দর্শক-পাঠকদের ‘কনফার্মেশন বায়াস’ রোগ

আনিস আলমগীর
আনিস আলমগীর আনিস আলমগীর , সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১০:২০ এএম, ১৩ আগস্ট ২০২০

নেটে নিজের পুরোনো একটা লেখা খুঁজছিলাম বৃহস্পতিবার জাগো নিউজের জন্য নির্ধারিত কলামে একটি তথ্য যোগ করবো বলে। খুব দরকার ছিল। কিন্তু পেলাম না। আমার নিজের ওপর খুব রাগ হয় যে, নিজেই নিজের লেখা সংগ্রহে রাখি না। কীভাবে যেন মাথায় ঢুকেছে যা কিছু লিখছি তা এমন কী যে সংগ্রহে রাখতে হবে! যদি এমন বিখ্যাত কেউ হই মরার পর হলেও লোকে সেটা খুঁজে নেবে। আর বিখ্যাত না হলে এসব সংগ্রহে থাকা না থাকা সমান। কালের বিবর্তনে এখন যেটাকে পাঠক এবং লেখক নিজেও মূল্যবান কিছু মনে করছেন- তা আবর্জনা হিসেবে পড়ে থাকবে।

বছর খানেক আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে জানাল একটি মজার তথ্য। সে আমার বিদেশ-সংক্রান্ত কলামগুলো সংগ্রহ করে নিজেদের সার্কেলের মধ্যে বিলি করার জন্য বই করেছে। কারণ বাংলাদেশে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য বিদেশ ইস্যুতে বই নেই। থাকলেও তাতে নাকি সমসাময়িক তথ্য নেই। বিশ্লেষণ নেই। সে বললো, চাইলে সে পাঠাবে যাতে আমি বই করে বাজারে দিতে পারি।

আমার সাংবাদিকতা জীবনের প্রথমদিকের কিছু লেখা সংগ্রহে ছিল। বিয়ের পর ‘তিনি’ পুরোনো পত্রিকা বিক্রিকালে সেই সংগ্রহের পত্রিকা-ম্যাগাজিনগুলোও ফেরিওয়ালাকে দিয়ে দিয়েছেন, ঘর পরিষ্কার করার নামে। ইন্টারনেট আসার পর এখন ভরসা করি যে দরকার হলে ইন্টারনেটে পাওয়া যাবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখছি, কর্তৃপক্ষ বারবার সার্ভার বদল করার কারণে সেই লেখা নেটেও পাওয়া যায় না। আবার অবাক হয়ে তা পাই অন্য কোনোখানে, যেখানকার জন্য আমি লিখিনি। মানে তারা সেটা রিপোস্ট করেছেন, আমার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে ছাপানোর অনুমতি নেননি।

যাক আজকাল নেটে লেখার কারণে সোশ্যাল মিডিয়া, ইমেইলে পাঠকদের যে প্রতিক্রিয়া পাই সেটা নিয়ে কিছু কথা বলবো ভাবছি। শুরুতে যা বলছিলাম, নেটে আমারই দরকারি একটি লেখা খুঁজছিলাম। সেটি খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, এক পরিচিতি ডাক্তার তার কলামে আমার এক ফেসবুক স্ট্যাটাস টেনে কিছু কথা বলেছেন। সেখানে এক পাঠক কলামিস্টকে খোঁচা মেরে মন্তব্য করেছেন: [কোরবানি আসলে একটাই চিৎকার ‘আহারে প্রাণীগুলা হত্যা করতেছে। গরুই শুধু প্রাণী, মাছ কোনো প্রাণী না, আর গাছেরও প্রাণ নাই।]

খুব হাসি আসলো। আমি বেশিরভাগ সময় মজা পাওয়ার জন্যই এসব পড়ি। মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়ায় পাঠকদের বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়। অবশ্য ফেসবুকে নিউজের লিংকের নিচে বাংলাদেশি এবং কলকাতার লোকদের মন্তব্যগুলো বেশিরভাগই আমার কাছে হিংসাত্মক, সাম্প্রদায়িক এবং একপেশে মনে হয়। যারা মন্তব্য করেন তারা অন্যের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কিন্তু নিজে নিরপেক্ষ মানুষ কিনা সে প্রশ্ন নিজেকে করেন না। আর একটি বিষয় দেখি যারা বেপরোয়া মন্তব্য করেন তাদের প্রোফাইল লক করা বা ফেক আইডি। ওরা হয়তো ভাবেন অন্যরা বেকুব।

