মুখপাণ্ডিত্যে সত্য-মিথ্যায় সবাই যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৪:১১ এএম, ২৯ নভেম্বর ২০১৭

বলতে বলতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেই ফেললেন, বিএনপি রাজাকারদের কাছে টানার কারণেই আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারের সঙ্গে জোট করেছে। সোমবার মিলন দিবসে ডা. মিলনের কবরে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। এ-ও বলেছেন, এটি আদর্শের জোট নয়। কৌশলের জোট। এর আগে, মিলনের কবরের পাশে দাঁড়িয়েই তার দলের নেতা তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, এরশাদ স্বৈরাচারী মনোভাব ছেড়ে এখন গণতন্ত্রমনা। তাই তার সঙ্গে জোট বেঁধেছেন তারা। কথার দৌড়ে পিছিয়ে থাকবেন কেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী? ভালো পাঠ নিয়েছেন তিনি। বলেছেন, তার দল গণতন্ত্রের আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে অটল তারা। গণআন্দোলনে নব্বইয়ের পতিত স্বৈরাচারী এরশাদ কেন সরকারের শরীক- এ প্রশ্নের জবাব এভাবেই গণমাধ্যমকে দিলেন নেতারা।

মুখপাণ্ডিত্যে তারা জিতেছেন সবাই। কেউ কারে নাহি ছেড়েছেন। হারেননি কেউ। কিন্তু হেরেছেন-হারিয়েছেন পুত্রহারা মা সেলিনা আক্তার? ছেলে তো গেছে তার। শোকও তারই। তিনি রাজনীতিহীন। ক্ষমতাহীনও। এ নিয়ে রাজনীতি পুরোটা রাজনীতিকদেরই। আবেগে কাবু মিলনের মা সেলিনা আক্তার বলেন, তিনি পুত্রহত্যার বিচার পাননি। পাবেনও না। তাই বিচার আর চানও না। নিষ্ঠুর সত্যতা এখানেই। তার হারা-জেতার কিচ্ছু নেই। মুখপাণ্ডিত্যেরও কিছু নেই। তবে, জানিয়ে দিলেন গোটা পরিস্থিতিটাই তার প্রতিপক্ষ। এবং শক্তিমান সবাই।

কথায়-কাজে কোনো দলই ফেলনা নয়। কোনো নেতাই কমজুরি নন। তার চেয়ে বড় কথা এসব দলের নেতারা কেউ মিথ্যা বলেন না। সবাই সত্যবাদী। সরকারি দল ও জোটের নেতারা ক্ষমতার জোরে-জোসে সত্যবাদিতা ও বচনে বেশি এগিয়ে থাকলেও বিরোধীদলের নেতারা ততো পিছিয়ে নন। মুখের ভাষার সঙ্গে শরীরের ভাষাও দর্শনীয়। মুখের সাথে চোখ-চাহনিসহ অঙ্গভঙ্গি (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) বেশ উপভোগ্য। টেলিভিশনের পর্দায় নিয়মিত এসব দৃশ্যে মানুষ বেশ বিনোদিত।

বচন-বাচনে তথ্যের সঙ্গে কড়া যুক্তিতেও সবাই মহীয়ান তারা। গণতন্ত্র, দেশপ্রেম, মাঝেমধ্যে ধর্ম মিলিয়ে আবেগ সর্বস্ব মানুষকে নিয়ে ভালো মজমার স্বাদ দিচ্ছেন তারা। অ্যাসাইনমেন্টের তাগাদা দৃষ্টে গণমাধ্যমকর্মীরা কখনো কখনো আগেভাগেই জানেন আজ কোন নেতা, কোন ভঙ্গিতে, কোথায় কোন সত্য কথা বলবেন। কে কিভাবে কোন সত্য উচ্চারণের সঙ্গে কোন ভঙ্গি করবেন, হাসবেন না কাঁদবেন-কাঁদাবেন তা-ও আগাম জানেন সংবাদকর্মীরা। মুখে স্বীকার না করলেও তা আরেকটু বেশি জানেন দুই দলের নেতা-কর্মীরা। তারা ওবায়দুল কাদের, মির্জা ফখরুল, হাসানুল হক ইনু, কামরুল ইসলাম, রুহুল কবির রিজভী, হাছান মাহমুদদের কাছ থেকে সত্য বলা শেখেনও। মান্যবর নেতা-মন্ত্রীদের প্রতিদিনকার সত্য বাণী-বচনের মধ্যে চমকিত জানান দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। দাবি করেছেন তিনি মিথ্যার উর্ধ্বে। জীবনে কখনো মিথ্যা বলেন না বলে জানিয়েছেন এই প্রবীণ অ্যাডভোকেট।

