ছাগলামি-গোঁয়ার্তুমি ঢাকা টু দিল্লি

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৩:৫৮ এএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭

বন্ধু এবং প্রতিবেশি ভারতের রাজনীতিতে চেপে বসেছে গরুময়তা। দেশটির আগামী নির্বাচনে গরুর ব্যাপক ভূমিকার আলামতও স্পষ্ট। এর এক পর্ব হয়ে গেল গুজরাটে। এদিকে, দেশে যতো কাণ্ডকীর্তিতে বারবার উঠে আসছে ছাগলের নাম। মুখে অনেক মন্দ কথা বলা হলেও ছাগলের কদর কম নয়। গালমন্দের সঙ্গে স্নেহের যোগসূত্রও থাকে ছাগল, রাম ছাগল, পাঁঠা ধরনের সম্বোধনে। এ নামে সম্বোধনের আগে অনেকেরই জানা থাকে না বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ছাগল উৎপাদনকারী দেশ।

অর্জন হিসেবে এটি বিশাল। যত্ন-আত্তি ঠিকভাবে চলতে থাকলে ফলন ভবিষ্যতে অবশ্যই আরো বাড়বে। এই নিরীহ প্রাণিটি তখন হয়ে উঠবে গর্বের ধন। এরপরও ভেতরে ভেতরে যে দেশে ছাগলের ব্যবহার-কদর ব্যাপক হারে বেড়ে চলেছে সেটা স্বীকারে কৃপণতা লক্ষণীয়। প্রচার-প্রসার নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশ-ভারত দুদেশে সাম্প্রদায়িকতা আর মানসিকতায় ছাগল-গরু এভাবে জায়গা করে নেবে তা একেবারে অমূলক-অবান্তরও নয়। ভারতে গোরক্ষা নীতিতে ডেমকেয়ার নরেন্দ্র মোদির সরকার। সেখানে গোরক্ষার দাবি শুধু আরএসএস বা তাদের সমগোত্রীয়রাই করে আসছে, এমন নয়। অন্তরালে কংগ্রেসের মধ্যেও গোরক্ষার দাবি একেবারে দুর্বল নয়। দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্রপ্রসাদ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা হলেও তাকে আরএসএস ঘরানার মনে করা হতো। সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে তিনি সর্দার প্যাটেলের চেয়ে কম ছিলেন না। ইতিহাস বলছে, ভারত স্বাধীন হওয়ার আগেই তিনি গান্ধী ও নেহরুর কাছে সম্ভাব্য স্বাধীন ভারতে গোহত্যা বন্ধের আবদার করেছিলেন। কিন্তু তাদের একজনও রাজেন্দ্রপ্রসাদের আবদারে সায় দেননি। মোদির সরকার গরুতে বেশ আন্তরিক।

কংগ্রেস বা অন্যরা অসাম্প্রদায়িকতার আওয়াজে যা পারেনি তা গরুতে এস্তেমাল করার পরিস্থিতি হতে যাচ্ছে ভারতে। গোরক্ষা নীতি কার্যকর করতে গিয়ে দেশটির বিদেশে গরুর মাংস রফতানি বাণিজ্য, চামড়া শিল্প, জুতা শিল্পে বেশ আঘাত হেনেছে। এতে কোনো ভ্রূক্ষেপই নেই। নিজ দেশে গোহত্যা বিরোধী অবস্থান অটুট রেখে জেদের মারে এ ঘাটতি মেটাতে তারা অস্ট্রেলিয়া থেকে গরুর চামড়া পর্যন্ত আমদানি করছে। শুধু ভারতের গোরক্ষাই তাদের ধর্মীয় আদর্শ এবং সাম্প্রদায়িকতা রক্ষা। এই জোসে ভারতে শুধু গরুর জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের আলোচনাও বেশ জম্পেশ। এ নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ সংক্ষিপ্ত হলেও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক। উস্কানিমূলক খবরও ছড়ানো হচ্ছে। কোনোটির সঙ্গে রয়েছে ভিডিও ক্লিপও।

