বাস্তবের ঘরে শোকের বাসা

মাসুদা ভাট্টি
মাসুদা ভাট্টি , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ০৬:০৩ পিএম, ১৩ মার্চ ২০১৮

মাঝে মাঝে পৃথিবীটাকে অদ্ভুত নির্দয় ও নিষ্ঠুর মনে হয়। মনে হয়, এখান থেকে পালানোর কোনো জায়গা থাকলে ভালো হতো। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতার সঙ্গেই যে আমাদের বসবাস সে সত্যকেও অস্বীকার করি কী করে?

ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের যে ফ্লাইটটি কাল নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণকালে দুর্ঘটনা কবলিত হলো তার যাত্রীরা বিমানটি আকাশে ওড়ার আগেও ভাবেননি যে, মৃত্যু এতো কাছাকাছি অবস্থান করছে। আজ্ঞেয়বাদীরা নিশ্চয়ই বলবেন যে, এটাই হওয়ার কথা ছিল। সবকিছুই এক বৃহৎ শক্তির নির্দেশে চলছে। কিন্তু সেই বৃহৎ শক্তি এতোগুলো মানুষের প্রাণ হরণ করে কী আনন্দ পেলো সে প্রশ্ন তুললে নিশ্চয়ই আরেক ধরনের অন্যায় হবে।

প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলোরতো এভাবে পৃথিবী থেকে আচানক বিদায় নেওয়ার কথা ছিল না, তাই নয়? তারা চলে গেছেন, ভয়ঙ্কর এক অপমৃত্যুর দুর্বিষহ স্মৃতি রেখে গেছেন আমাদের জন্য যারা পৃথিবীতে এখনও বেঁচে আছি মৃতদের স্মৃতি নিয়ে।

পৃথিবীকে দেখি আর অবাক হই এটা ভেবে যে, প্রতিদিন অসংখ্য, অগণিত মৃত্যুর স্মৃতিভার নিয়ে এই টিকে থাকার কী কোনো অর্থ আছে? নাকি স্মৃতি বলতে কিছুই নেই। মানুষ এসেছে, মানুষ চলে যাবে, এটাই বাস্তবতা, এই অমোঘ সত্য মেনেই পৃথিবী টিকে আছে, টিকে থাকবে- শুধু মানুষই চলে যাবে যখন-তখন, যেমন-তেমন ভাবে। এ কারণেই পৃথিবীকে আমার নিষ্ঠুর মনে হয় খুউব।

কী কারণে এই ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনা, তা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হবে। চলবে নানা ধরনের, নানা কোণের বিশ্লেষণ। তাতে সত্যটা বদলাবে না, সেটা হলো মৃত্যু। আর যারা স্বজনদের হারিয়েছেন তাদের বেদনাবোধ। এর বাইরে বাকি সব সত্য হয় মনুষ্যসৃষ্ট, নয় যান্ত্রিক ত্রুটি এবং শেষোক্তটিও আসলে মানুষেরই হাতে নিয়ন্ত্রিত, ফলে তার দোষও মানুষেরই।

আমরা সংবাদমাধ্যমে যারা কাজ করি তারা মূলতঃ স্কুপ খুঁজি, খুঁজি মানুষকে চমকে দেওয়ার মতো সংবাদ। আমরা প্রায়শঃই প্রতিটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠি নিমিষে। সেটা নাসার মহাকাশ গবেষণা থেকে বিক্রমপুরের সিরাজদীখান উপজেলার একজন কৃষকের ফলানো আলু, যাই-ই হোক না কেন, আমরা নিমিষেই বিশেষজ্ঞ হয়ে আমাদের মতামত দিতে শুরু করি।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলি আরো বড় বিশ্লেষক হয়ে উঠেছে আজকাল। শোক প্রকাশের সময়কাল কমতে কমতে মুহূর্তমাত্রে নেমে এসেছে আজকাল। এই মুহূর্তটি পেরুলেই শোকের ব্যবচ্ছেদ শুরু হয় গণমাধ্যমে। গতকালকের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। মুহূর্তকাল পরেই আমরা দেখেছি যে, কখনওই পাইলটকে দোষারোপ করা হচ্ছে, কখনও নারী পাইলট দিয়ে বিমান চালানোর মতো মূর্খামি (?) কে দোষ দেওয়া হচ্ছে এবং কখনও নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরকে গাল দেওয়া হচ্ছে তার নিরাপত্তা ঝুঁকি কিংবা ইংরেজি না জানা নেপালি কর্মচারীদের দিয়ে কন্ট্রোল টাওয়ার চালানোর দায়ে। ধরে নিচ্ছি সকল বিষয়ই গতকালকের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কিন্তু তারপরও এই দুর্ঘটনা এদের কেউই চেয়েছিলেন বলে মনে করার কোনো কারণ আছে কি?

