আর কোনো প্রাণহানি নয়

সম্পাদকীয়
সম্পাদকীয় সম্পাদকীয়
প্রকাশিত: ১০:২৯ এএম, ২৪ অক্টোবর ২০১৮

বয়লার বিস্ফোরণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। একটির পর একটি ঘটনা ঘটলেও কোনো প্রতিকার নেই। প্রশ্ন হচ্ছে কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে। এভাবে অকাতরে প্রাণ যাবে আর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হবে না-এটি কাম্য নয়।

এবার গাইবান্ধার সাদুল্যাপুরের পশ্চিমপাড়ায় একটি চালকলে (চাতাল) বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনায় শারমিন আকতার (১৮) নামে কলেজছাত্রী নিহত হয়েছে। এসময় ফুল মিয়া (৫০) ও উজ্জল মিয়া (২৫) নামে দুই শ্রমিক দগ্ধ হন। গতকাল মঙ্গলবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে সাদুল্যাপুর উপজেলার পশ্চিমপাড়ার রুপালি চালকলে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সকালে চালকলের শ্রমিক ফুল মিয়া ও উজ্জল মিয়া বয়লারের চুলায় আগুন দেন। এরপর তারা চালকলটি চালু করার প্রস্তুতি নিতেই হঠাৎ করে বিকট শব্দে বয়লার বিস্ফোরিত হয়। এতে বয়লারসহ মিলের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। মিলের কিছু অংশে আগুন ধরে ধোয়ার সৃষ্টি হয়।

চালকলের ভেতরে (চাতাল) কাপড় পরিষ্কার করতে গিয়ে বিস্ফোরণে দগ্ধ হয় শারমিন। এসময় শ্রমিক ফুল মিয়া ও উজ্জল মিয়াও আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজন দ্রুত শারমিন, ফুল মিয়া ও উজ্জলকে উদ্ধার করে সাদুল্যাপুর হাসপাতালে ভর্তি করেন। শারমিনের শরীরের বিভিন্ন জায়গা দ্বগ্ধ হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

কেন এত দুর্ঘটনার পরও কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না- প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এ নিয়ে। শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) গবেষণায় উঠে এসেছে এক হতাশাজনক চিত্র। সম্প্রতি প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৬৯ জন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন ২৩৭ জন। ২০১২ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত দুর্ঘটনায় হতাহত হওয়ার এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে।

বয়লার বিস্ফোরণের জন্য নানাবিধ কারণ দায়ী। অনুমোদনের চেয়ে বেশি চাপে বয়লার চালানোর জন্যই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। আর এ জন্য কারখানার অসতর্কতা এবং অদক্ষতাই দায়ী। তৈরি পোশাকশিল্প, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, কেমিক্যাল কোম্পানি, চালকল ও ট্যানারি শিল্পে বয়লার ব্যবহার হয়ে থাকে। পোশাকশিল্পে ইস্তিরি বা শুকানোর কাজে এবং অন্যান্য শিল্পে উৎপাদিত দ্রব্য শুকানোর কাজেই সাধারণত বয়লার ব্যবহার হয়। ২২ দশমিক ৭৬ লিটারের বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো বয়লার হলেই তা নিবন্ধন করতে হয়। সেই অনুযায়ী দেশে বয়লার আছে সাড়ে পাঁচ হাজার। এই সাড়ে পাঁচ হাজার বয়লার পরিদর্শনের জন্য মাত্র পাঁচজন পরিদর্শক আছেন। ভাবা যায়!

বয়লার বিস্ফোরণের একের পর এক ঘটনা ঘটলেও এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার হচ্ছে না। কারখানার বয়লারগুলো নিয়মিত দেখভালের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রধান বয়লার পরিদর্শকের কার্যালয় নামে একটি আলাদা কার্যালয়ই আছে। তাদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভাবও বয়লার বিস্ফোরণের জন্য দায়ী। বয়লার বিস্ফোরণে এতগুলো প্রাণ হারিয়ে গেলেও একটিতেও দায়ী ব্যক্তিরা সাজা পাননি। এ কারণে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে।

শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের মুনাফার দিকে যতোটা মনোযোগ থাকে নিরাপত্তার দিকে তারা ততোটাই উদাসীন থাকেন। এটা কাম্য হতে পারে না। সবার আগে শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বয়লার পরিদর্শকের সংখ্যা বাড়িয়ে নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। কোথাও কোনো অনিয়ম বা ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হলেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমরা বয়লার বিস্ফোরণে আর কোনো প্রাণহানির ঘটনা দেখতে চাই না।

এইচআর/আরআইপি

  ‘বয়লার বিস্ফোরণের জন্য নানাবিধ কারণ দায়ী। অনুমোদনের চেয়ে বেশি চাপে বয়লার চালানোর জন্যই বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। আর এ জন্য কারখানার অসতর্কতা এবং অদক্ষতাই দায়ী। তৈরি পোশাকশিল্প, তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র, কেমিক্যাল কোম্পানি, চালকল ও ট্যানারি শিল্পে বয়লার ব্যবহার হয়ে থাকে। পোশাকশিল্পে ইস্তিরি বা শুকানোর কাজে এবং অন্যান্য শিল্পে উৎপাদিত দ্রব্য শুকানোর কাজেই সাধারণত বয়লার ব্যবহার হয়। ২২ দশমিক ৭৬ লিটারের বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো বয়লার হলেই তা নিবন্ধন করতে হয়।’

আপনার মতামত লিখুন :