‘রিমেম্বার, ইওর ফ্যামিলি ইজ ওয়েটিং ফর ইউ’

ফারুক যোশী
ফারুক যোশী , প্রবাসী সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৪:০১ এএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭
‘রিমেম্বার, ইওর ফ্যামিলি ইজ ওয়েটিং ফর ইউ’

বাংলাদেশের মানুষ ভুলতে পারবে না সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার চিহ্ন। ২০১১ সালের ১১ জুলাই চট্টগ্রামের মিরসরাইতে ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলো ৪৪ জন শিশু-কিশোর। ফুটবল খেলা থেকে ফিরে আসার পথে উচ্ছ্বসিত শিশুদের কলতান হঠাৎ করে থমকে গিয়েছিলো, নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলো, মিরসরাই জেলায় নেমে এসেছিলো করুণ-বিষাদ বিউগলের সুর।

বাংলাদেশ থেকে এই শোকাবহ দুর্ঘটনার রেশ যেতে না যেতেই এ বছরেই মাত্র এক মাস পর ঘটে যায় আরেক মর্মন্তুদ দুর্ঘটনা। নিহত হন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনিরসহ পাঁচজন মানুষ। এই পাঁচজনের মৃত্যুর জন্যে চালক-তিনজন বাস মালিকদের দায়ী করে মামলা করেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ। প্রায় ছয় বছর পর এ মামলার যুগান্তকারী রায় হয়েছে। অভিযুক্ত চালক, বাস মালিক এবং ইন্সুরেন্স কোম্পানিদের ৪ কোটি ত্রিশ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫২ টাকা, বাস মালিককে ৩০ লাখ টাকা এবং ইন্সুরেন্স কোম্পানিকে ৮০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পরিশোধের রায় দিয়েছেন আদালত। তিন মাসের মধ্যে পরিশোধের জন্যে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।

২. ৪৪ জন শিশু-কিশোর, তারেক মাসুদ, মিশুক মুনিরের মৃত্যু ২০১১ সাল বাংলাদেশকে কাঁপিয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু সেই কাঁপনে কিছুই হয়নি। সড়ক ব্যবস্থাপনায় কোনই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। বরং দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রতিদিন, প্রতিটি বছর। প্রতিদিন বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। এইতো গত ক’দিন আগে সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার কিছু তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু কাঁদিয়ে গেছে সারা দেশকে। তরুণ ছয়জন ব্যবসায়ী গিয়েছিলেন রোহিঙ্গাদের সহায়তায়। ফিরে আসতে গিয়ে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তারা মারা যান একসাথে।

এভাবেই প্রতিদিন দীর্ঘায়িত হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। কিন্তু একটা দেশ হিসেবে কার্যত আমাদের উদ্যোগটা কি পরিলক্ষিত হচ্ছে এর বিপরীতে। অপরচুনিস্টদের অনেকেই বলে থাকেন, ষোল কোটি মানুষের এই দেশে এটাতো ঘটবেই। এ থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। অথচ কথাটা যে এক্কেবারেই অসাড় তা আমরা যেন মেনে নিতে চেষ্টাও করি না। বাংলাদেশে রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হচ্ছে বলে জোর প্রচারণা আছে। এটা হচ্ছেও। বাংলাদেশই এমন একটা দেশ, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত চীন এমনকি ব্রিটেনের চেয়েও অধিক অর্থ খরচ করা হয় নির্মাণ বাবত।