নেপালের বিমানবন্দর নিয়ে প্রথম শুনেছিলাম বাংলাদেশের বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা-বৈমানিক ক্যাপ্টেন আলমগীর সাত্তারের কাছে। তিনি তার একটি বইয়ে লিখেছেন যে, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণ একটি ভয়ংকর মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার সম্ভাবনাকে প্রতিবার চরম ও ঝুঁকিবহুল করে তোলে। বৈমানিকগণ এক্ষেত্রে সকল প্রকার সতর্কতা অবলম্বন করেই এখানে অবতরণ করে থাকেন।

ইতোমধ্যেই আমরা জেনে গিয়েছি যে, এই বিমানবন্দরে কতোগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে প্রাণহানির সংখ্যাও কতো। কিন্তু আলমগীর সাত্তার বলেছিলেন যে, দেশটা এখানে নেপাল এবং দেশটির গর্ব যেখানে হিমালয় সেখানে এর চেয়ে বেশি সমতলভূমি নেপালের রাজধানীর কাছাকাছি কোথাও নেই যেখানে নিরাপদে অবতরণ বা উড্ডয়নের জন্য একটি বিমাবন্দর নির্মাণ সম্ভব।

একই কথা বলেছিলেন নেপাল ভ্রমণকালে পরিচয় হওয়া একজন রুশ এভিয়েশন বিশেষজ্ঞও। আর নেপালি জনগণ সম্পর্কে আমার মুগ্ধতা বরাবরের। তাদের মতো পরোপকারী, মানুষ-ঘনিষ্ঠ মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে আমি খুব কমই দেখেছি। তাই বলে একথা বলছিনে যে, তাদের কোনো ভুল হতে পারে না বা হয়নি।

বাংলাদেশের বৈমানিকদের নিয়েও আমাদের গর্ব করার মতো বিষয় আছে অনেক। তারা আমাদের সীমিত জাতীয় সাধ্যের মধ্যে ভাঙা-চোরা বিমান দিয়েই বছরের পর বছর যাত্রীদের সেবা দিয়ে যান নিজেদের কৌশল ও পেশাদারীত্ব দিয়ে। তারপরও তাদের দায়িত্বে অবহেলা কখনও কখনও ঘটেনা বা ঘটেনি তাও বলছিনে। মোটকথা, গতকালকের দুর্ঘটনা, যাকে আমরা দুর্ঘটনাই বলছি তার কারণ নির্ণয়ে সত্যিকারের তদন্ত-নির্ভর তথ্যের জন্য বসে না থেকে আমরা কখনও প্রকাশিত সংবাদ-নির্ভর বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়ে যাচ্ছি এবং শোককে হাল্কা করার চেষ্টা করছি। হয়তো, শোক প্রশমনে এও এক কার্যকর পন্থা।

শোকের আয়ু কতোদিন তা নিয়ে নতুন কোনো তত্ত্বে যেতে চাই না। কিন্তু আমরা প্রায়ই শোককে শক্তিতে রূপান্তরের কথা বলি। দেখতে পাই কালকের ঘটনায়ও উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে সামাজিক গণমাধ্যম সয়লাব হয়ে গেছে। আবারও বলছি, এ নিয়ে আমার কোনো ক্ষোভ নেই। মানুষ তার নিজের অবস্থান থেকে নিজের মতামত প্রকাশ করার জন্যই সামাজিক গণমাধ্যমের মতো উন্মুক্ত প্ল্যাটফরম তৈরি হয়েছে।

একবিংশ শতকের গণতন্ত্র বলতে নতুন প্রজন্ম হয়তো ফেইসবুক-কেই বোঝে। মজা লাগে দেখে যখন দেখি এখানে প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞগণও শিশুসুলভ বক্তব্য দিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় আহত-নিহতদের প্রতি শোক জানানোর পরিবর্তে সরকারের ত্রুটি, দুর্বলতা খোঁজেন। কেন সরকারের পক্ষ থেকে একটি সাহায্যকারী দল গতকালই নেপালে চলে গেলো না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে এটা জানা জরুরি ছিল যে, কোনো দেশ চাইলেই কি আরেক দেশে ঘটা দুর্ঘটনায় একটি উদ্ধারকারী দল মুহূর্তের সিদ্ধান্তে পাঠাতে পারে কিনা?

