অরলান্ডোর চিঠি : দেয়ালের মাছি

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
ডা. বিএম আতিকুজ্জামান ডা. বিএম আতিকুজ্জামান
প্রকাশিত: ০২:১০ পিএম, ০২ নভেম্বর ২০১৯

নাসিমা বানু চুপ করে বসে আছে। তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। গোলাপী রঙের ওড়না দিয়ে তার মাথা ঢাকা। ওড়নার পাশ দিয়ে সোনালি চুমকির কাজ। হলুদ চোখের সাথে এ পোশাকটি মানাচ্ছে না।

বরাবরের মতোই নাসিমা খুব হালকা একটা আতর মেখেছে। রজনীগন্ধার মতো লাগে খানিকটা।

কখনো তাকে জিজ্ঞেস করিনি আসলে গন্ধটা কি রজনীগন্ধার? রোগীকে এসব কথা জিজ্ঞেস করতে নেই।

আমি নাসিমাকে একটি ন্যাপকিন এগিয়ে দিলাম। বললাম, ‘কেঁদো না।’

তবুও তার চোখের পানি থামছে না।

নাসিমা ঢাকার মেয়ে। গেন্ডারিয়ার রহমত মিয়ার ছয়টি সন্তানের সবচে’ সুন্দরী এবং বুদ্ধিমতী নাসিমা কলেজ শেষ করতে পারেনি।

পাড়ার বখাটে ছেলেরা তার পিছনে লেগে গিয়েছিল। মজলু ব্যাপারির বখাটে ছেলে তার সাথে বিয়ের প্রস্তাবও গিয়েছিল। তাতে রহমত মিয়া রাজি হননি।

নাসিমার মুখে অ্যাসিড ছোড়ার চিঠি হাতে পাবার পরই হবিগঞ্জের নাদির সর্দারের বাড়িতে পাঠানো হলো তাকে।

নাদির সর্দার তার বড় মামা। ছোটখাটো ঠিকাদারী আর ম্যানপাওয়ারের রমরমা ব্যাবসা তার।

হবিগঞ্জে এসে বড়ো শান্তি পেলো নাসিমা।

দু’মাসের মাথায় নাদির সর্দারের বন্ধুর ছেলে ফরিদ এলো ফ্লোরিডা থেকে। ফরিদের চোখে মুখে মার্কিন মার্কিন ভাব। সবাই জানে ওর দুটো গ্যাস স্টেশন আর একটা স্টোর আছে। দেশে এসেছে বিয়ে করতে।

নাসিমাকে এক নজর দেখেই ফরিদের পছন্দ হয়ে গেলো। লম্বা চওড়া হ্যান্ডসাম ফরিদের নাসিমার সব কিছুই পছন্দ। নাসিমা গান গাইতে পছন্দ করে, ছবি তোলার খুব শখ। কবিতা লেখা আর আবৃত্তির প্রতি তার দুর্বলতা। ফরিদের ওগুলোতে ঝোঁক নেই। তবে সাফ সাফ জানিয়ে দিলো, নাসিমার পছন্দই তার পছন্দ।

দু-সপ্তাহের মাঝে বিয়ে হয়ে গেলো। নাসিমার মা ফুল্লোরা বেগমের আপত্তি ছিল। তিনি চেয়েছিলেন মেয়েটি পড়াশুনা শেষ করে একজন অধ্যাপক হবে। সে আপত্তি ধোপে টেকেনি।

দু’মাসের মাথায় ফ্লোরিডাতে এসে পড়লো নাসিমা। দেখা গেলো ফরিদের সব কিছুই মিথ্যা। ও আসলে রাতের শিফ্টে দারোয়ানের কাজ করে। দিনে সময় পেলে উবারের গাড়ি চালায়। বেশ ক’টি মেয়েমানুষের সাথে তার গভীর সম্পর্ক।

আস্তে আস্তে নাসিমা জেনে গেলো ফরিদ সিটিজেন হবার জন্য এক পোর্টোরিকান মহিলাকে বিয়ে করেছিল। সে ঘরে একটি ছেলেও আছে। বিবাহবিচ্ছেদ হলেও তার সাথে এখনো সম্পর্ক আছে।

বিয়ের ছয় মাসের মাথায় জন্ডিস নিয়ে নাসিমা আমার কাছে এসেছিল চিকিৎসার জন্য। আজ জানা গেলো তার হেপাটাইটিস-বি হয়েছে। আমি তাকে রক্ত পরীক্ষার ফলাফল জানালাম। ফরিদের হেপাটাইটিস-বি রোগের ইতিহাসটি পুরোনো কাগজপত্র ঘেটে বের করেছে সে।

আমি হতবাক। এ রোগটি তো প্রতিকার করা যেতো।

আমি কখনো কখনো অদ্ভুত সব ঘটনার সামনে পড়ে যাই। জানিনা কি ভাবে নাসিমাকে সান্ত্বনা দেবো?

কখনো কখনো নিজেকে দেয়ালের মাছি বলে মনে হয়। সব দেখতে পারি। শুনতে পারি। আর ভনভন শব্দ করতে পারি।

এসএইচএস/এমএস