পরিবারের পৃথিবী ও ডোপ টেস্ট

স্বদেশ রায়
স্বদেশ রায় স্বদেশ রায়
প্রকাশিত: ১০:১৫ এএম, ২১ নভেম্বর ২০১৯

সন্তানের জন্য পিতার হৃদয়ের আর্তনাদের থেকে বড় কোনো আর্তনাদ আছে কিনা- এ প্রশ্ন না করাই ভালো। এ আর্তনাদ গভীর নিস্তব্ধ রাতের মহাসমুদ্রের জলরাশিতে টাইফুন যে আর্তনাদ তোলে তার থেকেও অনেক বেশি গভীর ও সুতীব্র। সামরিক শাসকের গুলিতে মৃত সন্তানের পাশে দাঁড়ানো পিতার আর্তনাদ শুনেছি। আবার সেই পিতাকেও দেখেছি যার নিষ্পলক চোখ এক নিঃশব্দ আর্তনাদ করছে, তার নিখোঁজ সন্তানের জন্য। মাত্র কয়েকদিন আগে এভাবে আরেক পিতার আর্তনাদ শুনতে হবে তা কল্পনায় ছিল না। তিনি শিক্ষিত মানুষ। জীবনের স্রোতে অনেক পথ পার হয়ে এসেছেন। তার বিবেচনা, তার ধৈর্য অনেক বেশি।

তারপরও একপর্যায়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে একবুক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘আমি শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এবং সর্বোপরি সরকারকে বলব, আপনারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদক দূর করুন। আমার মতো আর কোনো পিতার যেন মাদকের জন্য এমন করে বুক ভেঙে না যায়। একজন পিতা আকাশসম আশা নিয়ে তার সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। মাদক এই আশার ওপর কীভাবে আঘাত হানে তার শেষ উদাহরণ যেন একমাত্র আমিই থাকি। আর কোনো বাবাকে যেন এই দুঃসহ পাথর ভার সহ্য করতে না হয়।’

তার অনেক কথার ভেতর দিয়ে জানতে পারি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের কনসার্টে সারারাত তার সন্তান থাকার পর তিনি যখন ওই সন্তানকে আনতে যান, তখন তিনি তার সন্তানকে চিনতে পারছিলেন না। বিশটা বছর ধরে যে সন্তানকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। কারণ ওই সন্তানের কোনো ব্যবহারই তার নিজ চিন্তার ব্যবহার ছিল না। সবই ছিল মাদকের প্রতিক্রিয়া। আন্দোলনের এ ক’দিনে তার সহযোগীরা তাকে সব ধরনের মাদক খাইয়েছে।

মাত্র কদিন মাদক নিয়েই একটি সুস্থ, চিন্তাশীল ও পড়ুয়া তরুণের আসলেই কি এতটা পরিবর্তন সম্ভব? এ প্রশ্ন মনে জাগে। কিছুটা সন্দেহ হয় ওই পিতার প্রতি। অবশ্য ওই পিতার চোখে মুখে যে ভাষা দেখেছি তাতে তাকে সন্দেহ করার পক্ষে খুব বেশি জোর পাইনি। এ কারণে বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ফোন করি, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মোহিত কামালকে। তার কাছে জানতে চাই হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজা কদিন সেবন করলে, একজন পুরোপুরি এডিক্টেড হয়ে যায়। ড. মোহিত কামাল তার বিজ্ঞানের ভাষায় বুঝালেন, তারা এখন এডিক্টেড বলেন না, তারা বলেন রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া। কারণ এগুলো সবই রাসায়নিক বস্তু। এগুলো শরীরে প্রবেশ করে ব্রেনের স্বাভাবিক কার্যক্রম নষ্ট করে দেয়। এরপর তিনি ব্রেনের অনেক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার কথা বললেন, সেগুলো সবই মেডিকেল টার্ম। তার অতটা গভীরে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে যাই তার কথার ভেতর দিয়ে। সেটা হলো পরপর তিনদিন এ ধরনের মাদক শরীরে গ্রহণ করলে ব্রেনের স্বাভাবিক কাজ যেমন পরিবর্তিত হয়ে যায় তেমনি ওই ব্যক্তির পক্ষে খুব ভালো চিকিৎসা ছাড়া মাদক থেকে দূরে থাকা কঠিন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের সময়ে এই মাদক সম্পর্কে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বা আছেন এমন অনেকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, বর্তমানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপকের সঙ্গে পরিচয় তার ছাত্রজীবন থেকেই। সন্তানের মতোই তাকে স্নেহ করি। আমার কাছে কোনো কিছু লুকাবে না জেনেই তার সঙ্গে বিষয়টি প্রথমে আলাপ করি। তার কাছে ওই পিতার সন্তানের কথা তুলতেই বলেন, ‘ওই ছাত্রটি কি বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছে?’ উত্তরে তাকে জানাই, ‘ওই পিতা জানিয়েছেন তার সন্তান ছাত্র ইউনিয়নে নাম লিখিয়েছে’। তখন ওই সহকারী অধ্যাপক বলেন, ‘তাহলে ঠিকই আছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থীদের অনেকেই মাদক সেবনকে আধুনিকতা মনে করে এবং ওই পিতা যে কথা বলেছেন, এটাও সত্য, বামপন্থী ছেলেমেয়েরা একসঙ্গেই মাদক সেবন করে। অনেক ক্ষেত্রে বামপন্থী কিছু শিক্ষক এ কাজে উৎসাহ দেন। এই আন্দোলনের সময় যদি এটি ঘটে থাকে তাহলে সেটা জাহাঙ্গীরনগরের জন্য স্বাভাবিক।’

এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগ আছে এমন এক তরুণকে দিয়ে জাহাঙ্গীরনগরের মাদকের বিষয়ে কিছু খোঁজ নিলাম। তার খোঁজ-খবরের মাধ্যমে জানতে পারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অধিকাংশই ছাত্রলীগের সদস্য। আবার এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ আছে এমন এক শিক্ষিকার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি জানালেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দিকে গেরুয়া বাজার বলে একটা বাজার আছে। সেখানে হুজুরের মতো সাজে একজন লোকের একটি ঘর আছে, সে-ই অধিকাংশ মাদক সরবরাহ করে। তাছাড়া তার ঘরের পাশে এক মহিলার ঘর আছে, সেখানে রাতের বেলা অনেক ছাত্রছাত্রী মাদক সেবন করে।’

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছেলের সঙ্গে মাদক নিয়ে কথা হয়। তাকে বলি, ‘তোমাদের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সামনের মাঠে গত নির্বাচনের আগে কয়েক রাতে হাঁটতে গেছি। সেখানে দেখেছি রাতের বেলা গাড়ি নিয়ে এসে নেমে কয়েক তরুণ ফেনসিডিল খায়। এখন ওইসব জায়গার কী অবস্থা? ছেলেটি জানায়, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন মাদক কমেছে, তবে বেড়েছে বুয়েটে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বুয়েটে এ বিষয়ে আরও খোঁজ-খবর নেয়ার একটা তাগিদ যখন মন থেকে খুব বেশি অনুভব করছিলাম, তখন ১৮ নভেম্বরে কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় দেখি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের ডোপ টেস্ট করবে। বর্তমানে মাদক ব্যবহারের যে ব্যাপকতা এবং গত কয়েকদিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যা জানলাম তাতে শাবিপ্রবির এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। পাশাপাশি কতকগুলো বিষয় ভাবনার ভেতর আসে। শাবিপ্রবির এই ডোপ টেস্ট সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করা উচিত। এটা শুধুমাত্র ভর্তির সময়ে নয়, প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে অন্তত এক-দুইবার করা যেতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া যায় কিনা সেটাও ভেবে দেখা যেতে পারে যে যদি কোনো ছাত্রছাত্রীর ডোপ টেস্টে তাকে মাদকাসক্ত জানা যায়, তাহলে সে ছাত্রত্ব হারাবে।

এখন আবার ফিরে আসি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে। ওই পিতার আর্তনাদের মতো আরও অনেক আর্তনাদ সৃষ্টি করেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মাদক। তাই শাবিপ্রবির মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ওই সিদ্ধান্তের ফলে যদি একশ্রেণীর ছাত্রছাত্রীর ছাত্রত্ব চলে যায় সেটাকেও স্বাগত জানাবে জাতি। র‌্যাব কর্তৃপক্ষ মাদক নির্মূলে এ পর্যন্ত অনেক অভিযান চালিয়েছে। তারা সফলতাও পেয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদক সাপ্লাইয়ের জায়গা গেরুয়া বাজার ও বিশমাইল এলাকার মাদক ধ্বংসে র‌্যাব অবিলম্বে সফল হবে এটাই আশা করা যেতে পারে।

সর্বোপরি, এটাই সত্য, আমাদের সন্তান, আমাদের আগামী প্রজন্মকে আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। সেরা মানুষ হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সন্তানও যদি ধ্বংস হয়ে যায়, সেটা অনেক বড় ক্ষতি। কোটি মানুষের দেশে একটি সন্তান ধূলিকণাসম মনে হতে পারে কিন্তু যে পরিবারের সন্তানটি নষ্ট হচ্ছে, ওই পরিবারের কাছে সন্তানটি পৃথিবীসম বৃহৎ।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

এইচআর/বিএ/জেআইএম