Then surely there is something more than this Sad maze of pain, bewilderment and fear- And if there’s something, I can still hope on.” (Elsie Robinson)

লেখক : পরিপাকতন্ত্র ও লিভার বিভাগীয় প্রধান, ফ্লোরিডা হাসপাতাল, ফ্যাকাল্টি, কলেজ অব মেডিসিন, সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটি।

এইচআর/পিআর

হ্যারিকেনের গর্জন শুনছি আমরা। সবাই নিরব। আমার সহধর্মিণী নিরবতা ভেঙে বলল, “ দেখ, জীবন কখন কোথায় কেমন করে আমাদের নিয়ে যায়। আমরা কেবল খেলার পুতুল