দুর্ঘটনার পর পরই ত্রিভুবন বিমানবন্দর প্রায় ঘন্টা তিনেকের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তারপর যে বিমানজট সেখানে দেখা দেয় তা আজকেও শেষ হয়নি বলে জানা যায়। অপরদিকে দিনের বেলাতেই যে বিমানবন্দর ঝুঁকিপূর্ণ সেখানে রাতের বেলা সেই বিমানবন্দর কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে সেটা বৈমানিক মাত্রেই বুঝবেন, কিন্তু না, আমরা অনেকেই তাদের চেয়ে বেশি প্রাজ্ঞ, ফলে এখানেও সরকারের গাফিলতি খুঁজে পেয়েছি। একথা সত্য যে, রাষ্ট্রের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হওয়ার যথেষ্ট ও যোগ্য কারণ রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি ব্যাপারে রাষ্ট্রকে দোষারোপ করাও এক ধরনের ব্যাধি। যে ব্যাধিতে আক্রান্তদের কাছে শোক প্রকাশের চেয়ে রাষ্ট্রকে গাল দেওয়াটাও এক ধরনের আনন্দদায়ক কাজ বলে প্রতীয়মান হয়।

শুরুতেই বলেছি যে, শোক-ব্যবচ্ছেদ নিয়ে লিখতে বসিনি। আজকে কিছু লেখারও ইচ্ছে ছিল না। পৃথিবীকে একটি গোলকের মতো হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে মনে হলো, পৃথিবীর কোথাও কি প্রকৃত সুখ বলে কিছুই আছে? আছে কি নিরবচ্ছিন্ন আনন্দময় কোনো উদযাপন?

আজকে খুব ভোরে উঠে দেশের সংবাদপত্র ও অনলাইনগুলি ল্যাপটপের পর্দায় দেখতে দেখতে এবং নিজের ফেসবুক পাতায় অসংখ্য তথ্য-উপাত্ত দেখে ওপরের কথাগুলো মাথায় এলো। আর ব্রিটিশ দৈনিকগুলি হাতে নিয়ে মনে হলো, কোথাও মানুষ মারা যাওয়ায় শোকের মাতম চলছে, আর কোথাও চলছে মানুষ মারার নূতন আয়োজন। একজন রুশ গোয়েন্দা ও তার কন্যাকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে বলে দাবি করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে।

মোটামুটি যুদ্ধাবস্থায় পৌঁছে যাচ্ছে দেশদু’টি। আগামী ১৮ই মার্চ রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট পুতিন এই নির্বাচনে বিজয়ী হবেন পশ্চিমা মিডিয়া একথা হলপ করেই বলছে। রাশিয়ার জনগণকে যতোটা চিনি-জানি তাতে ব্রিটেনের এই হুমকি-ধামকি পুতিনের পক্ষেই যাবে, তারা জেনে-বুঝে বা অজ্ঞানেই পুতিনের ভোটের বাক্স উপচে দেবেন, তাতে সন্দেহ নেই, কিংবা বাধ্য হয়েও একাজ করতে পারেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার গণভোট করে ব্রিটেন এখন মহা ফ্যাসাদে আছে, না পারছে বেরুতে, না পারছে নিজেদের বমনকে পুনরায় গিলতে। ফলে দেশের ভেতর থেরেসা মে’র সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এধরনের আলগা উত্তেজনার দরকার আছে বৈকি। ওদিকে চীনে এসেছেন নতুন সম্রাট, তাকে কুর্নিশ করি, কিছুটা বাধ্য হয়েই। পৃথিবীর ভয়ঙ্কর অসুখ করেছে, এই অসুস্থ সময়ে এই নতুন সম্রাটকে কুর্নিশ না করে আমাদের মতো ক্ষুদ্র সত্ত্বার উপায়ই বা কি আছে?

শোক মানুষকে বিহ্বল করে তোলে। করে তোলে অযৌক্তিক। আজ সকালে এ লেখা লিখতে বসে কোনো ভাবেই নিজের যুক্তিপূর্ণ মনকে বোঝাতে পারলাম না। তাই ভেবেছিলাম লিখবো না। কিন্তু ডায়েরিতে আজকের এই শোকাবহ দিনওতো তোলা থাকবে, তাই না? ডায়েরি থেকে এদিনকেও কি বাদ দিতে পারবো? যতোদিন বেঁচে আছি ততোদিন, নিশ্চয়ই নয়।

লীডস ১৩ মার্চ, মঙ্গলবার ২০১৮
masuda.bhatti@gmail.com

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।

এইচআর/আরআইপি

‘শোক মানুষকে বিহ্বল করে তোলে। করে তোলে অযৌক্তিক। আজ সকালে এ লেখা লিখতে বসে কোনো ভাবেই নিজের যুক্তিপূর্ণ মনকে বোঝাতে পারলাম না। তাই ভেবেছিলাম লিখবো না। কিন্তু ডায়েরিতে আজকের এই শোকাবহ দিনওতো তোলা থাকবে, তাই না? ডায়েরি থেকে এদিনকেও কি বাদ দিতে পারবো? যতোদিন বেঁচে আছি ততোদিন, নিশ্চয়ই নয়।’