মিথ্যা বলা মহাপাপ- এ ধর্মীয় দীক্ষার সঙ্গে মিথ্যা বললে হায়াত কমে যায় বলে শৈশবে শুনিয়েছেন আমাদের আরবি শিক্ষকসহ গুরুজনরা। পরে শুনেছি বিভিন্ন এলাকায়ই চালু রয়েছে কথাটা। কিন্তু বাস্তব কি তা বলছে? মিথ্যার প্রবণতা ও বিস্তার ব্যাপক। মিথ্যাচারে স্মার্টনেসও লক্ষণীয়। শুধু রাজনীতিতে নয়, পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র সবখানেই। রাজনীতির মাঠের বাইরে কোথাও কোথাও এ চর্চা আরো বেশি। ফেরিওয়ালা-দোকানদার থেকে শুরু করে শিক্ষক, সাংবাদিক, মসজিদের ইমাম-খতিব থেকে ভিখারি পর্যন্ত। পণ্যের বিজ্ঞাপন, পাত্র-পাত্রী, ইতিহাস রচনা, কারো গুণাগুণ বা ঘটনা বর্ণনার পাশাপাশি ওয়াজ-মাহফিলেও। এ সত্যবাদীদের উন্নতিও বেশ। আয়ুর সঙ্গে আয়ও বাড়ছে তাদের। অর্থাৎ তারা মিথ্যা বলছেন না। এ সত্যবাদীরা সাহসী-মহাযুক্তিবাদীও। পক্ষে ভূরিভূরি ভক্ত-অনুসারী, রথী-মহারথীও। মিথ্যা বললে তো মহাপাপে-তাপে তাদের পরিণাম খারাপ হবার কথা।

মিথ্যায় হায়াত কমলে দেশ মানুষশূন্য হয়ে যাবার কথা কবেই। বিশেষ করে জনসভা, আলোচনাসভা, প্রেস কনফারেন্স, সংসদ অধিবেশন, আদালতপাড়ায় মিথ্যার অ্যাকশনে প্রতিদিন উঠতে-বসতেই মরহুমে গিয়ে ঠেকার কথা কতো জনের? বরং গড়ের অঙ্কে আমাদের মাথাপিছু আয়ু বাড়ছেই। তা ঠেকেছে গর্ব আর ঐতিহ্যের অঙ্ক একাত্তরে। বাড়তে বাড়তে আমাদের গড় আয়ু এখন একাত্তর বছর ছয় মাসের মতো। গত সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে ২৪ বছরের বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে গর্বের সঙ্গে তথ্যটি জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী।

বেশুমার মিথ্যাচারের সঙ্গে নানা রোগশোকে মানুষের অসুস্থতা ব্যাপক। আয়ু হ্রাসের ব্যাপক ঝুঁকি। কিন্তু বাস্তব আমাদের সহায়। আয়ুতে শুভসংবাদ। আমরা কতোটা সুস্থতার সঙ্গে এ আয়ু ভোগ করছি? এ প্রশ্ন তোলাই থাক। আমরা সবাই সত্যবাদী, মহাপাপমুক্ত এটাই সারকথা। সত্যবাকে জর্জরিত না আপ্লুত সেই প্রশ্নে গিয়ে আপদ টানারই বা কী দরকার! তবে, এর মাঝেই রাজনীতিকদের কথা কম বলার পরামর্শ দিয়েছেন প্রতিদিন কথার খই ফোটানো ওবায়দুল কাদের। সত-সত্যবাদী হবার আহ্বান জানিয়েছেন। কথা কম বলার পরামর্শ দিতে গিয়ে বলেছেন, বারবার যে বেশি কথা বলে, সে বেশি বাজে কথা বলে।

দশ কথার এক কথাই অসাধারণভাবে বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। প্রভাবশালী এই মন্ত্রীর কথার ওপর কথা। নিজের মুখেই নিজের কথা। তার এ কথামালাকে সাম্প্রতিক সময়ের বিশেষ ঘটনা ও তথ্যের সঙ্গে বিনোদনও ভাবছেন কেউ কেউ। বার্তা তো বোনাস।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/আইআই

‘কথায়-কাজে কোনো দলই ফেলনা নয়। কোনো নেতাই কমজুরি নন। তার চেয়ে বড় কথা এসব দলের নেতারা কেউ মিথ্যা বলেন না। সবাই সত্যবাদী। সরকারি দল ও জোটের নেতারা ক্ষমতার জোরে-জোসে সত্যবাদিতা ও বচনে বেশি এগিয়ে থাকলেও বিরোধীদলের নেতারা ততো পিছিয়ে নন।’

আপনার মতামত লিখুন :