আমি আমার কলামের নিচে যে মন্তব্য ওয়েবসাইটে দেখি তা অবশ্যই পড়ি এবং পারলে প্রয়োজনে পার্সনালিও জবাব দেই। প্রকাশ্যে জবাব দেই না কারণ সেখানে অন্যেরা নাক গলায়। আর আমার ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার দিলে তো বন্ধুদের সঙ্গে মতবিনিময় করিই। আমি খুব আনন্দিত হই এই একটি কাজে। কিন্তু যে পোর্টাল বা পত্রিকার জন্য লিখি তাদের ফেসবুক পাতায় সেটা শেয়ার হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পড়ি না, কারণ এসবের সিংহভাগে থাকে লেখার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে গালাগালি। আমার লেখার পক্ষ নিয়েও নির্দিষ্ট কয়েকজন পাঠককে ভিন্নমত পোষণকারী উগ্রবাদীদের আক্রমণ করতে দেখি। এসব বেশিরভাগ মন্তব্য থাকে লেখার সঙ্গে সম্পর্কহীন। পাঠকরা যে নিজেরাই চূড়ান্তভাবে পক্ষপাতিত্ব করেন, সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেখানে। অথচ আমার কলামের বক্তব্যের সমালোচনা করে বলছেন আমি পক্ষপাতিত্ব নিয়ে কলাম লিখছি।

এই বিড়ম্বনা নিয়ে ১২ আগস্ট ২০২০ সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের প্রধান মোহাম্মদ আলী আরাফাতের দেয়া একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি। তিনি লিখেছেন: [মুক্তিযুদ্ধের কথা বললে, ওদের ভাষায় আমি ‘চেতনাবাজ’। বঙ্গবন্ধুর কথা বললে, ওদের ভাষায় আমি ‘ভারতের দালাল’। আওয়ামী লীগের কথা বললে, ওদের ভাষায় আমি ‘দেশদ্রোহী’। শেখ হাসিনার কথা বললে, ওদের আমি ‘জাতশত্রু’। পাকিস্তানের পা-চাটা দালাল, ৭১ এর রাজাকার, ওদের বাপেরাও মুক্তিযোদ্ধাদের একই কথা বলতো, আজকের রাজাকার শাবকরা আমাদের একই কথা বলে। স্বাধীন বাংলাদেশে রাজাকারের বাচ্চাদের ঔদ্ধত্য দেখলে অবাক লাগে।]

আমার সমস্যা মোহাম্মদ আলী আরাফাতের থেকে আরও বেশি। সোশ্যাল মিডিয়ায় সুযোগ পান বলে তারা মনের মাধুরী মিশিয়ে আমাকে একদিন এক পক্ষের বানিয়ে সুখ পান। আমি যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিখি তাদের ভাষায়- আমি শাহবাগী, ভাদা (ভারতীয় দালাল), চেতনাবাজ। আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো লেখা গেলে- বাকশালী, সরকারি দালাল। বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা করলেও একই রকম টাইটেল- সরকারের দালাল। ভারতের পক্ষে কোনো লেখা গেলে দিল্লির গোলাম, ‘র’- এর এজেন্ট। ইসলামী দল, বিশেষ করে জামায়াত-শিবির এবং মুসলিম জঙ্গিদের সমালোচনা করলে নাস্তিক (দুইবার হজ করলাম তারপরও)।

বাংলাদেশি হিসেবে আমি কোনো দেশেরই বিদ্বেষী না কিন্তু মোদির হিন্দুত্ববাদের সমালোচনা করলে, মুসলমানকে নির্যাতনের কথা বললে হিন্দু জঙ্গিরা বলে আমি মৌলবাদী, পাকিস্তানের দালাল, ভারতবিদ্বেষী। আবার পাকিস্তানের সমালোচনা করলে পাকিপ্রেমীরা বলে ভারতের পা-চাটা গোলাম। হিন্দুর ঘরে জন্ম।

মুসলিমদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে লিখলে, আইএসে নাম লিখিয়েছে, হেফাজতি, সুক্ষ্মভাবে নাকি মুসলিম মৌলবাদের পক্ষে মগজধোলাই করি। বিএনপির বা বিরোধী দলের ওপর সরকারি নির্যাতনের সমালোচনা করলে, আওয়ামীরা বলে- তিনি সুশীল। ‘ও তো আমাদের না।’ বিএনপি বলে, তোর দরদ দেখাতে হবে না। সরকারের দালালি নিয়ে থাক। লাইন পরিবর্তন করছে।

