দুদকের এই যাত্রা অব্যাহত থাকুক

লীনা পারভীন
লীনা পারভীন লীনা পারভীন , কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:২৯ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

“আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী, সাথী মোদের ফুলপরী” অথবা “এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি” –জনপ্রিয় দুটি বাংলা গানের কথা। যদিও গানগুলোর প্রতিটি শব্দের মাঝে রয়েছে আমাদের এই সুন্দর ও সুফলা দেশটির গুণগান বা দেশের মাটি জল বা আবহাওয়ার প্রতি মুগ্ধতার প্রকাশ কিন্তু গত কয়েক দশকের বাংলাদেশকে কিছু লোক আক্ষরিক অর্থে তাদের ইচ্ছেঘুড়ির দেশে পরিণত করে চলেছে।

কিছুদিন পর পর পত্র-পত্রিকার বরাত দিয়ে যে সব সংবাদ পাই তাতে মনে হতেই পারে যে এই দেশটা বুঝি আসলেই সম্পদের পাহাড় হয়ে গেছে আর এখানে যে কেউ চাইলেই যে কোন সময়ে যে কোন উপায়ে সম্পদশালী হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য কেবল দরকার একটু কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মাথা আর অন্যায় করে পয়সাওয়ালা হবার মত একটি মানসিক ইচ্ছা।

যদিও গীতিকার সুরকাররা গান লেখা বা সুর করার সময় এমন চিত্রের কথা ভাবতেও পারেননি কিন্তু এই দেশটিকে কিছু লোকের খেলনার পাত্র বানানোর খায়েশ দেখে না বলে আর থাকা গেলো না। তবে সম্ভবত যেমন ইচ্ছে তেমন খেলতে চাওয়ার দিনে সামান্য হলেও ধাক্কা লাগতে যাচ্ছে।

বর্তমান সরকার গত ১০ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় আছে। এবার টানা তৃতীয়বারের মত হলেও মোট চারবার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে এই সরকার। ইতিবাচক যে দিকটি আমাদেরকে আশান্বিত করে তোলে সেটি হচ্ছে সরকারের সদিচ্ছার প্রকাশ। অন্তত তারা যে স্বপ্নের কথা বলে ক্ষমতায় এসেছে প্রতিবার সেগুলোর সব না হলেও বেশিরভাগেরই বাস্তবায়নের উদাহরণ আমাদের সামনেই আছে।

যে সমস্যাগুলো আমাদের দেশকে আগাতে গিয়ে আগাতে দিচ্ছেনা তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুর্নীতি। এ দুর্নীতি আমাদের প্রিয় স্বদেশকে গ্রাস করে রেখেছে চারদিক থেকে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে এই ঘৃণিত বীজটি। তাই দুর্নীতি চাইলেই কেউ রাতারাতি দূর করে ফেলবে এ কথা একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। একশভাগ দুর্নীতি দূর করাও মোটামুটি একটি স্বপ্নের বিষয় তবে এক্ষেত্রে দরকার হচ্ছে সদিচ্ছা ও উপযুক্ত পদক্ষেপ।

কিছুদিন আগে একটি হিন্দি সিনেমা দেখেছিলাম যেখানে দেখাচ্ছিলো একজন ব্যক্তি তার পূর্বসূরির মাধ্যমে দুর্গম বনের মাঝে একটি খনির সন্ধান পায় যে খনি থেকে পরবর্তীতে সে টুকরো টুকরো করে সোনার কয়েন এনে এনে বিশাল সম্পদের মালিক হয়ে গিয়েছিলো এবং নারী গাড়ি থেকে শুরু করে সবরকম বিলাসী চর্চাই করছিলো। সেটা ছিলো শর্টকাটে পয়সাওয়ালা হবার উপায়। তারমানে কি এই যে সেই লাইনে কোন বিপদ ছিলো না? অবশ্যই ছিলো।

সেই লোকটা যেকোন সময়েই মারা যেতে পারতো বা অন্য কোন বিপদে পড়তেই পারতো কিন্তু তাও সে সেই পথটিকেই বেছে নিয়েছিলো। কারণ সেখানে তাকে নিজের যোগ্যাতার প্রমাণ দিতে হয়নি বা কোন প্রকার প্রতিযোগিতায় নামতে হয়নি। সহজে ও বিনা যোগ্যতায় বড়লোক হবার পথকেই সে বেছে নিয়েছিলো।

একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর কোটিপতি হয়ে যাবার গল্প পড়লে মনে হতেই পারে যে এখানেও হয়তো খনি আছে যার সন্ধান সবাই পায় না। আসলেই সে খনির সন্ধান সবার পক্ষে পাওয়া সম্ভব না কারণ সবাই সব রাস্তাকে নিজের বলে গ্রহণ করে না। অন্যায়ভাবে দেশের সম্পদ লুটপাট করে পয়সাওয়ালা হবার পথকে সবাই সঠিক মনে করতে পারে না তাহলে সে সমাজ আর সমাজ থাকে না।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা খোঁজ করলে এমন অনেক মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরে দুই চারজন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি পাওয়া যাবে যারা বিনা যোগ্যতায় অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করে অল্পদিনেই বিনা পুঁজিতে কোটিপতি হয়ে দেশে বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছে।

