কল্যাণ পার্টির ‘দোয়া মাহফিল’ এবং রাজনীতিতে অকল্যাণের আশঙ্কা

বিভুরঞ্জন সরকার
বিভুরঞ্জন সরকার বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ এএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২১

গত ১৬ জানুয়ারি, শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে একটি ‘দোয়া মাহফিলকে’ কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে। ওই দোয়া মাহফিলে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতি এবং বক্তৃতার ধরন ও সুর থেকে অনেকের কাছেই অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দোয়ার নামে আসলে একটি রাজনৈতিক সমাবেশ করার কারণ কী, সে প্রশ্নও উঠেছে।

দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহম্মদ ইব্রাহীম, যিনি বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি নামের একটি রাজনৈতিক দলের সভাপতি। এই দলটি আবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের একটি শরিক দল। নানা কারণে জেনারেল ইব্রাহীম কিছুটা পরিচিত হলেও তার দলের সাংগঠনিক কাঠামো খুবই দুর্বল। সেমিনার বা মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি করতে পারলেও জনসভার মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি করার সামর্থ্য এই দলটির নেই। তারপরও বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতায় কল্যাণ পার্টি টিকে আছে। দলের প্রধান জেনারেল ইব্রাহীমের ব্যক্তিগত পরিচিতি ছাড়া দলের আর কোনো সম্পদ আছে বলে মনে হয় না। দলের আর দু-একজন নেতার নামও কারো জানা আছে কিনা সন্দেহ।

দেশের মঙ্গল কামনায় ‘দোয়া মাহফিল’ করা যেতেই পারে। কিন্তু দোয়া মাহফিলের ব্যানার টাঙিয়ে সরকারবিরোধী আলোচনা সভার আয়োজন কেন– প্রশ্ন সেখানেই। দোয়ার নামে আলোচনার ফাঁকে বক্তারা পুরো সময় সরকারের নিন্দা-সমালোচনা করেছেন। ঘটা করে সাংবাদিকদেরও উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছিল। এ থেকেই বোঝা যায়, উদ্যোক্তারা প্রচার চেয়েছিলেন এবং সেটা উদ্দেশ্যহীন নয়। দোয়ার অনুষ্ঠানে একপর্যায়ে বক্তাদের কেউ কেউ বলেছেন, শুধু দোয়া করলেই সরকারের পতন হবে না, এ জন্য কাজও করতে হবে। অর্থাৎ দোয়ার নামে সরকার পতনের পরিকল্পনাই ছিল উদ্দেশ্য। দোয়া মাহফিলে ২০-দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের উপস্থিতিও অকারণ নয়।

বিএনপি ও জামায়াত নেতারা বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যে ভাষায় সরকারের যেসব সমালোচনা করে থাকেন, ওই দোয়া মাহফিলেও সে রকম বক্তব্যই দিয়েছেন যোগদানকারীরা। সেখানে যোগদানও করেন বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলের পরিচিত নেতারা। নির্মোহ দোয়ার পরিবর্তে কীভাবে সরকারের পতন ঘটানো যায় তা নিয়েই কথা বলেছেন সবাই। অনুষ্ঠানে যোগদানকারীদের মধ্যে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সেনা, বিমান ও নৌ বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ৫০ জন কর্মকর্তা। এর বাইরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সচিবসহ সাবেক আমলাদের কয়েকজনের উপস্থিতির খবর রাজনীতি সচেতন অনেকের মনেই কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না থাকলেও সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) ফখরুল আজম দোয়ার অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমরা যে বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলাম তা দেখতে পাচ্ছি না। সে কারণেই যেখানে পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনের আহ্বান পাব সেখানেই যাব আমি।’ প্রশ্ন হলো, কেমন বাংলাদেশ দেখতে চেয়েছিলেন তিনি? বাংলাদেশের মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ হয়েছিল, সে যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী নামক দলটি ছিল পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী। জামায়াত ক্ষমতায় থাকবে বা দেশ শাসনের সুযোগ পাবে, তেমন বাংলাদেশ কি তিনি চেয়েছিলেন?