গোহত্যা বন্ধ বা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে গরু রফতানি বন্ধের কী জের পড়ছে তা ভাবনায় নিতে নারাজ ভারত। কয়েকটি রাজ্যে গরু জবাই অবৈধ করাসহ মামলা, ধরপাকড় এখনো চলমান। দেশটির বিভিন্ন গোশালা ও খোয়াড়ে হাজার হাজার গরুর কী দশা? বেশুমার গাই, বলদ, ষাঁড় আর দুধ নিয়েই বা ভাববে কেন? গিরস্থদের অনেকে অকেজো উদ্বৃত্ত গরু বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে। এসব স্বাধীন গরু এখন তাদের ফসলের ক্ষেত ও অন্যদের গো খাদ্য ভাণ্ডারে ভাগ বসাচ্ছে। উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে এ নিয়ে সংঘর্ষ বাঁধছে। কৃষকরা ক্ষিপ্ত হচ্ছে।

ভারতের এ টাইপের গোঁয়ার্তুমি বিপরীতে বাংলাদেশে ছাগলামি। পদে পদে সমাজ ও মানবতার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ছাগলকূল। ছাগলামি যতো কাণ্ডকারখানা চারদিকে। ছাগলদের আদর-কদরের তোড়ে শিক্ষিত, বোধ, নীতি সম্পন্নদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছাগলামি ও ছাগলানুভূতির পরশ বেশ জোরালো। মানুষের সংখ্যা কমে ছাগলের উৎপাদন ও বিস্তার ঘটাও স্বাভাবিক।

ছাগলানুভূতিতে বেদনাহত হয়ে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে খুলনায় মামলাবাজিতে সেই বার্তা তো মাস কয়েক আগে এক প্রতিমন্ত্রী দিয়েই রেখেছেন। তবে, এর ফজিলতে ৫৭ ধারার ছাগলামি ধীরে ধীরে কমে এসেছে। আইন, তথ্যসহ মন্ত্রীদের কয়েকজন বলেছেন, ছাগলামির এ ধারাটি আর থাকবে না। ছাগলের বিবর্তন তত্ত্ব একদিকে আশা জাগানিয়া। তবে, এর চেয়ে আরো কঠোর কিছু হতে পারে বলে আতঙ্ক ও নানান কানাঘুষা চলছে। কামনা করি, তা অসত্য-অমূলক হোক।

২০১৮ আসুক শুভ বারতা নিয়ে। ২০১৭ সালের মতো ছাগল বর্ষসেরা আলোচনায় না থাকুক ১৮-তে। পাঠ্যবইয়ে ছাগলের আম খাওয়া, ছাগলের মৃত্যু সংবাদ প্রচার নিয়ে যে মাত্রায় মাতামাতি চলেছে সেটি ছাগল প্রাণিটির জন্য আশা জাগানিয়া। নানান ছাগলামির পাশাপাশি ছাগলের ফসল খাওয়া নিয়ে মানুষের মারামারির মতো সংবাদ কিন্তু থেমে নেই। পাঁচ সিকির ছাগলে সরকার, দল, রাষ্ট্র, সমাজের কোটি কোটি টাকা নষ্টের লাগামে টান পড়া জরুরি।

এদিকে, ভারতে গোমাংস, দুধ নিয়ে যন্ত্রণার মধ্যে এক চিলতা সুসংবাদ রয়েছে গোমূত্র নিয়ে। দেশটিতে গো-মূত্রের দাম বেড়েছে। এর হোতা একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। তারা গরুর মূত্র নিয়ে গবেষণা করছে। গবেষণায় তারা জানিয়েছে, গোমূত্রে প্রায় ৩০ টি রোগ সারে। এই চাহিদার চোটে সেখানে দুধের চেয়ে মূত্র দামি হয়ে গেছে। ভারতের আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানগুলোও গরু-ছাগলের মূত্র নিয়ে গবেষণা বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে, তা হওয়া চাই অবশ্যই জাত গরু বা জাত ছাগল। ভেজাল বা ভিন্ন প্রজাতির নয়।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

এইচআর/আইআই

‘২০১৮ আসুক শুভ বারতা নিয়ে। ২০১৭ সালের মতো ছাগল বর্ষসেরা আলোচনায় না থাকুক ১৮-তে। পাঠ্যবইয়ে ছাগলের আম খাওয়া, ছাগলের মৃত্যু সংবাদ প্রচার নিয়ে যে মাত্রায় মাতামাতি চলেছে সেটি ছাগল প্রাণিটির জন্য আশা জাগানিয়া।’ 

আপনার মতামত লিখুন :