করোনার ভ্যাকসিন পাওয়া নাগরিক অধিকার

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:১৪ এএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২১

ড. প্রণব কুমার পান্ডে  
কোভিড-১৯ এই শতাব্দীর অন্যতম মারাত্মক বিপর্যয় হিসাবে ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী সমস্ত সেক্টরকে পঙ্গু করেছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে চিহ্নিত হবার পরে ভাইরাসটি তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এটি অর্থনীতি এবং অন্যান্য খাতগুলোকে নেতিবাচক ভাবে প্রভাবিত করার পাশাপাশি মানুষের জীবন-যাত্রা ও আচরণে  পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে। সামাজিক দূরত্ব (শারীরিক দূরত্ব) নিশ্চিত করা এই ভাইরাস সংক্রমণ রোধে অন্যতম কার্যকর কৌশল হিসাবে বিবেচিত হওয়ায় জনগণ বন্দী জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছে। বাড়িতে থাকতে বাধ্য হয়ে, বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে সমাজের অন্যান্যদের থেকে বিচ্ছিন্নতার বোধ সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জনগণের মতো বাংলাদেশের জনগণ কোভিড -১৯ এর অর্থনীতিক, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এবং সমাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে।

এখন, একটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল ২০২০ সালে বাংলাদেশ সরকার এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের মোকাবেলা কতটা সফলভাবে করতে পেরেছে? প্রকৃতপক্ষে, কোভিড -১৯ এর প্রভাবের তীব্রতা প্রায় প্রতিটি দেশেই বেশ ব্যাপক ছিল। সমালোচকরা যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন এই বলে যে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী কোভিড -১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি অনেকে মহামারির প্রাথমিক পর্যায়ে  এই ভাইরাসটির বিপর্যয়কর প্রভাব এবং সেই সম্পর্কে  পূর্বাভাস দিতে স্বাস্থ্য বিভাগের অক্ষমতারও সমালোচনা করেতে পারেন।  

তবে, আমরা যদি অন্য দেশের সাথে বাংলাদেশের তুলনা করি, একটি বিষয় দিবালকের মতো স্পষ্ট হবে যে বাংলাদেশের সরকার এই মরণঘাতি ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সফলতার সাথে কাজ করেছে। সরকারের এই সফলতার কারণে ব্লমবার্গ এর কোভিড -১৯ রেসিলিয়েন্স র‌্যাংকিংয়ে  বাংলাদেশ প্রশংসিত হয়েছে। মারাত্মক ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসাবে জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে এবং ভারতসহ অনেক উন্নত ও প্রতিবেশি দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ কোভিড -১৯ রেসিলিয়েন্স র‌্যাংকিং এ বিশ্বের ২০টি সফল দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। এমনকি কোভিড -১৯ এর মৃত্যুর হারও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশ কম।

২০২০ সালে মহামারির নেতিবাচক প্রভাবের কারণে বেশিরভাগ দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। অনেক উন্নত দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সঙ্কটের সময়ে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায়, যারা নেতিবাচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে বেশ ভাল অবস্থানে দেখা গেছে । এটি বর্তমান সরকারের অন্যতম শক্তিশালী অর্জন। সরকার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার (যেমন এডিপি, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের) অনুমান অনুযায়ী ২০২১ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট ভাল হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।  

১২০,০০০ কোটি টাকার একটি বিশাল উদ্দীপনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের  সরকারি সিদ্ধান্তের ফলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এই উদ্দীপনা প্যাকেজটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কম খরচে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সরকারী সিদ্ধান্তটি প্রায় সকল পক্ষ থেকে অত্যন্ত প্রশংশিত হয়েছে। এই মহামারি চলাকালীন সময়ে সরকারের সফলতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমাদের সকলের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ হওয়া উচিত। এমনকি, শতাব্দীর সবচেয়ে খারাপ সময়ে সরকারের শক্তিশালী কূটনীতির কারণে বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ব্যাংক এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারা কোটি কোটি ডলার ঋণ সহায়তা প্রদান করেছে বাংলাদেশকে। এটি স্পষ্টতই ইঙ্গিত করে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সরকারের উপর এই সংস্থাগুলোর যথেষ্ট আস্থা রয়েছে। 

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উপরোক্ত সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী মহামারির সূচনা লগ্ন থেকেই দেশবাসীকে কৃষি পণ্যের উৎপাদন চালিয়ে যেতে কৃষকসহ সকলকে উৎসাহিত করে চলেছেন। সুতরাং, কৃষকরা মহামারীকালীন সময়েও পর্যাপ্ত পরিমাণে কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন করে দুর্যোগকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে যা দেশবাসীকে মহামারির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাহায্য করেছে। 