দোয়া মাহফিলের প্রধান আয়োজক মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহীম বলেন, ১৩টি বছর আমরা সংগ্রাম করে টিকেছিলাম ২০২১ সালের জন্য। এই বছর আমরা ঘুরে দাঁড়াতে চাই। আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার- এই তিনটি যদি বাস্তবায়িত হয়, এ দেশ সোনার বাংলা হবে। আমরা এর জন্য চেষ্টা করতে চাই।

এখানেও প্রশ্ন, ইব্রাহীম সাহেব ১৩ বছর অপেক্ষা করলেন কেন? এই ২০২১ সালের বিশেষ তাৎপর্য কী? এ বছর তো নির্বাচন হবে না। ববং এটা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর। জাতি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ব্যাপক উৎসাহ-আনন্দের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্যই তো তিনি এবং তার সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাহলে এই বছরে জেনারেল ইব্রাহীম কী চেষ্টা করতে চান? বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নিয়ে দেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অলিক স্বপ্ন তিনি যে দেখছেন, তার পেছনের রহস্যটা কী?

এই জেনারেল সাহেবের অতীতটা কিন্তু কম রহস্যময় নয়! তিনি জেনারেল নাসিমের সেনাঅভ্যুত্থানের সময় তাকে মদত দিয়েছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি প্রথম দিকে সরকারের সমর্থকই ছিলেন। সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য কিছু তৎপরতাও করেছেন। সে আশা পূরণ না হওয়ায় তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি নিজেকে খুবই চৌকস মনে করেন। কিন্তু ক্ষমতায় থেকে রাজনীতি করে জিয়াউর রহমান এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যে সাফল্য পেয়েছেন, ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনীতি করে কোনো জেনারেলেরের পক্ষে তা পাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই সাবেক সেনাকর্মকর্তাদের জড়ো করে তিনি যদি রাজনীতির অলৌকিক জলযানে উঠে বিষম দরিয়া পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন দেখে থাকেন, তাহলে সে স্বপ্ন ভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগার কথা নয়।

দোয়া মাহফিলে ইব্রাহীম সাহেবের পাশে বসেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। কী মনোলোভা দৃশ্য। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যিনি বড়বড় কথা বলেন, সেই সাবেক সেনাকর্মকর্তার পাশে বসে রাজাকার নেতা বলেন, ‘এই কর্তৃত্ববাদী সরকার জাতিকে বিভক্ত করে রেখেছে। জাতীয় ঐক্য, নৈতিক চরিত্র, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি নতুন সংগ্রামের উদ্যোগ প্রয়োজন।’ আহারে বাঙালি হত্যার কলঙ্ক বহন করা দলের নেতা যখন জাতির ঐক্য এবং নতুন সংগ্রামের উদ্যোগের কথা বলেন, তখন দেশের মানুষ ভীত-সন্তস্ত্র না হয়ে পারে না। জামায়াত মানেই হত্যা, সন্ত্রাস এবং বিভেদ-উসকানি।

জেনারেল ইব্রাহীমের আরেক মিত্র নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। একসময়কার জনপ্রিয় ছাত্রনেতা মান্না রাজনীতির নানা ঘাটের পানি খেয়ে, একসময় শেখ হাসিনার কৃপাদৃষ্টি লাভ করেও নির্বাচনে জিততে না পেরে এখন বাতাসে ঝড় তোলার রাজনীতি করছেন। গায়ে মানে না আপনি মোড়ল এই নেতা দম্ভোক্তি ছাড়া আর কিছু দেয়ার ক্ষমতা রাখেন না। তার এখনকার সব প্রচেষ্টা তাই যেকোনো মূল্যে ক্ষমতার ভাগ পাওয়া। কিন্তু ক্ষমতা এমন জিনিস যে কেউ জীবনপাত করেও পায় না, আবার কেউ মুফতে পেয়ে যায়।

মান্না দোয়া মাহফিলে বলেছেন, ‘২০২০ সাল আমাদের জন্য ভালো যায়নি। ২০২১ সালের জন্য দোয়া করেন। একুশের মধ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দখলদার সরকারকে বিদায় করা যায়। এটা অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে করি না।’ তার এই বক্তব্য শুনে সে কথাটাই মনে পড়ছে : মন চায় পাহাড় তুলে আছাড় মারি। কিন্তু শক্তিতে কুলোয় না। গত নির্বাচনের আগে ঘোট পাকিয়ে মান্নারা কী অর্জন করেছেন, তার হিসাবটা একবার করেছেন কি?

বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর দোয়া মাহফিলে বলেছেন, ‘আমরা যে পতাকা পেয়েছি তা কি একাত্তরের মতো উজ্জ্বল? আমাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।’ বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ‘বর্তমান স্বাধীনতাবিরোধী সরকার যাই যাই করেও যাচ্ছে না। এই যাওয়াটাকে দ্রুততর করার জন্য যার যেখানে শক্তি আছে তা যদি একত্র করা যায়, তাহলে দেশের পক্ষে মুক্তি সম্ভব।’

রাজনৈতিক ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনীর সদস্য ছাড়াও অনুষ্ঠানে কথা বলেন সরকারবিরোধী মতের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘এভাবে দেশ চলতে পারে না। ক্ষণিকের মোহ থেকে বেরিয়ে এসে সবাই যাতে একসঙ্গে ভালোভাবে চলতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র, তারপর সুশাসন এবং সবার জন্য ন্যায়বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনে যদি প্রধানমন্ত্রী হেরে যান তাকে নিশ্চিত করতে চাই যে আজ আপনি যে অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়েছেন সেটা আপনার উপরের চালানো হবে না। আপনিও সুষ্ঠু বিচার পাবেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. আসিফ নজরুল বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ১০০ বছর ক্ষমতায় থাকলেও আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই। আমি একটা জিনিস দেখে যেতে চাই যে বাংলাদেশের মানুষ ভোটারাধিকার পেয়েছে।’

কিছু গণবিচ্ছিন্ন বাকপটু মানুষ চটকদার কথা বলে কিছু সংখ্যক মানুষকে আমোদিত করতে পারলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এদের গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে মনে হয় না। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার হটানোর ক্ষমতা এদের নেই। তাই এরা বিশেষ কোনো পরিস্থিতি তৈরির নীলনকশা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন কিনা, সে প্রশ্ন রাজনৈতিক মহলে উঠছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কোনো নেতা কল্যাণ পার্টির দোয়া মাহফিলে যাননি। এটাও একটি লক্ষণীয় বিষয়। বিএনপি কি দুই নৌকায় পা রেখে চলার কৌশল নিয়েছে? মূল নেতারা চলবেন এক ধারায় আর মধ্যম সারির নেতারা চলবেন অন্য ধারায়।

‘যদি লাইগ্যা যায়’ তাহলে সবাই হুড়মুড় করে এক হয়ে ক্ষমতার স্বাদ জিভে লাগাবেন– এটাই যদি হয় কৌশল তাহলে বিএনপির জন্য আরও খারাপ সময় অপেক্ষা করছে বলে মনে করা দোষের হবে না। রাজনীতির কৌশলের খেলায় শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে টেক্কা দেয়ার অবস্থায় যেতে বিএনপির আরও বহুদিন সময় লাগবে। আর কোনো কুচিন্তা যদি মাথায় থাকে তাহলে সেটাও পরিহার করা দরকার। ষড়যন্ত্রের পথে হাঁটলে ক্লান্তি-ক্লেশ বাড়বে। মনে রাখা ভালো : ডিম পাড়ে হাঁসে, খায় বাঘডাশে।

জেনারেল ইব্রাহীম সংবাদপত্রে কলাম লেখেন, টকশোতে অংশ নেন। নিজেকে বুদ্ধিমান বলে মনে করেন। কিন্তু রাজনীতিতে তার প্রজ্ঞা আছে, তার রাজনৈতিক চিন্তা মানুষকে আলোড়িত করেছে, মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি জীবনবাজি রাখতে প্রস্তুত, তার কোনো নজির কি তিনি তার রাজনৈতিক জীবনে স্পষ্ট করে তুলতে পেরেছেন? ঘোট পাকানো আর স্বচ্ছভাবে রাজনীতি করা এককথা নয়। মানুষ কিন্তু তার প্রকৃত মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী কারা সেটা চিনতে ভুল করে না।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/বিএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]