এ বছরের মাঝামাঝিতে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এক রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশে ঢাকা-মেওয়া চার লেনের হাইওয়ে নির্মাণে প্রতি মাইলে খরচ হয়েছে ১১.০৯ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ভারতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়ে ১.১ মিলিয়ন এবং চীনে ১.৩ মিলিয়ন ডলার। এবং এই বাড়তি খরচগুলোর প্রধান কারণই হলো অব্যস্থাপনা, নির্মাণ কাজে পরিকল্পিতভাবে গড়িমসি করা, টেন্ডার প্রদানে দুনীতির আশ্রয় নেয়া, উচ্চপর্যায়ে মতানৈক্য এবং ঐ শ্রেণিতে দুর্নীতি প্রভৃতি কারণে প্রতিটি কাজ দীর্ঘমেয়াদী হয়। এতে করে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় রাষ্ট্র, অসম্পূর্ণ কাজে পর্যুদস্থ থাকা রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটতে থাকে প্রতিনিয়ত।

অন্যদিকে দেখা যায় ব্রিটেন কিংবা পশ্চিমা দেশ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগুলোর মতো এতো গাড়ি চলাচল না করেও কিছুদিনের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ছে দেরিতে তৈরি হওয়া এই রাস্তাগুলোও। ভেঙে পড়া রাস্তাগুলো আবার মেরামত করতে লাগছে বছরের পর বছর। কাগজে-কলমে রাস্তা প্রশস্ত হবার কথা থাকলেও দেখা গেছে প্রায়ই রাস্তাগুলো সরু করে তৈরি করা হয়েছে। এবং কোন অজ্ঞাত কারণেই এগুলো অনুমোদিত হয়েই মন্ত্রী কিংবা জনপ্রতিনিধিরা তা উদ্বোধনও করছেন।

৩. গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশের দিকে তাকালে মনে হয় এ যেন এক ধরনের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। আমাদের দেশে দুর্ঘটনাকে আমরা নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে পারি না। কারণ যে কেউ খুব অল্প দিনে এখানে চালক হয়। ড্রাইভারের হেলপার দূরপাল্লার গাড়ি চালায়। তারা সবাই বেপরোপয়া গাড়ি চালায়। ওভারটেকিং দেখে মনে হয় যেন দৌড় প্রতিযোগিতায় উড়াল দিচ্ছ তারা। বিপদজনক এ ওভারটেকিং একটা প্রধান কারন দুর্ঘটনার।

রাস্তাঘাট নির্মাণে ত্রুটি আছে। বছর শেষ হতে না যেতেই রাস্তা ভেঙে যায়, রাস্তা মেরামতের নীতি-নির্দেশনা থাকলেও প্রশাসনের ঢিমে তালে আগানো কিংবা অসাধু কর্মকর্তাদের ‘রডের বদলে বাঁশে’র অনুমোদন জাতীয় ব্যবস্থাপনায় ভেঙে পড়া অবকাঠামো দুর্ঘটনার একটা অনুষঙ্গ। পৃথিবীর সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের মাঝে চলে। কিন্তু অদ্ভুদ দেশ আমাদের বাংলাদেশ। সেখানে আমাদের শ্রমিক নেতারা এমনকি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিও তাদের রাজনীতির স্বার্থে এই অপরিপক্ক আর অসাধু চালকদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে দেশ অচল করে দিতে পিছপা হননা।

কোথাও কোন দুর্ঘটনা ঘটলে সুষ্ঠু কোন তদন্তই হয় না, বিচারতো দূরের ব্যাপার। রাস্তাঘাটের বেহাল দশা কিংবা অনভিজ্ঞ ও অপরিপক্ক চালক কিংবা পুরনো গাড়ির দিকে কর্তৃপক্ষের কোন দৃষ্টি নেই। এই ব্যাপারগুলো আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না। সেজন্যেই দিনের পর দিন বাড়ছে এই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মিছিল। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এ যেন এক মহামারী। বছরে এ মহামারীতে অন্তত ১২,০০০ লোক প্রাণ হারায়। অথচ আমরা কেউ কেউ এতই নির্বিকার যে, অনেক যাত্রীও আছেন যারা নিত্যদিনের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু জেনেও চালককে দ্রুত চালাতে তাগিদ দেন, তাদের ধীরে চালানো নীতিকে খোঁচা দিতে কার্পণ্য করেন না।