এমনকি, প্রবাসীরা এমন সময়ে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করে দেশকে সহায়তা করেছেন যখন প্রায় ৮ মিলিয়ন বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ হারিয়ে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ আগের যে কোন সময়ের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে দেশ অর্থনৈতিকভাবে একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সরকারকে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে যে সম্পর্কে আমাদের অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন। সরকার যদি এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে হাজার হাজার চাকুরীহারা মানুষের চাকুরীর সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বিভিন্ন ধরনের সমালোচনার মাঝে গত জুন মাসে অর্থনীতি পুনরায় চালু করার সরকারের সাহসী সিদ্ধান্ত কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এমন সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া্র সম্ভাবনা ছিল। ভাগ্যক্রমে, এটি খারাপের দিকে যায়নি এবং সরকার অর্থনীতির গতি সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে। মহামারিটির প্রথম পর্যায়ে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ করোনা রোগীদের চিকিৎসা প্রদান এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা পরিচালনা করতে হিমশিম খেলেও স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছিল। এমনকি, সময়ের সাথে সাথে স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের মধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত গোঁড়ামি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে, দেশের জনগণের দুর্ভোগ লাঘব ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হয়েছে যা সরকারের একটি ইতিবাচক প্রাপ্তি।

যেহেতু আমরা পুরাতন বছর পেরিয়ে নতুন বছর শুরু করেছে, স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের সকলের মধ্যে একটা প্রশ্ন হল ২০২১ সালের দেশবাসীর প্রত্যাশা কী? যদিও সরকার প্রত্যাশা করেছিল যে শীতকালে কোভিড -১৯ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, তবে পরিস্থিতি অবশ্য এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে, আমাদের এই নিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার সুযোগ খুব বেশি নেই, কারণ যে কোন সময় পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। সুতরাং, নতুন বছরে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল ভাইরাসটির বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া। 

ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি যে যুক্তরাজ্যে ভাইরাসের নতুন স্ট্রেন আবিষ্কৃত হয়েছে যা বর্তমান স্ট্রেনগুলোর চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ তীব্রতার সাথে মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে। ফলে, সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ হ'ল ভাইরাসের এই নতুন স্ট্রেন যেন বাংলাদেশে বিস্তার না করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া। সরকার ইতিমধ্যে কোভিড-১৯ সংক্রামণ মুক্ত সনদ ছাড়াই যুক্তরাজ্য থেকে যারা বাংলাদেশ ভ্রমণ করছে তাদের জন্য কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  এই সিদ্ধান্তটিকে বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কোন ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যথায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

সরকারের জন্য দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জটি হ'ল সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে টিকা প্রদান প্রক্রিয়া পরিচালনা করা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বেসামরিক নাগরিকদের মতো এই ভ্যাকসিন উদ্ভাবন বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আশাবাদ তৈরি করেছে। 

বিভিন্ন মিডিয়া সূত্রের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে সরকার ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের একটি নির্দেশিকা প্রস্তুত করেছে। তাদের উচিত নির্দেশিকা অনুসরণ করে সঠিক ভাবে টিকা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাতে কোনও নাগরিক বঞ্চিত বোধ না করে। তবে, সরকারি টিকা প্রদানের অগ্রাধিকার ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে বয়স্কদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা আবশ্যক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী টিকা প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাতের জড়িত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন যেটি একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তবে বেসরকারী খাত এই প্রক্রিয়ায় যেন একচেটিয়া প্রাধান্য বিস্তার না ঘটাতে পারে সেই বিষয়টি অবশ্যই সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সবার মনে রাখা উচিত যে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্রহণ নাগরিকদের অধিকার। এই অধিকার নিয়ে কোনও সংস্থা যেন ব্যবসা করার সুযোগ না পায় সেটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি এটি হয়, তাহলে দেশের নাগরিকরা হতাশ হবে। 

যদিও এখন কোভিড -১৯ পরিস্থিতি দেশে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তবে আশঙ্কা রয়েছে যে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর অসতর্কতা যে কোনও মুহূর্তে সঙ্কটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সুতরাং, নাগরিকদের অবশ্যই মহামারি চলাকালীন সময়ে সংবেদনশীল আচরণের মাধ্যমে সরকারকে সহায়তা করতে হবে। নাগরিকরা সংবেদনশীল আচরণ না করলে সরকারের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। অতএব, মহামারি পরিস্থিতি সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠার জন্য সমস্ত অনুঘটকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করা উচিত।

আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে শেখ হাসিনার দৃঢ় ও পরিপক্ক নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো সফলভাবে মোকাবেলা করেছে। তাঁর সাহসী সিদ্ধান্তই অর্থনীতির গতিশীলতা বজায় রাখতে এবং কোভিড -১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সঙ্কটের মোকাবেলা করতে সাহায্য করেছে। সুতরাং, এটি প্রত্যাশিত যে ভ্যাকসিন গ্রহণ করে ২০২১ সালে একটি মুক্ত জীবন যাপনের জন্য বাংলাদেশের মানুষ উদগ্রীব হয়ে আছে। আমাদের এখন প্রয়োজন টিকা না পাওয়া পর্যন্ত সংবেদনশীল আচরণের মাধ্যমে সরকারকে সহযোগিতা করা।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের প্রফেসর।

এইচআর/এমকেএইচ

আমাদের সবার মনে রাখা উচিত যে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্রহণ নাগরিকদের অধিকার। এই অধিকার নিয়ে কোনও সংস্থা যেন ব্যবসা করার সুযোগ না পায় সেটি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আর যদি এটি হয়, তাহলে দেশের নাগরিকরা হতাশ হবে

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]