আমারে শোয়াইয়া দিয়া ডাক্তার সাহেব কোথায় গেলেন?

মোকাম্মেল হোসেন
মোকাম্মেল হোসেন , সাংবাদিক, রম্যলেখক
প্রকাশিত: ১০:২৬ এএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ১০:২৮ এএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
আমারে শোয়াইয়া দিয়া ডাক্তার সাহেব কোথায় গেলেন?

ঈদে বাড়ি গিয়ে ছোটখাট দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। বিপরীত দিক থেকে আসা এক মোটরসাইকেল আরোহী রাস্তার মোড় ঘোরার সময় মনের সুখে আমার ডান পায়ের হাঁটুর নিচে গুঁতা মেরে বসল। বরফ ঘষাঘষি করে, ব্যথানাশক বড়ি খেয়ে ভেবেছিলাম, তার সুখের মূল্য শোধ করে ফেলেছি। ঢাকায় ফেরার পর হাঁটুর নিচে ছোট ‘গেটিস’ দেখে বুঝতে পারলাম, আমার ধারণা ভুল। গেটিস দেখে আলতাবানু ভয় পেয়ে গেল।

বলল-
: শিগগির ডাক্তারের কাছে যাও।
পাত্তা না দিয়ে বললাম-
: ধুরউ! এইটা অতি মামুলি বিষয়। ভয়ের কিছু নাই!
: ভয়ের কিছু নাই মানে? তুমি কী মরবার চাও?
: এই ধরনের রোগে কেউ মরে না। তবে ল্যাংড়া হওয়ার একটা চান্স আছে।
: ল্যাংড়া হইলে খুব ভালা হয়, তাই না?
: অনেক ল্যাংড়া ফকিরের ঢাকা শহরে একাধিক বাড়ি আছে।
: তুমিও ভিক্ষার থালা হাতে নিতে চাও?
: অসুবিধা কী? বিনা পুঁজি ও বিনা পরিশ্রমে হাতে একটা ভাঙা থালি আর মুখে ‘হায় আল্লাহ তুই সোবাহান’ আওয়াজ তুইল্যা যারা ভিক্ষা করতেছে, তাদের জীবন আমাদের চাইতে অনেক বেশি ফুরফুরা। সবচাইতে বড় কথা হইল, ভিক্ষাবৃত্তি আমাদের জাতীয় পেশা। দেখ না, বিদেশিরা ভিক্ষা দিলে আমরা খুশি হইয়া সংবাদ সম্মেলন করি, আর ভিক্ষা না দিলে বেজার হইয়া বলি, বেটারা পাঁজি হইয়া গেছে। আগের মতো খয়রাত দেয় না।
: আজাইরা প্যাচাল বাদ দিয়া ডাক্তারের কাছে যাও।
: হুঁ।
: হুঁ কী? আজই যাবা।
: আইচ্ছা।
বাসার কাছেই জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, আম-জনতার কাছে যা ‘পঙ্গু হাসপাতাল’ নামে পরিচিত। আলতাবানুর পীড়াপীড়িতে সেখানে পৌঁছে টিকিট কাউন্টারের তালাস করছি, এক লোক জানতে চাইল-
: ছার, রোগি আছে নাকি?
: আমিই রোগি।
লোকটা সন্দেহের চোখে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিরীক্ষণ করছে দেখে বললাম-
: কোনো মানুষ হাঁটুভাঙ্গা ‘দ’ হইয়া না আসলে এই হাসপাতালে কি তারে রোগি হিসেবে কাউন্ট করা হয় না?
: না, ঠিক তা না।
: আপনে কী করেন?
: আমি একজন ভলেন্টিয়ার।
: বুঝলাম না।
: বিভিন্ন জায়গা থেইকা এই হাসপাতালে যেসব রোগি আসে, প্রয়োজন অনুসারে আমি তাদের দিকে সাহায্যের হাত প্রসারিত করি।
: কী রকম!
: এই যেমন ধরেন, এই হাসপাতালের চাইতে বাইরে যেসব ক্লিনিক আছে, সেইখানে আরও উন্নত, আরও আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, এই কথা রোগি ও তার সঙ্গে আসা লোকজনদের বোঝাইয়া বলি। যারা রাজি হয়, সময় নষ্ট না কইরা তাদের ক্লিনিকে পুনর্বাসন করি।
: বাইরের ক্লিনিকে কি এই হাসপাতালের চাইতেও ‘বড় ডাকতররা’ রোগি দেখেন?
: না। এই হাসপাতালের ডাক্তাররাই প্রাইভেটে সেবা দেন।
: তার মানে সকালবেলা এই হাসপাতালে বইসা যেসব ডাক্তার চা-পান খায়, বিকালবেলা তারাই ক্লিনিকে গিয়া কল্কি সাজায়।
: অনেকটা এইরকমই।
: আমারে এখন বলেন, ডাক্তার যদি এক হয়, তাইলে ওইসব ক্লিনিকে হাসপাতালের চাইতে উন্নত চিকিৎসা কী কইরা হয়?
আমার কথা শুনে লোকটা একটুও দমল না। বলল-
: এইখানের পরিবেশ তো নিজের চোখেই দেখতেছেন। এই পরিবেশে কি মন দিয়া চিকিৎসা করা যায়? মনোযোগ সহকারে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে হইলে নিরিবিলি পরিবেশ দরকার।

