কালো টাকা ঢালাও সাদা করার সুযোগ কতটুকু নৈতিক?

সম্পাদকীয় ডেস্ক সম্পাদকীয় ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১

আলমগীর দারাইন

ঘুষ, দুর্নীতি, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, কর ফাঁকি ইত্যাদি যে কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে আয়ই হলো কালো টাকা। সাধারণত কালো টাকার মালিকরা তাদের অবৈধ উপার্জনের কিছু অংশ বাড়ি, ফ্ল্যাট ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেন। কিছু অংশ বিদেশে পাচার করেন। আবার অনেকে আত্মীয়স্বজনের নামে-বেনামে রাখেন। কেউ বালিশের নিচে বা সিন্ধুকের ভেতর লুকিয়ে রাখেন।

কালো টাকা উপার্জনকারী কখনো একপাত্রে সব টাকা রাখেন না। এরা সাহসী ও চতুর। এসব ধনী লোকদের কারণেই সেকেন্ড হোম, বেগমপাড়া, বিদেশে অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ, আলোচনা, সমালোচনা পত্রিকার পাতায় আজকাল অহরহ চাঞ্চল্যকর খবর হিসেবে ছাপা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো কালো টাকা কি কখনো সাদা হয়? উপরে রঙ দিয়ে ঢেকে দিলে ভেতরে কালো রঙ মুছে যায় না। বারবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে কেন? দেশে অধিকাংশ মানুষের মাঝে আজ একটাই চিন্তা কীভাবে দ্রুত ধনী হওয়া যায়। সেটা যে কোনো পন্থায় হোক না কেন। ধনী হতে চাওয়া অন্যায় কিছু নয়, কিন্তু অন্যায় পথে কেন? এভাবে নৈতিক মূল্যবোধটা সমাজ থেকে পর্যায়ক্রমে উঠে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে কালো টাকা সাদা করার প্রথম সুযোগ দেয়া হয়। তখন এর নাম ‘কর-অনারোপিত আয়’ দেয়া হয়।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে বলেন ‘দেশের প্রচলিত আইনে যাই থাকুক না কেন জুলাই ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২১ পর্যন্ত ব্যক্তি শ্রেণির করদাতারা আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টে প্রতি বর্গমিটারে নির্দিষ্ট হারে এবং গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে আয়কর কর্তৃপক্ষ বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কালো টাকা সাদা হওয়ায় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবাসন শিল্প ও পুঁজিবাজার গতিশীল হচ্ছে।’

বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এন বি আর) বলছে, ‘চলতি অর্থবছর প্রথম ছয় মাসের ১০ হাজার ২২০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় প্রায় সাড়ে ৯ কোটি টাকা কর দিয়ে বৈধ করেছেন, সাত হাজার ৪৪৫ জন করদাতা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন’।

সরকার মনে করছে, এ সুযোগ দেয়া হলে কালো টাকার কিছু অংশ অর্থনীতির মূল স্রোতে আসবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে। যদিও শর্তহীনভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দেয়ার ফলে ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি কেনাবেচা বেড়েছে ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বেড়েছে। অর্থনীতির অন্যান্য খাতে গতিশীলতা বেড়েছে। করোনাকালে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বেড়েছে। কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, এ সুযোগ ঢালাওভাবে দেয়া ঠিক হবে না। এতে দেশ থেকে অর্থপাচার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন।