কষ্ট লাগে যখন দেখি অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হওয়া একটি দেশের কিছু লোক দেশটাকে লুটেপুটে খেয়ে কেবল নিজের সুখের কথাই চিন্তা করছে অথচ তাদের এই কর্মকাণ্ডের ফলে আরও কত লোকের ভাগ্য নষ্ট হচ্ছে সে ভাবনা ভাবার মত মনুষ্যত্ব তাদের নেই। অবশ্য এইসব নীতির কথা এখন আর কেউ শুনতে চায় না। সবাই চায় অল্প কষ্ট বা বিনা কষ্টেই বেশি ফল ভোগ করতে। কখন হতে পারে এমন অবস্থা?

যে দেশে সঠিক লেনে রাস্তা পার হবার জন্য মানুষকে বাধ্য করতে হয় সেদেশে যে আইনের শাসন বিন্দুমাত্র নাই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। আইনের শাসন কায়েমের জন্য প্রয়োজন কয়েকটি দিকের প্রতি মনযোগ দেয়া। এক শাসক দলের আন্তরিকতা আর আরেকদিকে প্রয়োজন জনগণের আন্তরিক অংশগ্রহণ ও সরকার বা প্রশাসনকে সহায়তা করা।

দেরিতে হলেও আমাদের দেশে দুর্নীতিতে “জিরো টলারেন্স” ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়েছে এর বিরুদ্ধে অভিযান। সরকার তার আন্তরিকতার ঘোষণা আগেই দিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকার তার একশভাগ আন্তরিকতাকে নিশ্চিত করেছে আর তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দুদকের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে। আশা করা যাচ্ছে সরকার দুদককে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিতেও আন্তরিক।

ইতিমধ্যে কিছু কেইস আমরা দেখতে পাচ্ছি যেখানে বেরিয়ে আসছে সোনার ডিম পাড়া গল্পের মত কাহিনী। পড়ছি আর ভাবছি এত দেখি যেমন ইচ্ছে করতে পারার মত এক রাজ্যের কাহিনী। তবে সে কাজগুলো কারা করছে? কেমন করে করতে পারছে আর কেনইবা করছে? একজন তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারির কেমন করে সাহস হবে এত বড় পুকুর চুরি করতে? যদি একজন পিয়ন বা কেরানী এত সাহস করে থাকে তাহলে তাদের উপরের লোকদের কী অবস্থা?

অবান্তর প্রশ্ন কি? না। তাই আশা করছি দুদক কাজ করবে নিজের কাছে পরিষ্কার থেকে। তারাও আমাদের মতই প্রশ্ন করবে এবং প্রশ্নের পিছনে প্রশ্ন রেখেই এগিয়ে যাবে উপরের দিকে। একজন পিয়ন বা কম্পিউটার অপারেটরেই যেন আটকে না থাকে এই অভিযান।

আমাদের ট্রাফিক ব্যবস্থার কাহিনী কে না জানে। কোন সেক্টরে কেমন করে সিন্ডিকেশনের মাধ্যমে দুর্নীতি চলে সে খবর এখন ওপেন সিক্রেট। আমরা চাই দুদক কেবল বেছে বেছে ধরবে না। দল মত পদবী বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে চলবে তাদের অভিযান। তাছাড়া দুর্নীতি কেবল টাকা চুরিকেই বলে না। একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে ঠকিয়ে নিজের স্বার্থকে উদ্ধার করাও দুর্নীতির মধ্যেই পড়ে।

দুর্নীতি কেবল ব্যক্তি করে না। জড়িত থাকে প্রতিষ্ঠানও। কখনও আবার গোটা প্রতিষ্ঠানই হয়ে উঠে দুর্নীতির আশ্রয়স্থল। প্রাথমিক বিদ্যালয় বা সরকারী অফিসের কর্মকর্তার সঠিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে কিন্তু তার আগে দরকার সমাজের মাঝে ঘুণ পোকা হয়ে যারা সর্বনাশ করছে তাদেরকে ধরা।

যারা সরকারের ভিতরে বা বাইরে থেকে সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বা করার চেষ্টায় লিপ্ত আছে ধরতে হবে তাদেরকেও। অর্থাৎ, চোরকে ধরার পাশাপাশি কাজ করতে হবে চোর তৈরির কারখানাকে ঠিক করার কাজেও। দরকার হলে ভেঙে নতুন করে করতে হবে তারপরও সামান্যতম জীবাণু রাখা যাবে না।

দুর্নীতি এমন এক জীবাণু যার বিস্তার ঘটে খুব দ্রুত আর এতে আক্রান্ত হওয়া মানুষের সংখ্যাও বাড়ে খুব দ্রুতই।

লেখক : কলামিস্ট।

এইচআর/আরআইপি

‘চোরকে ধরার পাশাপাশি কাজ করতে হবে চোর তৈরির কারখানাকে ঠিক করার কাজেও। দরকার হলে ভেঙে নতুন করে করতে হবে তারপরও সামান্যতম জীবাণু রাখা যাবে না।’