দিনের পর দিন থেকে চলমান বাংলাদেশের এমন অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রথম একটা আঘাত দিয়েছেন ক্যাথরিন মাসুদ। তিনি তাঁর স্বামী হারিছেন, এ ক্ষত হয়তো কোনদিন শুকোবে না। যে কোন মৃত্যুই মানুষকে শোকাকুল করে। কিন্তু এরকম দুর্ঘটনা অর্থাৎ বলতে গেলে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড স্বজনদের মেনে নিতে কষ্টতো পাহাড় সমান। এই পাহাড় সমান কষ্টে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসবে ক্যাথরিন মাসুদের। কষ্টের মাঝে স্বস্তি যেমন কিছুটা আছে ক্যাথরিনের, ঠিক কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে এই রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বজনহারা মানুষের মাঝেও।

বলতেই হবে, দুর্ঘটনা কবলিত মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানকে ক্যাথরিন একটা ধারার মাঝে নিয়ে আসলেন তার পক্ষে যাওয়া রায়ের মধ্য দিয়ে। এখন অন্তত বাংলাদেশে মানুষ এই ব্যাপারে সচেতন হবে। আর অর্থনৈতিক লেনা-দেনার হিসেব কষে বাস অর্থাৎ গাড়ির মালিকপক্ষ এবং ইন্সুরেন্স মালিকরাও নড়ে-চড়ে বসতে পারেন। তাদের অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির খতিয়ান দেখেও যদি তারা এ ব্যাপারে সচেতন হন, তা-ও জাতির জন্যে মঙ্গলজনক। এই রায়ের মধ্য দিয়ে বাস মালিক, চালক এবং ইসুরেন্স কোম্পানি অবশ্যই একটা সতর্কতামূলক অবস্থানে যেতে পারে বলে আমরা বিশ্বাস করতে পারি।

৪. সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু পৃথিবীর কোন দেশেই অবজ্ঞা করা যায় না, যাবেও না। উন্নত-অনুন্নত সব দেশেই দুর্ঘটনা আছে, সেটা থাকবেই। আমরা যদি ব্রিটেনের দুর্ঘটনাগুলোর দিকে তাকাই তা-ও দেখবো এখানে আছে দুর্ঘটনা জনিত মৃত্যুর লম্বা মিছিল। প্রতিদিনই এখানে দুর্ঘটনায় পড়ে মৃত্যু হয় মানুষের। দেখা যাচ্ছে এই ব্রিটেনে গড়ে পাঁচজন মানুষ প্রতিদিন মারা যান সড়ক দুর্ঘটনায়। এটাও ব্রিটেনের জন্যে উদ্বেগের বিষয়। সেজন্যে প্রতিটি বছরই নতুন নতুন নিয়ম-কানুনের মাঝে নিয়ে আসতে চেষ্টা করছে ডিভিএলএ কিংবা সরকার। আইনের আওতায় আনা হচ্ছে ড্রাইভারদের।

চালকদের কারণে দুর্ঘটনা সংঘঠিত হলে বিচারের আওতায় যাচ্ছেন চালকরা। বীমা পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগের কারণে চালকরা আরও সতর্ক হচ্ছেন। উন্নত দেশগুলোতে যে কোন ড্রাইভারের লাইসেন্সে পয়েন্ট পদ্ধতি থাকায় নিয়মের বাইরে যারা যাচ্ছেন, পয়েন্ট সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ব্রিটেনে ১২ পয়েন্টের লাইসেন্সে যদি বিভিন্ন সময় পয়েন্ট চলে যেতে যেতে ১২টা পয়েন্টই চলে যায়, তাহলে আদালতে বিচারের মাধ্যমে অনেক চালকই বছরের পর বছর নিষিদ্ধই থেকে যাচ্ছেন গাড়ি ড্রাইভিং এ।