হাসপাতালে যে মন দিয়ে চিকিৎসা করা যায় না, একটু পরেই তার প্রমাণ পেলাম। টিকিট কেটে দায়িত্ব পালনরত ডাক্তার মহোদয়ের কক্ষে প্রবেশ করেছি। ডাক্তার সাহেব চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে দু’হাত মাথার ওপর তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন; হাই তুললেন। এরপর মুখে কোনো কথা না বলে মাছের মতো পানিতে ঢুঁশ মারার ভঙ্গিতে মাথা তুলে চোখের ইশারায় প্রশ্ন ছুঁড়ে মারলেন।

চেহারায় দুঃখী ভাব ফুটিয়ে তুলে কাতর স্বরে বললাম-
: স্যার, পায়ে সমস্যা...
ডাক্তার সাহেব প্রেসক্রিপশন লিখে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাতের ইশারায় পরবর্তীজনকে নিকটবর্তী হওয়ার নির্দেশ দিলেন। প্রেসক্রিপশন নিয়ে দরজার সামনে বসে থাকা পিয়নের শরণাপন্ন হলাম। বললাম-
: দেখেন তো ভাই, বকের ঠ্যাং-কাউয়ার মাথা কী লেখছে; কিছুই বুঝতেছি না!
: আপনেরে নয় নম্বর রুমে যাইতে বলছে।
নয় নম্বর কক্ষে গিয়ে একজনের হাতে প্রেসক্রিপশন দেয়ার পর তিনি বললেন-
: শুইয়া পড়েন।
: শুইয়া পড়ব মানে?
: আপনের পায়ে প্লাস্টার করতে হবে।
: মানে কী? আমার ঠ্যাং ভাঙ্গেও নাই, মচকায়ও নাই! প্লাস্টার করতে হবে কীজন্য?
: ডাক্তার লেখছে।
: ডাক্তার লেখছে? এইরকম একটা ফালতু কথা তিনি কেন লেখলেন?
: এইটা তো ভাই আমি বলতে পারব না।
: দ্যান দেখি প্রেসক্রিপশনটা। জাইন্যা আসি, ভুল কইরা লেখল কিনা?
পুনরায় ডাক্তার মহোদয়ের কক্ষে ঢোকার চেষ্টা করতেই পিয়ন পথ আটকাল। বলল-
: স্যার নাই; বাইরে গেছে।
: এইটা কী রকম কারবার! আমারে শোয়াইয়া দিয়া ডাক্তার সাহেব কোথায় চইল্যা গেলেন?
পিয়ন নির্বিকার। জানতে চাইলাম-
: ডাক্তার সাহেব কখন ফিরবেন?
: ফিরতে দেরি হবে।
: কত দেরি?
: (নিঃশ্চুপ)।
: বলেন নারে ভাই, কতক্ষণ ওয়েট করন লাগব?
: (নিঃশ্চুপ)
: আরে ভাই! বলেন না, আমরা-আমরাই তো!
পিয়ন কাচুমাচু করছে। হাসপাতালের করিডোরে একজন চা বিক্রেতা বড় ফ্লাস্ক থেকে চা বিক্রি করছিল। তাকে ডাক দিলাম। চায়ের কাপ ঠোঁটে ছোঁয়ানোর পর পিয়ন বলল-
: ভাইজান, আসল কথা হইল- বাইরের একটা ক্লিনিক থেইকা জরুরি ‘কল’ আসছে। স্যার সেইখানে গেছে। এইজন্যই আপনেরে বলছি, স্যারের ফিরতে দেরি হবে।

লেখক : সাংবাদিক।
mokamia@hotmail.com

এইচআর/আরআইপি

‘মানে কী? আমার ঠ্যাং ভাঙ্গেও নাই, মচকায়ও নাই! প্লাস্টার করতে হবে কীজন্য?’