শুনলে আশ্চর্য হবেন, লেখালিখির জন্য সবচেয়ে বেশি হিংসাত্মক গালি খেয়েছি কথিত প্রগতিশীলদের থেকে, যাদের অনেকে চেনে বামাতি হিসেবে। নাস্তিক-ব্লগারদের ধান্ধা কার্যক্রমের সমালোচনা করায়, হাইকোর্টের সামনে থেকে গ্রিক দেবী থেমিসের মূর্তি অপসারণ এবং রামপাল বিদুৎকেন্দ্র সমর্থন করায় ওরা পেজ খুলে গালাগালি করেছে। ছাত্র ইউনিয়নের এক সাবেক সভাপতি বাংলা ট্রিবিউনের কাছে আবেদন করেছে আমার লেখা যাতে প্রকাশ না করে। কী দুর্ভাগা জাতির, এরা আবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনীতি করে! অবশ্য মন খারাপের সঙ্গে সুখের খবরও কম নেই। যত সংখ্যক তারা বিরোধিতা করেছে তার চেয়ে শতগুণ বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী এমন ক্রিটিক্যাল সময়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে লেখা না থামাতে উৎসাহও দিয়েছেন।

আমাকে কোনো পক্ষে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে অনেকে আবার নিজেরাই বিভ্রান্ত। সর্বশেষ মোদির বিরুদ্ধে কথা বলেছি বলে এক হিন্দু জঙ্গি আমাকে পাকিপ্রেমী বানাতে গিয়ে ব্যর্থ চেষ্টা করে। উল্টো আমিও পাকিস্তানের মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে লিখলে সে লিখেছে, ‘তা কাকু এখন বুঝতে পারছি আপনি কোন ক্ষেতের মাল।’

সমস্যাটা এখানেই। আমাদের পাঠক-দর্শক-সমালোচক সবাই নিজে যখন একটি পক্ষের ‘মাল’ হয়ে থাকেন, তখন তারা অন্যকেও তাই ভাবেন। তারা এটা ভাবতেই পারেন না যে, কোনো কোনো লোক তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে। অন্ধ নয়।

আমি বহুদিন বলেছি ‘বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু এবং বাঙালিয়ানার পক্ষে আমার পক্ষপাত আছে।’ এর মধ্যে বাঙালিয়ানা নিয়ে আবার ১৬ আনা পক্ষপাত আছে কি-না তাতে আমি সন্দিহান। একটু হয়তো ঘাটতি আছে। আর বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু বললে মুক্তিযুদ্ধ আসবেই। এক্ষত্রে কোনো আপস নেই। আবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যারা রাজনীতি করেন স্বাভাবিক কারণেই তারা আমার কাছের লোক। তাই বলে আমি কি আমার নিজের বায়াসনেস দ্বারা পরিচালিত হই? না, পারতপক্ষে হই না। পক্ষ না নিয়েও লেখা যায়। একজন সাংবাদিকের তাই করা উচিত। সত্যের সঙ্গে থাকা উচিত, সেটা কার পক্ষে-বিপক্ষে যাচ্ছে ভাবার দরকার নেই। কারণ আখেরে সত্যের জয় হয়।

আমাদের পাঠক-দর্শক কি বায়াস? হ্যাঁ। নব্বইভাগ ক্ষেত্রে তাই। তারা সাংবাদিক থেকে শতগুণ বায়াস। ‘কনফার্মেশন বায়াস’ নামে একটি বিষয় আছে। অক্সফোর্ড ডিকশনারি দেখেন। তারা সেই রোগের শিকার। তাদের মনে একটা বিশ্বাস এবং থিওরি রয়েছে, মনে মনে একটা বিষয় তারা নিজেদের মতো চিন্তা করে রাখে। তার সঙ্গে যখন অন্যের লেখা, বিশ্বাস বা বক্তব্য মিলে যায় তখন তাতে অপার আনন্দ পান। সেটা দিয়েই বক্তব্য প্রদানকারীকে ভাবেন নিরপেক্ষ লোক। আর যখন মেলে না তখন ভাবেন অন্যপক্ষের দালাল।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, সে কারণে পৃথিবীতে নিরপেক্ষ থাকা, নিরপেক্ষ লোক পাওয়া খুব কঠিনতর একটি বিষয়। আমরা যেটা করতে পারি সেটা হচ্ছে কনফার্মেশন বায়াসনেস ত্যাগ করা। তাহলে আমাদের মস্তিষ্ক কোনটা সাদা আর কোনটা কালো- সেটা চেনাতে সক্ষম হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

এইচআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]