পেশাজীবী অনেকে চাকরির বাইরে অপ্রদর্শিত আয় করেন। এদের অনেকের আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এদের অপ্রদর্শিত আয় কিছু কর দিয়ে সাদা করলে সমাজে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। কিন্তু ঘুষ, দুর্নীতি, অর্থপাচার, চোরাচালান, নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা, বেসরকারি- সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি ইত্যাদি অনৈতিক পথে অর্জিত অর্থ ঢালাও ভাবে সরকার সাদা করার সুযোগ করে দিলে সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যারা নিয়মিত কর প্রদান করে তারা নিরুৎসাহিত হবে। তাছাড়া মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং ধনী-দরিদ্র ব্যবধান বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশে বর্তমান ও বিগত সরকার বারবার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দিয়েছে, বাস্তবে দেখা যায় এর ফলে সমাজ ও অর্থনীতিতে ভালোর থেকে, মন্দের প্রভাবই বেশি পড়েছে। দিন দিন দুর্নীতির থাবা এখন দেশের সমগ্র মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে জেঁকে বসেছে। প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি যারা বাস্তবায়ন করবেন, তাদের প্রথমে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সরকারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তির অনেকে দীর্ঘদিন ধরে কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে এবং নামিদামি ব্যক্তি, রুই-কাতলা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই যাচ্ছেন। এ কারণে আজও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সফল বা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।

সমাজে অবৈধপথে উপার্জিত কালো টাকা ঢালাওভাবে সাদা করার সুযোগ করে দিলে সেই সমাজকে কখনো দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব হবে না। দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের একটা অংশ উন্নত জীবনযাপন, সন্তানের ভালো শিক্ষা, ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা, জীবনের নিরাপত্তার কারণে কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে টাকা পাচার হচ্ছে এবং দুর্নীতিবাজের অনেকে সেকেন্ড হোম ও ব্যবসায় নামে বেনামি বিনিয়োগ করছেন, যা হরহামেশা পত্রিকায় উঠে আসছে।

সমাজে চোরাকারবারি, জনগণের সম্পদ লুটেরা, দুর্নীতিবাজ সবাইকে যদি আইনের আওতায় না এনে, বিচার না করে, সাজা না দিয়ে ভালোর সঙ্গে খারাপের মিশিয়ে ফেলা হয়, তাদের কালো টাকা শর্তহীনভাবে সাদা করার সুযোগ করে দেয়া হয় সেই সমাজ কখনো দুর্নীতিমুক্ত করা সম্ভব নয়। সমাজে অপরাধীকে চিহ্নিত করে সাজা না দিলে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে এবং ধরাকে সরা মনে করবে ও নতুন প্রজন্মের অনেকে এদের অনুসরণ করবে।

সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সফল হচ্ছে না নানাবিধ কারণে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ; প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতি। এ যাবত একাধিক বার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দিয়ে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। অসৎ, দুর্নীতিবাজ মানুষের মাঝে দেশপ্রেম, জবাবদিহিতা, দায়িত্ববোধ থাকে না। তাই কালো টাকা সাদা করার কোনো যুক্তি নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

দুর্নীতিবাজ, অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জনকারীর কঠিন শাস্তির বদলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ করে দিয়ে পরোক্ষভাবে তাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। কিছু দিন পরপর ঘুরে ফিরে তাদের সমাজে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে। এরা সমাজে ঘৃণিত হওয়ার পরিবর্তে সম্মান ও সমাদর পাচ্ছে। এভাবে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বারবার করে দিলে দেশ কোনো দিন দুর্নীতিমুক্ত হবে না। সমাজে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়তে থাকবে।

কালো টাকার সঙ্গে দুর্নীতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত। অপরাধী যদি অপরাধের শাস্তি না পায়, সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। আমরা কখনো অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন করতে পারবো না। আইনের শাসন কায়েম করতে পারবো না। কালো টাকা এভাবে বারবার সাদা করার সুযোগ সৃষ্টি না করে বরং কালো টাকা সাদা করার সুযোগটি চিরতরে বন্ধ করাই সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নির্মূলের প্রধান নিরোধক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে হয়।

লেখক : কলামিস্ট, ক্যালগেরি, আলবার্টা, কানাডা।

এইচআর/ফারুক/এমকেএইচ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও সরকারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তির অনেকে দীর্ঘদিন ধরে কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে এবং নামিদামি ব্যক্তি, রুই-কাতলা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই যাচ্ছেন। এ কারণে আজও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সফল বা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]