সেজন্যেই দেখা যায় যে, ব্রিটেনে গত পাঁচ-ছয় বছরে প্রায় প্রতিটি বছরই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত বাড়ছে না। যেমন ২০১৫ সালে এ মৃত্যুর সংখ্যা হলো ১৭৩২, যা ২০১৪ সালের মৃত্যুর চেয়ে ২ শতাংশ কম। ২০১৬ তেও তা ছিলো অব্যাহত । অর্থাৎ দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কমেছে। প্রকট আইন আর নিয়ম-কানুন জেনে নিয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়ে এক একজন শিক্ষার্থীকে হাজার হাজার পাউন্ড প্রশিক্ষণের জন্যে ব্যয় করে যদিও প্রতি বছরই তরুণ ড্রাইভারদের সংখ্যা বাড়ছে এই ব্রিটেনে, বাড়ছে পাল্লা দিয়ে গাড়ির সংখ্যা। কিন্তু দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হার তারা কমাতে পারছে যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের মধ্য দিয়েই।

একটা কথা এখানে অনেকেই উল্লেখ করতে পারেন, ব্রিটেনের মানুষের সংখ্যা হয়তো কিছুটা কম। প্রায় সাত কোটি মানুষের আবাস এই দেশটি। বাংলাদেশ এ হিসেবে হয়ত দ্বিগুণের চেয়েও বেশি, অর্থাৎ পনেরো-ষোল কোটি। কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা সাত গুণেরও বেশি। অথচ রাস্তা মেরামতে তথা উন্নয়নের শ্লোগানে বাংলাদেশে বরাদ্ধের পরিমাণ ব্রিটেনে কিংবা পশ্চিমা দেশের চেয়েও অধিক। আর সেকারণে প্রশ্ন আসাটা অস্বাভাবিক নয় যে, কেন-ই একটা সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আসবে না বাংলাদেশের পরিবহন ব্যবস্থা?

৫. আজ থেকে অন্তত বিশ বছর আগে সৌদি আরবের জেদ্দা শহরে দেখা একটা বিল বোর্ড এখনও আমায় ভাবায়। জানিনা এখনও জেদ্দায় কিংবা সৌদি আরবে রাস্তার পাশে এরকম বিলবোর্ডে জ্বলজ্বলে বাতি জ্বলে কি-না। ‘রিমেম্বার, ইওর ফ্যামিলি ইজ ওয়েটিং ফর ইউ’- যাত্রী হিসেবে এই বাক্যগুলো সেদিন আমার মতো যে কোন মানুষেরই হৃদয় ছুঁয়ে গেছে বলেই আমার বিশ্বাস। শুধুই কাব্য নয়, চালকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায় এমন শব্দবন্ধনী দিয়ে আমরা হয়তো লিখতে পারি, বলতে পারি- ‘ধীরে চালান, অপেক্ষায় আছে আপনার পরিবার’ কিংবা ‘ঝুঁকি নেবেন না, একটা মাত্র ভুলে অসহায় হয়ে পড়বে আরও অনেক পরিবার’।

হৃদয় ছুঁয়ে দেয়া বাক্য দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে শুরু করে গোটা জাতিকে সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নিতে পারি আমরা। শক্ত একটা সামাজিক সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারি, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মহামারী থেকে দেশটাকে মুক্ত করার শপথে এগিয়ে যাবার সময় এখন। রাজনীতির দর কষাকষি নয়, সামাজিক প্রতিবাদে মিলিত হতে হবে সবাইকে।

লেখক : লন্ডনপ্রবাসী কলামিস্ট।

এইচআর/আইআই

‘হৃদয় ছুঁয়ে দেয়া বাক্য দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে শুরু করে গোটা জাতিকে সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নিতে পারি আমরা। শক্ত একটা সামাজিক সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারি, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মহামারী থেকে দেশটাকে মুক্ত করার শপথে এগিয়ে যাবার সময় এখন। রাজনীতির দর কষাকষি নয়, সামাজিক প্রতিবাদে মিলিত হতে হবে সবাইকে।’